বসার ঘরে প্রধানা কোনও সিস্টার ডেকে পাঠালে প্রধানা নিজে অন্য সিস্টারদের মতো মাথার ঘোমটাটা মুখের উপর টেনে দিয়ে শুধু মুখগহ্বরের কাছটা সামান্য একটু খুলে রাখতেন। যেমন বাইরে থেকে কোনও আগন্তুক এলে করা হত। একমাত্র প্রধানাই বাইরে থেকে কোনও আগন্তুক এলে কথা বলতে যেত তার সঙ্গে। অন্য সিস্টারেরা শুধু তাদের বাড়ির আত্মীয়স্বজন ছাড়া আর কোনও বাইরের লোকের সামনে বেরোতে বা দেখা করতে পেত না। তবে আত্মীয়স্বজনদের দেখা করার অনুমতি খুব কমই মিলত। অতীতে কোনও সিস্টারকে ভালোবাসত এমন কোনও পুরুষ যদি কনভেন্টে এসে দেখা করার অনুমতি চাইত তা হলে সে অনুমতি দেওয়া হত না। সিস্টারের অতীতের কোনও বান্ধবী এই ধরনের অনুমতি পেতেন।
সেন্ট বেনেডিক্টের এই সমস্ত নিয়মকানুনগুলো মার্তিন ভার্গা আরও কঠোর করে তোলেন।
.
৩.
কনভেন্টের শিক্ষাকাল হল দু বছরের। এই কালের মধ্যে শিক্ষার্থিনী না পারলে আরও চার বছর শিক্ষাকাল বেড়ে যায়। তবে শিক্ষার্থীকে তেইশ-চব্বিশ বছরের মধ্যে শিক্ষাকাল শেষ করে শপথ গ্রহণ করতে হয়। কোনও বিধবাকে কনভেন্টে গ্রহণ করা হয় না। শপথ গ্রহণের পর শিক্ষার্থিনীকে নির্জন ঘরের মধ্যে আত্মনিগ্রহের জন্য এমন সব সাধনা করতে হয় যেগুলো গুহ্য এবং যার কথা তারা বলে না।
যেদিন শিক্ষাকাল শেষ করে শিক্ষার্থিনী শপথ গ্রহণ করে সেদিন ভালো জমকালো পোশাক পরে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। তার দেহের উপর একটা কালো চাদর ঢাকা দেওয়া হয়। অন্য সিস্টারেরা দুটি সারিতে বিভক্ত হয়ে তার দু পাশে দাঁড়ায়। তারা মৃত্যুকালীন প্রার্থনার গান গায়। তার পর একজন সকরুণ সুরে বলে, আমাদের সিস্টার মারা গেছেন।
আর একজন তখন বলে, খ্রিস্টের মধ্যে সে নবজীবন লাভ করেছে।
সেকালে এই কনভেন্টে একটি স্কুল ছিল এবং ছাত্রীদের এক আবাস ছিল। সেখানে ধনীদের মেয়েরা থেকে পড়াশুনো করত। সেই সময় এক ইংরেজ বালিকা ছিল সেখানে। ক্যাথলিক তালবতের নামে ধারণ করেছিল। সন্ন্যাসিনী সিস্টারদের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করে ও প্রাচীরঘেরা এক বাড়িতে সব সময় বাস করে বাইরের জগৎ, জীবন ও বর্তমান যুগকে ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে তারা। এই কনভেন্টের একটি মেয়ে একবার এই গ্রন্থের লেখককে বলে, রাস্তার পাথর দেখলেই মাথা থেকে গা পর্যন্ত আমার কাঁপতে থাকে। তারা নীল রঙের জামা-প্যান্ট আর সাদা টুপি পরত। ব্রোঞ্জ অথবা এনামেলের ক্রস গাঁথা থাকত তাদের বুকে। কতকগুলি উৎসবের দিন বিশেষ করে সেন্ট মার্থার জন্মদিনে ছাত্রীরা সিস্টারদের পোশাক পরে সারাদিন আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম করার এক বিশেষ অনুমতি পেত। প্রথম প্রথম সিস্টারেরা ছাত্রীদের ওই দিনে তাদের কালো পোশাক পরতে দিত। কিন্তু এটা প্রায় অধর্মাচরণের শামিল বলে কনভেন্টের প্রধানা অধিকত্রী তা নিষিদ্ধ করে দেন। আসল কথা, কনভেন্টের কর্তৃপক্ষ এই অনুমতি দান করলে ছাত্রীরা। সিস্টারদের পোশাক পরে ধর্মীয় জীবনযাপনের এক পূর্বাস্বাদ লাভ করে তারা সত্যিকারের একটা আনন্দ লাভ করত। এটা তাদের ছাত্রজীবনে একটা নতুনত্ব আর পরিবর্তন নিয়ে আসত। নির্দোষ নিরীহ সরলপ্রাণ শিশুদের কাছে এ এক পরম আনন্দের ব্যাপার।
কয়েকটি চরম আচরণ ছাড়া কনভেন্টের জীবনযাত্রা ও প্রথাগত সব আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে ছাত্রীরা একরকম অভ্যস্ত হয়ে পড়ত। তাদের জীবনের অঙ্গীভূত হয়ে পড়ত একে একে সবকিছু। একজন ছাত্রী কনভেন্ট যাবার পর বিয়ে করে সংসারজীবনে প্রবেশ করেও কনভেন্টের কথা ভুলতে পারেনি। কোনও অতিথি তাদের বাড়িতে এলেই দরজা খুলে পুরনো অভ্যাসের বশে বলে উঠত, ‘চিরদিন। সিস্টারদের মতো সে-ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের বৈঠকখানা ঘরে বসিয়েই কথাবার্তা বলত, বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেত না। কনভেন্টের ছাত্রীরা কনভেন্ট ছেড়ে বাড়িতে আসার পর তাদের মাকেও তাদের আলিঙ্গন করতে দিত না। কনভেন্টের অভ্যাস এবং জীবনচর্যার কথা ভুলতে পারত না তারা সারা জীবনের মধ্যে। কনভেন্টের মধ্যে এত কড়াকড়ি ছিল যে ছাত্রীদের মায়েরা গিয়ে তাদের মেয়েকে চুম্বন করার অনুমতি পেত না। একবার এক ছাত্রীর মা তার তিন বছরের এক মেয়েকে নিয়ে কনভেন্টে তার মেয়েকে দেখতে যায়। কিন্তু সেই ছাত্রীর তিন বছরের বোনকেও তার দিদিকে চুম্বন করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি জানালার গরাদের ভেতর দিয়ে সেই ছোট মেয়েকে তার হাতটা ঢুকিয়ে তার দিদিকে স্পর্শ করার অনুমতিও দেওয়া হয়নি।
.
৪.
সে যাই হোক, এই ছাত্রীরাই সমস্ত বিষাদাচ্ছন্ন প্রতিষ্ঠানটার মধ্যে এক ঝলক আলোর উজ্জ্বলতা এনে দিয়েছিল।
আমোদ-প্রমোদের জন্য ঘণ্টা বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাগানে যাবার দরজাটা খুলে যেত আর বাগানের পাখিরা যেন মেয়েদের আহ্বান করে বলত, এখানে এস মেয়েরা। উদ্দাম তারুণ্যের এক বিরাট বন্যা বয়ে যেত যেন সারা বাগানময়। শিশুদের হাসিখুশিভরা উজ্জ্বল মুখ আর কপালগুলো বাগানের সব ছায়ান্ধকার দূর করে এক নতুন প্রভাতের আলো নিয়ে আসত যেন। অফিসের কাজকর্ম ও প্রার্থনার গান শেষ হয়ে গেলেই শিশু ও মেয়েদের কলকণ্ঠ শোনা যেত। সে কণ্ঠস্বর ছিল মৌমাছিদের গুঞ্জনধ্বনির থেকেও মধুর।
পাখির মতো এক-একটা ঝাক বেঁধে খেলা করত মেয়েরা। তারা পরস্পরকে ডাকাডাকি করত। ছোটাছুটি করত। তারা যখন হাসত তখন তাদের সাদা ঝকঝকে দাঁতগুলো দেখা যেত। তাদের এই সব হাসি, খেলা কিছুটা দূর থেকে অবগুণ্ঠিত সন্ন্যাসিনীরা আগ্রহভরে লক্ষ করত। মনে হত কতকগুলি ছায়ামূর্তি যেন সূর্যালোকের পানে সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তাতে কী যায়-আসে? তাতে তাদের সেই হাসির উজ্জ্বলতা ম্লান হত না কিছুমাত্র। যে সুখকে কনভেন্টের সন্ন্যাসিনীরা ঘৃণার চোখে দেখত সেই সুখের আলোর এক আশ্চর্য প্রতিফলনে এখানকার বিষাদময় প্রাচীরগুলো এক মায়াময় আনন্দের আবেগে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠত। যেন মনে হত শোকাচ্ছন্ন এক পরিবেশের ওপর কে যেন একরাশ গোলাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সন্ন্যাসিনীদের চোখের সামনেই শিশুরা আনন্দে চঞ্চল হয়ে ছোটাছুটি করত। তাদের নির্দোষ সরলতা সন্ন্যাসিনীর দৃষ্টির আঘাতে বিচলিত হয় না কিছুমাত্র। ছোট ছোট মেয়েরা লাফাত ঝপাত আর বড় বড় মেয়েরা নাচত। এইভাবে কনভেন্টের সুকঠোর নিয়মনিষ্ঠা শিশুদের আন্তরিক সরলতার দ্বারা মেদুর হয়ে উঠত অনেকখানি। এইভাবে খেলাধুলার চঞ্চলতা আর ধর্মাচরণের স্তব্ধতা মিশে যেত একসঙ্গে। শিশুদের প্রাণচঞ্চল পাখনার হাওয়ায়। এখানকার জমাট স্তব্ধতার অনেকখানি যেন কেটে যেত। হোমার যেন পেরালতের সঙ্গে এই শিশুদের এই প্রাণখোলা হাসিতে যোগদান করতে পারতেন। এমন সুন্দর ও মহৎ দৃশ্য আর হতে পারে না। এই ছায়াচ্ছন্ন বাগানবাড়িতে যে তারুণ্যের উজ্জ্বল স্বাস্থ্য, প্রাণের হিল্লোল আর আনন্দের উত্তেজনা উত্তাল হয়ে উঠত মাঝে মাঝে তা সুদূর মহাকাব্যিক বা রূপকথার যুগের পিতামহীসুলভ সন্ন্যাসিনীদের কুঞ্চিত মুখের যুগান্তসঞ্চিত বিষাদগুলোকে বিদূরিত করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
