মাঝে মাঝে শিশুদের এক-একটা কথা শুনে একই সঙ্গে হাসি ফুটে উঠত বড়দের মুখে আর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসত তাদের বুক থেকে। একবার পাঁচ বছরের একটি মেয়ে। একজন সন্ন্যাসিনীকে বলেছিল, আচ্ছা মাদার, একটা বড় মেয়ে আমাকে বলল, আমি নাকি এখানে আর নয় বছর দশ মাস থাকব। কত মজা! কী সুন্দর কথা!
আর একবার এক মাদার একটি ছয় বছরের মেয়েকে বলেছিল, তুমি কাঁদছ কেন মেয়ে?
মেয়েটি তখন উত্তর করেছিল, আমি অ্যালিক্সকে বলেছিলাম, ফরাসি দেশের ইতিহাস। আমি জানি। কিন্তু সে বলল, আমি জানি না।
নয় বছরের এক অ্যালিক্স তখন বলেছিল, না, ও জানে না।
মাদার বলেছিল, ব্যাপারটা কী? আসলে কী হয়েছিল?
অ্যালিক্স তখন বলেছিল, ও আমাকে ইতিহাস বইটা খুলে আমাকে তার থেকে যে। কোনও প্রশ্ন ধরতে বলল। আমি তাই করেছিলাম। কিন্তু ও উত্তর দিতে পারেনি।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। ও উত্তর দিতে পারেনি।
কিন্তু কী প্রশ্ন তুমি ওকে ধরেছিলে?
ও বলেছিল বইটার যে কোনও পাতা খুলে আমি প্রথমেই যে প্রশ্ন পাব সামনে তাই ধরব।
কিন্তু প্রশ্নটা কী?
প্রশ্নটা হল এই যে, তার পর কী ঘটেছিল?
একবার এক বাইরের লোক যে টাকা দিয়ে কনভেন্টে খেত সে একদিন এক শিশু ছাত্রীর খাওয়া দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। মেয়েটিকে খুব তাড়াতাড়ি গোগ্রাসে খেতে দেখে সে বলল, দেখ দেখ, বাচ্চা মেয়েটা একজন বয়স্কা মহিলার মতো খাচ্ছে।
কনভেন্টে যে সব স্বীকারোক্তির অনুষ্ঠান হত তা দেখে ছাত্রীরাও এখানে-সেখানে তাদের স্বীকারোক্তি লিখত বড়দের মতো। একবার সাত বছরের একটি মেয়ে মেঝের উপর তার স্বীকারোক্তি লিখে রাখে। সে লেখে, ফাদার, আমি স্বীকার করছি আমার অর্থলোভ আছে। আমি স্বীকার করছি আমি ব্যভিচার করেছি। আমি স্বীকার করছি আমি ভদ্রলোকদের পানে তাকিয়েছি।
এই কাহিনীটি একবার ছয় বছরের একটি মেয়ে কোনও এক নদীর ধারে ঘাসে ঢাকা তীরের উপর বলেছিল। কোনও একটা ফুলে ভরা ঝোপে তিনটে মোরগ বাস করত। তারা প্রথমে অনেক ফুল তুলে পকেটে ভরল। তার পর পাতাগুলো খেলনার মধ্যে ভরল। সে দেশের বনের মধ্যে একটা নেকড়ে ছিল। সেই নেকড়েটা সেই মোরগ তিনটেকে খেয়ে ফেলল।
পিতামাতার দ্বারা পরিত্যক্ত একটি শিশুকে কনভেন্ট লালন-পালন করত। সে একদিন এক মর্মবিদারক কথা বলে। সে বলে, আমার যখন জন্ম হয় আমার মা তখন ছিল না।
একজন মোটা চেহারার সিস্টার সব ঘরের চাবি রাখত। তার নাম ছিল আগাথা। মেয়েরা তাকে আগামোকলশ বলত–অর্থাৎ চাবির আগাথা।
বাগানের দিকে আয়তক্ষেত্রাকার একটা বড় ঘর ছিল। সে ঘরের প্রতিটি কোণের মেয়েরা এক-একটা নাম দিয়েছিল। যেমন মাকড়সার কোণ, আরশোলার কোণ, কাঠপোকার কোণ এবং ঝিঁঝি পোকার কোণ। তবে ঝিঁঝি পোকার কোণটা রান্নাঘরের কাছে থাকার জন্য গরম বলে সেটাকে অনেকে পছন্দ করত। ছাত্রীরা যে যে কোণে বসত সেই নামে অভিহিত হত তারা।
একবার আর্কবিশপ পরিদর্শন করতে এসে এককোণে সুন্দর চুলওয়ালা একটি সুন্দরী বাচ্চা মেয়েকে দেখে বলেন, মেয়েটি কে?
তখন মেয়েরা বলে, ও হচ্ছে মাকড়সা।
আর্কবিশপ বলেন, তাই নাকি? ওই কোণের ওই মেয়েটি কে?
ও হচ্ছে ঝিঁঝি পোকা।
আর ও?
ও হচ্ছে আরশোলা।
বাহ্, আর তোমার নাম?
আমার নাম কাঠপোকা।
তখনকার দিনে এই সব প্রতিষ্ঠানে অনেক অনাথ শিশুমেয়েকে রেখে প্রতিপালন করা হত। উৎসবের দিনে এই মেয়েরা খুব আনন্দ পেত। কোনও এক উৎসবের দিন কুমারীরা যখন ফুল নিয়ে বড় বেদির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন একটি সাত বছরের মেয়ে ষোলো বছরের একটি মেয়েকে বলে, তুমি তো কুমারী, কিন্তু আমি কুমারী নই।
.
৫.
কনভেন্টের খাবার ঘরের দরজার সামনে বড় বড় কালো অক্ষরে একটি শিশুর প্রার্থনা লেখা আছে। এই প্রার্থনার নাম হোয়াইট পেটার নস্টার। এই প্রার্থনার কথা কেউ পড়লে সরাসরি স্বর্গে চলে যাবে। লেখা আছে, হে ক্ষুদ্র হোয়াইট পেটার নস্টার, যাকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন, ঈশ্বর যার সঙ্গে কথা বলেন, যাকে ঈশ্বর স্বর্গে স্থান দিয়েছেন, রাত্রিতে বিছানায় শুতে গিয়ে আমার বিছানায় তিনটি দেবদূতকে দেখতে পাই। একজন দেবদূত আমার পায়ের দিকে, একজন আমার মাথার দিকে, আর একজন কুমারী মাতা মেরি। আমার পা আর মাথার মধ্যভাগে এসে দাঁড়ান। তিনি আমাকে কোনও কিছুকে ভয় না। করে শান্তভাবে শুয়ে থাকতে বলেন। ঈশ্বর আমার পিতা, কুমারী মাতা আমার মা, তিনজন ঈশ্বর প্রেরিত ধর্মপ্রচারক আমার তিন ভাই আর তিনজন কুমারী আমার তিন বোন। ঈশ্বর জন্মগ্রহণকালে যে পোশাক পরেছিলেন সে পোশাকে আবৃত আছে আমার দেহ। সেন্ট মার্গারেটের ক্রস আঁকা আছে আমার বুকে। কুমারী মাতা মাঠের উপর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় সেন্ট জনের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। তিনি সেন্ট জনকে জিজ্ঞাসা করেন, কোথা থেকে আপনি আসছেন মঁসিয়ে সেন্ট জন?
সেন্ট জন উত্তর করেন, আমি আসছি আভে সেলাস থেকে।
তুমি কি ঈশ্বরকে দেখেছ? কোথায় তিনি?
তিনি আছেন ক্রসের কাঠের উপর। তার পাদুটো ঝুলছে। তাঁর হাত দুটোতে পেরেক পেটানো আছে। তার মাথায় আছে কাটার টুপি।
যে এই কথাটা রাত্রিকালে আর সকালবেলায় তিনবার করে উচ্চারণ করে সে মৃত্যুর পর স্বর্গলাভ করে।
১৮২৭ সালে দেয়ালের উপর চুনকাম করার সময় এই প্রার্থনার কথাগুলো মুছে যায়। এ প্রার্থনার কথা কনভেন্টের পুরনো ছাত্রীদের স্মৃতি থেকে মুছে গেছে একেবারে। সেদিনের সেই শিশু মেয়েরা আজ হয়তো বুড়ি হয়ে গেছে।
