এই ধর্মসভার কতকগুলি শাখা ইউরোপের ক্যাথলিক দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এই সব শাখা রোমের মতো চার্চের নির্দেশ মেনে চলত।
বার্নাদিনে বেনেডিক্টাইন দলের সন্ন্যাসীরা মার্কিন ভার্গা’র অধীনে বেনেডিক্টাইনদের মতো অক্ষয় ভক্তির প্রার্থনা করে চলে। একমাত্র ভক্তিমূলক প্রার্থনা করে চলে। একমাত্র ভক্তিমূলক প্রার্থনা ছাড়া পেতিত পিকপাসের কনভেন্টের সন্ন্যাসিনীগণ অন্যান্য বিষয়ে ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। বিশেষ করে তাদের পোশাক ছিল আলাদা। অন্যান্য দলের মেয়েরা সাদা পোশাক পরত, পেতিত পিকপাসের মেয়েরা পরত কালো পোশাক। ভক্তিমূলক উপাসনা এবং প্রার্থনাই ছিল দুটি সম্প্রদায়ের একমাত্র যোগসূত্র। যিশু ও মেরির বাল্যজীবন, পরবর্তী জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধেও দুই দলের ধারণা একই রকমের ছিল।
মার্তিন ভার্গা’র নিয়ম-কানুন ও রীতি-নীতি বড় কঠোর ছিল।
এই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসিনীরা সারা বছর কঠোর আত্মনিগ্রহের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করত। তারা লেন্ট ও অন্যান্য তিথি উপলক্ষে উপবাস করত। তারা রাত্রি একটার সময় ঘুম থেকে উঠত। তার পর তাদের ধর্মীয় নিয়ম-কানুনের বই পড়ত এবং রাত তিনটে পর্যন্ত প্রার্থনা গান করত। তারা খড়ের তোষকের উপর মোটা খসখসে চাদর পেতে তার উপর শুত। তারা একেবারেই স্নান করত না। শীতে আগুন জ্বালাত না। প্রতি শুক্রবার নিজেদের চাবুক মারত। একমাত্র আমোদ-প্রমোদের সময় ছাড়া তারা কোনও কথা বলত না। সব সময় মৌত অবলম্বন করে থাকত। আমোদ-প্রমোদের সময়কাল খুবই অল্প ছিল। বছরের ছয় মাস চুল দিয়ে তৈরি এক রকমের জামা পরতে হত তাদের। ১৪ সেপ্টেম্বর হতে ঈস্টারের দিন পর্যন্ত। আগে সারা বছরই এই জামা পরার নিয়ম ছিল। গরমকালে এই জামা পরা অসম্ভব এবং অসহ্য হত বলে পরে এই নিয়মের পরিবর্তন করে ছয় মাস করা হয়। কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে এই জামা পরতে শুরু করলেই কয়েক দিন যাবৎ সন্ন্যাসিনীদের দারুণ কষ্ট হত। অনেকের জ্বর হত। আনুগত্য, দারিদ্র্য, সতীত্ব, সারাজীবন চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকা প্রভৃতি নিয়মগুলো শপথ করে তাদের পালন করতে হত।
যেসব সন্ন্যাসিনী মাদার উপাধি লাভ করেছে তাদের মধ্য থেকে একদলকে কনভেন্টের প্রধান নির্বাচিত করা হত তিন বছরের জন্য। এই মাদারদেরই একমাত্র কথা বলার অধিকার ছিল। তাই এদের লাতিন ভাষায় বলা হত ‘মেরে ভোকালে বা সোচ্চার মাতা। কথা বলার অধিকারসম্পন্ন প্রধানাই পিকপাসের কনভেন্টে কোনও আগন্তুক এলে কথা বলত তার সঙ্গে। এই প্রধানা জীবনে মাত্র পর পর দু বার নির্বাচিত হতে পারত। অর্থাৎ তার কার্যকাল নয় বছরের বেশি হতে পারবে না।
কনভেন্টের ভারপ্রাপ্ত যাজককে কোনও সন্ন্যাসিনী চোখে দেখতে পেত না। এই যাজক যে চ্যাপেলে বাস করত সেই চ্যাপেল আর কনভেন্টের মাঝখানে সাত ফুট উঁচু এক দেয়ালের বাধা ছিল। যাজক যখন বক্তৃতা মঞ্চ থেকে বক্তৃতা দিত, সন্ন্যাসিনীরা তখন মুখের উপর অবগুণ্ঠন টেনে দিয়ে বক্তৃতা শুনত। তারা খুব নিচু সুরে কথা বলত পরস্পরের সঙ্গে। তারা সব সময় মাথা নিচু করে পথ হাঁটত। একমাত্র একজনেরই প্রবেশাধিকার ছিল কনভেন্টে, তিনি হলেন স্থানীয় ধর্মীয় অঞ্চলের আর্কবিশপ।
আর একজন পুরুষ ছিল কনভেন্টে। সে হল বাগানের মালী। সে ছিল বয়সে বুড়ো। তার উপস্থিতি সম্পর্কে সন্ন্যাসিনীরা যাতে সতর্ক হয়ে উঠতে পারে তার জন্য তার হাঁটুতে একটা ঘণ্টা বাধা থাকত।
প্রধানার নির্দেশমতো সব নিয়মকানুন অকুণ্ঠভাবে মেনে চলতে হত সন্ন্যাসিনীদের। সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। এক দ্বিধাহীন ধর্মগত আত্মসমর্পণের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হত নিজেদের। তারা তাদের প্রধানার অনুমতি ছাড়া কোনও কিছু পড়তে বা লিখতে পারত না। এ বিষয়ে তাদের আনুগত্য ছিল অন্ধ। কেউ কোনও প্রশ্ন বা প্রতিবাদ করতে পারত কখনও।
সন্ন্যাসিনীদের প্রত্যেককে পালাক্রমে একে একে প্রায়শ্চিত্ত ব্ৰত সাধন করতে হত। পৃথিবীতে যেখানে যত ভুল, আইন ও নীতিভঙ্গ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, অসাম্য, অন্যায়, অবিচার প্রভৃতি পাপকর্ম অনুষ্ঠিত হয়–এ প্রায়শ্চিত্ত হল সেই সব পাপ আর অন্যায়ের জন্য। বিকাল চারটে থেকে রাত চারটে পর্যন্ত একটানা বারো ঘণ্টা ধরে প্রায়শ্চিত্তকারিণী সিস্টারকে প্রধান বেদির সামনে পাথরের মেঝের উপর নতজানু হয়ে বসে থাকতে হত। তার হাত দুটি জোড়া থাকত এবং তার ঘাড়ে একটা দড়ি বাধা থাকত। যখন সে খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ত, যখন সে ক্লান্তি ও অবসাদ দুঃসহ হয়ে উঠত তার কাছে তখন সে শুধু সেইখানে হাত দুটো আড়াআড়িভাবে ক্রসের মতো করে উপুড় হয়ে পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়তে পারত। এইভাবে তাকে পৃথিবীর সমস্ত পাপীর জন্য প্রার্থনা করতে হত। এ কাজ নিঃসন্দেহে মহত্ত্বের পরিচায়ক।
যেখানে প্রায়শ্চিত ব্রত পালিত হয় তার সামনে একটি স্তম্ভের উপর সব সময় একটি বাতি থাকত।
প্রধান বেদির সামনে সব সময় একজন না একজন সিস্টার নতজানু হয়ে বসে প্রার্থনায় স্তব্ধ হয়ে থাকে। একেই বলে ‘পার্পেচুয়াল অ্যাডোরেশান’ বা চিরস্থায়ী প্রার্থনার প্রতিষ্ঠান।
মাদার উপাধিধারিণী সিস্টারদের নামঁ সেন্ট বা শহীদদের নাম অনুসারে রাখা হত না, তাদের নাম রাখা হত যিশু অথবা মাতা মেরির জীবনের বিভিন্ন ঘটনাবলির এক-একটিকে ভিত্তি করে, যেমন মাদার নেটিভিটি, মাদার কনসেপশান, মাদার অ্যানানসিয়েশান, মাদার প্যাশান প্রভৃতি। সেন্টদের নাম অনুযায়ী নাম রাখার কোনও বিধি নেই।
