সন্ন্যাসিনী সিস্টারদের শুধু মুখগহ্বরটুকু ছাড়া দেখতে পাবে না কেউ। মুখ খুললেই তাদের হলুদ দাঁতগুলো দেখতে পাওয়া যাবে। কারণ দাঁত মাজার ব্রাশ কনভেন্টে ঢুকতে দেওয়া হয় না। সাধনার ঊর্ধ্বস্তরে উন্নীত একমাত্র বয়োপ্রবীণা সিস্টাররাই দাঁত মাজার অধিকার লাভ করে।
সিস্টাররা যেসব জিনিস দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে সেই সব জিনিস কখনও ‘আমার একথা বলতে পায় না বলে সব সময় আমাদের বলতে হয় তাদের। যেমন আমাদের অবগুণ্ঠনবস্ত্র, আমাদের জামা প্রভৃতি। কখনও কখনও তারা কোনও বই, কোনও প্রাচীন বস্তু বা মেডেলের প্রতি অতি মাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু পার্থিব কোনও বস্তুর প্রতি কোনও আসক্তি তাদের পক্ষে অন্যায়। তাই এই আসক্তির কথা তারা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে সে আসক্তি সেন্ট থেরেসা’র কথা স্মরণ করে ত্যাগ করে। একবার এক মহিলা সেন্ট থেরেসা’র কনভেন্টে যোগদান করার সময় তাকে বলে, হে শ্রদ্ধেয়া মাতা, আমাকে একখানি পবিত্র বাইবেল গ্রন্থ দয়া করে দেবেন, কারণ এ গ্রন্থ আমি অন্তরের সঙ্গে ভালোবাসি।
একথা শুনে সেন্ট থেরেসা উত্তর করেন, হায়, তা হলে কোনও এক বস্তুর প্রতি অন্তরে তোমার একটা আসক্তি আছে। তা হলে আমাদের প্রতিষ্ঠানে যোগদান করা তোমার চলবে না।
কোনও সিস্টার একটা ঘরে একা থাকতে পেত না। অথবা ঘর বন্ধ করে বিশ্রাম করতে পেত না।
খোলা চালার মধ্যে সকলে মিলে থাকতে হত তাদের। যখন তারা দু জনে কখনও মিলিত হত তখন একজন আর একজনকে বলত, বেদির উপর যে দেবতা রয়েছে তার গুণগান ও প্রার্থনা করো।
তখন অন্যজন তার উত্তরে বলত, “চিরদিন। কেউ কারও ঘরের দরজার সামনে গেলেও ওই কথা বলত এবং ঘরের ভেতর যে থাকত সে-ও তার উত্তরে বলত, ‘চিরদিন।
অনেক সময় প্রথম কথা বলতে না বলতেই অন্যজন ‘চিরদিন’ কথাটা তাড়াতাড়ি বলে ফেলত। এই কথাটা বলাটা তাদের এক যান্ত্রিক অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। অনেক সময় কোনও আগন্তুক এসেই বলত, ‘মেরির গুণগান করো।’
তখন অন্যজন বলত, তিনি মহিমাময়।
এইভাবে তারা পরস্পরকে ‘শুভদিন জানাত, পরস্পরকে অভ্যর্থনা করত।
দিনের বেলায় যখনই গির্জার ঘণ্টা প্রতিটি প্রহর ঘোষণা করত যেমন পাঁচটা, আটটা অর্থাৎ ঘড়িতে যতটাই বাজত তখনই তারা পরস্পরে বলাবলি করত, শুধু এখন নয়, সব সময় সব প্রহরে বেদির দেবতা উপাসিত ও প্রশংসিত হন।
ঘণ্টার প্রহর ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে যা করত অর্থাৎ কিছু কথা বলত, কিছু করত বা চিন্তা করত–সব কাজ থামিয়ে দিয়ে উপাসনা ও প্রার্থনার কথা বলত। এইভাবে প্রতিটি প্রহরের ঘণ্টাধ্বনি তাদের চিন্তার প্রবাহকে থামিয়ে দিয়ে ঈশ্বরের অভিমুখে ধাবিত করত। এই রীতি সকল সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। শুধু তাদের ছিল ভিন্ন। যেমন শিশু যিশুর উপাসকগণ প্রহরের ঘণ্টা শুনে বলত, শুধু এখন এই মুহূর্তে নয়, সব সময় যিশু খ্রিস্টের প্রেম আমার অন্তরে উজ্জ্বল হয়ে উঠুক।
মার্তিন ভার্গা’র অধীনস্থ বেনেডিক্টেনে বার্নাদিনে সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসিনীরা আজ হতে পঞ্চাশ বছর আগে পেতিত পিকপাসে সমবেত হয়। তারা শুধু প্রার্থনা করে করে সমস্ত কনভেন্টটাকে সমাধিভূমির মতো বিষাদময় করে তুলেছিল। মাঝে মাঝে তারা প্রার্থনা থামিয়ে নিচু গলায় বলে উঠত, যিশু-মেরি-জোসেফ।
কথাটা তারা এত নিচু গলায় বলত যে তা শোনাই যেত না।
পেতিত পিকপাসের কর্তৃপক্ষ প্রধান বেদির নিচে মাটি খুঁড়ে একটা গহ্বর তৈরি করে তার মধ্যে সব মৃতদেহকে সমাহিত করত। কিন্তু সরকার এইভাবে এক জায়গায় সব মৃতদেহ সমাহিত করার অনুমতি দিত না। সরকার হুকুম দিয়েছিল মৃতদেহকে কনভেন্টের বাইরে সমাধিভূমিতে নিয়ে যেতে হবে। এ হুকুম কনভেন্টের রীতির ওপর এক অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। তবে তাদের সান্ত্বনা এই যে তারা ভগিয়ার্দের কবরখানার এক কোণে একটা বিশেষ জায়গায় এক বিশেষ সময়ে মৃতদেহকে সমাহিত করার অনুমতি লাভ করে। এই কবরখানা বেনেডিক্টেনে বার্নাদিনে সম্প্রদায়ের অধিকারে ছিল।
প্রতি বৃহস্পতিবার রবিবারের মতো দিনের বেলায় এবং সন্ধ্যাবেলায় সমবেত প্রার্থনায় যোগদান করত সবাই। তারা এমন সব উৎসব ও তিথির দিন পালন করত যার কথা বাইরের জগতের লোক জানত না। তাদের প্রার্থনা, প্রার্থনাকালের সংখ্যা এবং দৈর্ঘ্য এত বেশি ছিল যে তারা নিজেরাই তাতে বিরক্তবোধ করত।
সপ্তায় একদিন করে স্বীকারোক্তি অনুষ্ঠান হত। সারা সপ্তা ধরে প্রতিটি সিস্টার যেসব দোষ ও পাপ করত, তারা পালাক্রমে নতজানু হয়ে প্রধান সিস্টারদের সামনে অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করত। প্রতিটি স্বীকারোক্তি পর্ব শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মাদার উপাধিধারী সিস্টারের আলোচনা করে স্বীকারোক্তিকারিণীর দ্বারা কৃত ও স্বীকৃত পাপের জন্য শাস্তির বিধান দান করত।
তবে স্বীকারোক্তির ব্যাপারটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনও পাপ বা অন্যায়ের জন্য নির্দিষ্ট থাকত। এ ছাড়া লা কুলপে নামে এক ধরনের অনুষ্ঠান হত। যদি কোনও সিস্টার বুঝত সে কোনও পাপ বা অন্যায় করেছে তখন সে প্রধান মাদারের সামনে উপুড় হয়ে শুয়ে হাত দুটো ছড়িয়ে রেখে শুয়ে থাকত। প্রধানা যে কাঠের উপর বসত সেই কাঠের গাঁয়ে তিনবার টোকা না দিলে শায়িত সিস্টার কিছুতেই উঠত না। কতকগুলি ছোটখাটো অন্যায় বা নিয়মভঙ্গের জন্য অনুশোচনার ব্যবস্থা ছিল। গ্লাসভাঙা, ঘোমটার কাপড় ছেঁড়া, অপরিচ্ছন্নতা ও প্রার্থনাগানের লাইন ভুলে যাওয়া বা সুর ভুল করা প্রভৃতি ছোটখাটো ভুলগুলোর ক্ষেত্রে ভুলকারিণী সিস্টার নিজেই নিজের বিচার করে অনুতাপ বা অনুশোচনা করত।
