সকাল হলে সে দু জন যোগ্য লোককে পাহারায় নিযুক্ত করে নিজে মুরগির দ্বারা বোকা বানানো এক ঘেঁকশেয়ালের মতো লজ্জাভরা মুখ নিয়ে পুলিশের সদর দপ্তরে গিয়ে পৌঁছল।
২.৬ আজ হতে অর্ধ শতাব্দী আগে
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
১.
আজ হতে অর্ধ শতাব্দী আগে ৬২ পেতিত র্যু পিকপাস অতি সাধারণ এক বাগানবাড়ি ছিল। এর সদর দরজাটা সব সময় আধখোলা অবস্থায় থেকে পথিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই দুটো জিনিস নজরে পড়ত। প্রথমেই নজরে পড়ত আঙুরলতায় ঢাকা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এক উঠোন আর এক অলস দারোয়ানের মুখ। প্রাচীরের বাইরে কতকগুলি গাছের মাথা দেখা যেত। যখন সূর্যের উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ত বাগানবাড়ির উঠোনটায় এবং মদপানের ফলে দারোয়ান সজীব হয়ে উঠত তখন কোনও পথিক তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে সেদিকে একবার তাকিয়ে আনন্দ অনুভব না করে পারত না। কিন্তু তার বহিরঙ্গের এই হাস্যোজ্জ্বল ভাব সত্ত্বেও বাড়ির ভেতরটায় একটা বিষাদ জমে থাকত সব সময়। কারা যেন তার মধ্যে সব সময় প্রার্থনা করত আর কাঁদত।
কেউ যদি ভেতরে একবার ঢুকত তা হলে একটা সরু সিঁড়ি পেত যাতে দু জন লোক পাশাপাশি উঠতে পারত না। সেই সিঁড়ি দিয়ে একটা বারান্দায় উঠে গিয়ে দেখত বারান্দাটা অন্ধকার এবং দুটো জানালা দিয়ে তাতে বাইরে থেকে কিছুটা আলো আসত। সেই বারান্দা দিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেলে একটা ছোট ঘরের দরজা দেখতে পেত। সে দরজায় কখনও তালাচাবি থাকত না। দরজাটা ঠেলে খুলে দু ফুট বর্গাকার একটা ঘরে ঢুকে দেখত ঘরটা একেবারে নির্জন এবং ঠাণ্ডা। দেয়ালগুলো সাধা ধবধবে। একটামাত্র জানালা দিয়ে দিনের আলো ঘরে আসত। ঘরের মধ্যে কোনও কিছু দেখতে পাওয়া যেত না কোনও পদশব্দ শোনা যেত না। ঘরের মধ্যে কোনও আসবাবপত্র ছিল না। একটা চেয়ার পর্যন্ত ছিল না। দেয়ালগুলোও ছিল একেবারে ফাঁকা। ঘরের। মধ্যেই ঢুকেই দেখত সামনের দেয়ালে সবুজ ফুল আঁকা একটা কাগজ চিটোন ছিল। ঘরের মধ্যে যে একটামাত্র জানালা ছিল তাতে ঘন করে লোহার গ্রিল দেওয়া ছিল, যার মধ্যে কোনও মানুষ ঢুকতে পারত না। তার ডান দিকে একটা দড়িতে একটা ঘণ্টা ঝোলানো ছিল।
ঘরখানায় কেউ সাহস করে ঢুকে পড়লে ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে এক নারীকণ্ঠ তাকে প্রশ্ন করত, কে ওখানে?
সে নারীকণ্ঠ ছিল বিষাদে ভরা। কিন্তু কোনও নারীকে চোখে দেখা যেত না। মনে হত সমস্ত ঘরখানা এক সমাধিগহ্বর। চারদিকের স্তব্ধ অন্ধকার দেয়ালগুলোর বাইরে কোনও জগৎ নেই। নারীকণ্ঠ তখন আবার বলত, আলোর দিকে ফের।
দরজার উল্টোদিকের দেয়ালে ভালো করে দেখলে একটা কাঁচের সার্সিওয়ালা দরজা পাওয়া যেত। সেই দরজা ঠেলে ভেতরে গেলে থিয়েটারের বক্সের মতো একটা ছোট ঘর পাওয়া যেত। তার মধ্যে দুটো চেয়ার আর একটা ছেঁড়া মাদুর পাতা থাকত।
আর এক নারীকণ্ঠ আবার বলত, আমি এখানে আছি। আপনি কী চান?
মানুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও কোনও মানুষ দেখা যেত না। এমনকি কারও শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাওয়া যেত না। মনে হত সমাধির ভেতর থেকে কোনও প্রেতাত্মা কথা বলছে।
আগন্তুক যদি ঠিকমতো সে কথার উত্তর দিত তা হলে ঘরখানার সামনের দিকে বদ্ধ একটা জানালার কিছুটা ভোলা হত। আর সেই আধখোলা জানালাপথে কালো অবগুণ্ঠনে ঢাকা একটা শুধু মাথা দেখা যেত। কালো অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে শুধু মুখ আর চিবুক ছাড়া আর কোনও অঙ্গ দেখা যেত না। আগন্তুক অন্ধকারে বসে থাকত আর সেই অবগুণ্ঠিত অশরীরী মুখটা শুধু কথা বলত, কিন্তু সে মুখ আগন্তুকের মুখপানে একবারও তাকাত না।
আগন্তুক অনেক চেষ্টা করেও সেই রহস্যময় মূর্তির কিছু দেখতে পেত না। শুধু শীতের কুয়াশায় ঢাকা সমাধিগহ্বরের ছায়া আর অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পেত না। এক ভয়ঙ্কর প্রশান্ত স্তব্ধতা আচ্ছন্ন করে রাখত জায়গাটাকে। কোনও প্রেমূর্তি পর্যন্ত দেখা যেত না। কোনও দীর্ঘশ্বাস পর্যন্ত শোনা যেত না।
এমনি করে সমস্ত কনভেন্টটা এক সুকঠোর স্তব্ধতা আর বিষাদে জমাট বেঁধে থাকত সব সময়। এই হল বার্নাদিনে কনভেন্ট। আগন্তুক যেখানে গিয়ে বসত, সেটা হল বড় বৈঠকখানা। যে নারীকণ্ঠ কথা বলত তার সঙ্গে সে এক সিস্টার। ভেতরের ঘরের একটামাত্র জানালার কাঁচের সার্সি দিয়ে বাইরের পৃথিবীর সামান্য কিছু আলো আসত। এই পবিত্র স্থানে বাইরের কেউ আসতে পারত না। কেউ কিছু দেখতে পেত না।
কিন্তু সেই ছায়া আর অন্ধকারের ওপারে জীবন আর আলোর এক বিষণ্ণ নীরব সমারোহ ছিল। কিন্তু সে আলো জীবন-মৃত্যুর মতোই হিমশীতল আর প্রাণচাঞ্চল্যহীন। তার ভেতরে কী হত না হত তা বাইরের জগতের কেউ দেখতে বা জানতে পারত না। কেউ কোথাও তা বর্ণনা করেনি।
.
২.
১৮২৪ সালে পেতিত র্যু পিকপাসে যে কনভেন্ট ছিল সেখানে বার্নাদিনে সম্প্রদায়ের কিছুসংখ্যক সন্ন্যাসিনী মার্কিন ভার্গার নিয়ম-কানুন মেনে চলত। কিন্তু যারা ক্লেয়ারভয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা ছিল বেনেডিক্টাইনদের মতো সিটো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। তারা ছিল সেন্ট বার্নার্দ নয়, সেন্ট বেনেডিক্টের অধীন। ১৯২৫ সালে মার্তিন ভাগা বেনেডিক্টাইন বার্নাদিনে সম্প্রদায়ের মিলনে এক যুগ্ম ধর্মসভার প্রতিষ্ঠা করেন, যার সদর দপ্তর ছিল সালামাঙ্কাতে এবং আলকালাতে তার এক সহ-প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়।
