খাবার ঘরের সামনের দেয়ালে একটি বড় ক্রস টাঙিয়ে ঘরের শোভাবর্ধন করা হয়েছে। ঘরের একটা মাত্র দরজা বাগানের দিকে খোলা। দুটো সরু টেবিল ঘরের মধ্যে সমান্তরালভাবে পাশাপাশি রাখা আছে। ঘরের দেয়ালগুলো সাদা এবং টেবিলগুলো কালো। শোকসূচক বিষাদের পটভূমিকায় এই একটা মাত্র রঙের বৈপরীত্যকে মেনে নেওয়া হয়েছে কনভেন্টে। ছাত্রীদের খাবারও খুব সাদাসিধে ছিল। প্রত্যেককে এক ডিশ মাংস অথবা নোনা মাছ আর কিছু সবজি দেওয়া হত। ছাত্রীরা নীরবে খেত এবং একজন মাদার তাদের দেখাশোনা করত। এই নীরবতা ভঙ্গ করে যদি একটা মাছি গুনগুন করে উড়ে আসত তা হলে সে-ও আর না উড়ে একটা কাঠের মই-এর উপর বসে পড়ত। কেউ কোনও কথা বলত না। শুধু ঘরখানার জমাটবাঁধা নিস্তব্ধতার মাঝে ক্রসের নিচে দাঁড়িয়ে একটি বড় মেয়ে সেন্টদের জীবনী পাঠ করে যেত। প্রতিটি বড় মেয়েকে এক সপ্তা করে কাজ করতে হত। একটা টেবিলের উপর কতকগুলি জলভরা মাটির পাত্র সাজানো থাকত। খাওয়ার পর মেয়েরা তাদের ডিশগুলো ধুত। যদি তাতে কোনও অভুক্ত খাবারের টুকরো পড়ে থাকত তা হলে তার জন্য শাস্তি পেতে হত তাদের।
যদি কোনও মেয়ে কথা বলে কখনও নীরবতা ভঙ্গ করত তা হলে তাকে শাস্তি পেতে হত। তা হলে তাকে পাথরের মেঝের উপর জিব দিয়ে ক্রস আঁকতে হত। যে ধূলিকণা সব মানুষের আনন্দময় জীবনের পরিণতি, ছোট্ট জিব দিয়ে সেই ধূলিকণা চেটে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে শিখতে হত। এইভাবে নিয়মভঙ্গকারী উদ্ধত জিবকে শাস্তি দেওয়া হত।
কনভেন্টে একটা বিরল বই ছিল। এই বই একখানা মাত্র ছাপা ছিল এবং সেই বই পড়া নিষিদ্ধ ছিল। বইটাতে ছিল সেন্ট বেনেডিক্টের নিয়মকানুন। কোনও অধর্মাচারীর অপবিত্র দৃষ্টি যেন সে বইয়ের ভেতর প্রবেশ করতে না পারে। ছাত্রীরা অনেক সময় বইটা কোনও রকমে হাতে নিয়ে গোপনে পড়ত। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে তারা সব সময়। সন্ত্রস্ত হয়ে থাকত পড়ার সময়। তবে সেই বই পড়ে বিশেষ কোনও আনন্দ পেত না তারা। ছেলেদের পাপকর্ম সম্বন্ধে লেখা কতকগুলি পাতা শুধু তারা দেখত। সে লেখাগুলো এমনই দুর্বোধ্য ছিল যে তারা ভালো করে বুঝতেই পারত না।
বাগানবাড়ির একটা পথের দু ধারে কতকগুলি ফলের গাছ ছিল। কড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কখনও কখনও মেয়েরা একটা কাঁচা আপেল, একটা পচা আতা অথবা পোকা খাওয়া নাশপাতি ফল পেড়ে নিত গাছ থেকে। এ বিষয়ে একখানি চিঠি আমার সামনে আছে। কনভেন্টের এক ভূতপূর্ব ছাত্রী বর্তমানে একজন ডিউকপত্নী এবং প্যারিস শহরের একজন অতি সম্ভ্রান্ত মহিলা। তার চিঠিখানিতে লেখা আছে, বাগানে কোনও ছাত্রী কোনও ফল পাড়লে তাকে সেটা লুকিয়ে রাখতে হত। সেই ফল বিছানায় শুতে গিয়ে সেখানে খেতে হত। এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার।
আর একবার আর্কবিশপ কনভেন্ট পরিদর্শনে আসেন। ম্যাদময়জেল বুশার্দ নামে একটি সাহসী ছাত্রী আর্কবিশপের কাছে এক দিনের ছুটির জন্য আবেদন করে। এ প্রতিষ্ঠানে কড়া নিয়ম-কানুনের মধ্যে এই ধরনের আবেদন প্রথাবিরুদ্ধ এবং ভয়ঙ্কর। তবু সে আবেদন মঞ্জুর করেন আর্কবিশপ। যারা সেখানে উপস্থিত ছিল তারা এটা বিশ্বাস করতেই পারেনি। শুধু এক দিন নয়, তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর হয়। মেয়েরা যখন সারবন্দিভাবে দাঁড়িয়েছিল এবং আর্কবিশপ যখন তাদের দেখতে দেখতে তাদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন বেশ লম্বা চেহারার সুন্দরী বুশার্দ সাহস করে এগিয়ে গিয়ে আর্কবিশপের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, মঁসিয়ে, আমি এক দিনের ছুটি প্রার্থনা করছি।
আর্কবিশপ মঁসিয়ে দ্য কেলের মৃদু হেসে বললেন, মাত্র এক দিনের? এটা মোটেই যথেষ্ট হবে না মেয়ে। আমি তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর করছি।
মহামান্য আর্কবিশপ যখন কথা দিয়ে ফেলেছেন তখন কনভেন্টের প্রধানা কত্রীর কোনও ক্ষমতা ছিল না তার ওপর। এটা কনভেন্টের নিয়মকানুনের ওপর এক বিরাট হস্তক্ষেপ, কিন্তু ছাত্রীদের পক্ষে এক বিরাট জয় এবং আনন্দের ব্যাপার।
যেসব উঁচু প্রাচীর দিয়ে কনভেন্ট ঘেরা ছিল সেসব প্রাচীর কিন্তু একেবারে দুর্ভেদ্য ছিল না। বাইরের জগতের কথা, অনেক নাটক ও অনেক প্রেমের কাহিনী প্রতিধ্বনিত হত সে প্রাচীর ভেদ করে।
এমন একটি ঘটনার বিবরণ নিচে দেওয়া হল, যে ঘটনাটার সঙ্গে আমাদের মূল কাহিনীর কোনও সম্পর্ক না থাকলেও তার দ্বারা কনভেন্টের একটা সাধারণ ছবি পাওয়া যাবে।
সেই সময় মাদাম আলবার্তিনে নামে একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা একবার কনভেন্টে বেড়াতে আসে। তাকে সবাই শ্রদ্ধা করত। তার সম্বন্ধে খুব একটা বেশি কিছু জানা যায়নি। শুধু জানা গিয়েছিল তার মাথাটা ঠিক ছিল না এবং অনেকের ধারণা সে নাকি। মারা গেছে। বিরাট অভিজাত ঘরে তার বিয়ে হলেও বিয়ের যৌতুকের ব্যাপারে যে অশান্তির উদ্ভব হয় তাতে তার মাথা খারাপ হয়ে যায়।
মহিলাটির বয়স তিরিশের বেশি হবে না। তার মাথার চুল কালো এবং মুখখানা খুবই সুন্দর ছিল। তার চোখদুটোও বেশ কালো আর আয়ত ছিল। সে প্রায়ই কালো কালো চোখের দৃষ্টি ছড়িয়ে দূরে কী দেখত। কিন্তু আসলে সে কী কিছু দেখত? সে এত ধীর শ্লথ গতিতে হাঁটত যে সে চলছে বলে মনেই হত না। সে কখনও কারও সঙ্গে কথা বলত না। মনে হত তার নাক দিয়ে নিশ্বাস পড়ছে না। তার হাত দুটো ছিল বরফের মতো ঠাণ্ডা। সে যেখানেই যেত তার স্তব্ধ ও হিমশীতল সৌন্দর্যের এক বিষণ্ণ প্রভাব ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। একদিন সেই মহিলার পাশ দিয়ে যাবার সময় একজন সিস্টার আর একজনকে বলল, উনি যেন মৃত।
