পুলিশের সাহায্য নিতে কিছুটা দেরি হল জেভার্তের। রোলার চৌরাস্তার কাছে তার লোকদের সঙ্গে কিছুটা কথা বলতেও দেরি হল। ফলে পলাতক আসামি তার চোখের আড়ালে চলে গেল। জেভার্ত বুঝতে পারল নদীর পুলটা পার হয়ে অনুসরণকারীদের চোখে ধুলো দিয়ে সে পালিয়ে যাবে। তাই সে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে শিকারি কুকুরের মতো শিকারের সন্ধানে দ্রুতবেগে এগিয়ে গেল পুলটার মুখের কাছে। যে লোকটা পুল পার হবার পয়সা আদায় করে তার সঙ্গে কথা বলে জানল ভলজাঁ এই পুল পার হয়েই পালিয়েছে। পয়সা আদায়কারী লোকটা বলল, আট বছরের মেয়ের সঙ্গে একটা লোককে দেখেছি। আমি তার কাছ থেকে দুই স্যু চেয়েছিলাম।
জেভাৰ্ত ঠিক সময়েই পুলটার মুখে এসে চাঁদের আলোয় দেখতে পেল কসেত্তেকে নিয়ে ভজ পুলটা পার হয়ে যাচ্ছে। সে দেখল ভলজাঁ কুল-দ্য-সাক জেনরতের দিকে যাচ্ছে। তার মনে হল সে যাবে র্যু দ্রয়েত মুরের দিকে। সেখান থেকে বেরোবার একমাত্র পথ হল পেতিত কু্য পিপাস। সেই পথে যাতে সে পালাতে না পারে তার জন্য একটা লোককে পেতিত পিকপাসের সামনে পাঠিয়ে দিল জেতার্ত। তার পর সে তার দল নিয়ে আর্সেনালের পেছন দিকে এগিয়ে গেল। তার মনে হল এটা যেন এক ধরনের শিকার। একটা বন্য শূকরকে ধরতে হলে একদিকে যেমন শিকারির বুদ্ধি আর চাতুর্য দরকার তেমনি দরকার একদল শিকারি কুকুরের। এইভাবে সব ব্যবস্থা করে সে দেখল ডান দিকে বাঁ দিকে ভলজাঁ’র পালাবার সব পথ বন্ধ করে দিয়ে তাকে ফাঁদে ফেলা হল চমৎকারভাবে। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে এক টিপ নস্যি নিল জেভার্ত।
এইভাবে ভলজাঁ’র মুক্তির শেষ আশা ও সম্ভাবনাটুকু নিঃশেষে মুছে দিয়ে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এক পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করতে লাগল সে। মাকড়সার জালের মধ্যে মাছি পড়লে সে মাছির ব্যর্থ সংগ্রাম দেখে মাকড়সা যে আনন্দ পায়, খাবার মধ্যে কোনও উঁদুর পড়ে বাঁচার জন্য আঁকপাক করতে থাকলে বিড়াল যেমন তা দেখে যে আনন্দ পায় তেমনি ভলজাঁ’র কল্পিত সগ্রামের ব্যর্থতার কথা মনে ভেবে আনন্দ পেতে লাগল জেভাৰ্ত। সে যে কুটিল জাল বিস্তার করেছে সে জাল ইচ্ছামতো গুটিয়ে নিতে পারে সে। ভলজাঁ যত বেপরোয়া বা বিপজ্জনকই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে সমবেত প্রতিকূল শক্তির প্রতিরোধ করতে কোনওমতেই পারবে না সে।
সুতরাং বাঁ দিকে ডান দিকে পথের ধারে সব জায়গা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে এগিয়ে যেতে লাগল জেভার্ত। এইভাবে দেখতে দেখতে সে যখন তার পাতা জালের মাঝখানে গিয়ে হাজির হল তখন দেখল মাছি পালিয়ে গেছে। যেখানে ভলজাঁ’র থাকার কথা সে জায়গা শূন্য। যে লোককে পাহারায় নিযুক্ত করেছিল সে দেখতে পায়নি ভলজাঁকে।
জেভার্তের ক্রোধের প্রচণ্ডতা সহজেই অনুমেয়। কখনও কখনও এমনিই হয়। অনেক সময় চারদিকে শিকারি কুকুরের দল ঘিরে থাকলেও তার মধ্যে থেকে একটা হরিণ ঐন্দ্রজালিকভাবে পালিয়ে যায়। তখন মনে হয় হরিণ নয়, যেন এক সুদক্ষ জাদুকর। জেভার্তেরও এ ক্ষেত্রে তাই মনে হচ্ছিল। তাই বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল।
একথা অনস্বীকার্য যে নেপোলিয়ন রুশ অভিযানে ভুল করেছিলেন, আলেকজান্ডার ভুল করেছিলেন ভারত অভিযানে, সিজার ভুল করেছিলেন আফ্রিকা অভিযানে, সাইরাস স্কাইথিয়ায়, ভলজাঁ’র বিরুদ্ধে অভিযানে জেভার্তও ভুল করেছিল। ভলজাঁকে চিনতে তার দেরি হয়েছিল, তাকে এক নজরে দেখেই তাকে চিনতে পারা উচিত ছিল–এটাই ছিল তার প্রথম ভুল। তার পরেও যে ভুল করেছিল গার্বোর বাড়িতে যে তাকে চিনতে পেরেও সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করেনি। আবার রুপন্তয়ে যে তাকে নিশ্চিতরূপে চিনতে পেরেও গ্রেপ্তার করেনি; রোলার চৌরাস্তার মাথায় চাঁদের আলোয় তাকে দেখতে পেয়েও তাকে গ্রেপ্তার করেনি সে। ভাবনা-চিন্তা করে কোনও কিছু করা বিজ্ঞজনোচিত কাজ, কিন্তু কোনও নেকড়ে বা পলাতক কয়েদির মতো সদাসতর্ক কোনও জীবকে ধরার সময় শিকারি বা পুলিশ অনেক বেশি তৎপর হয়ে ওঠে। সে নিজেকে বেশি শক্তিশালী ভেবেছিল। সিংহকে ইঁদুর ভেবে খেলা করতে গিয়েছিল তার সঙ্গে। আবার নিজের শক্তিকে অহেতুক কম ভেবে পুলিশের সাহায্য চাইতে গিয়ে অমূল্য সময় নষ্ট করাটাও অন্যায় হয় তার। একজন কূট প্রকৃতির সুদক্ষ ডিটেকটিভ হয়েও এই সব ভুল করে বসে সে। একজন অভিজ্ঞ শিকারি কুকুর হয়েও ভুল করে বসে শিকার ধরতে গিয়ে।
কিন্তু ভুল কে করে না আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাগত কৌশলের মধ্যেও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। যে কোনও বড় ভুল হচ্ছে মোটা দড়ির মতো। সরু সরু অনেক সুতোর সমন্বয়ে যেমন এক-একটা মোটা দড়ি গড়ে ওঠে, তেমনি ছোটখাটো ভুলের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে এক-একটা বড় রকমের ভুল। পূর্বে মার্সিয়া আর পশ্চিমে ভ্যালেন্তিলিয়ার মাঝখানে অহেতুক ইতস্তত করে ভুল করেছিলেন হ্যাঁনিবল, কাপুয়াতে অকারণে দেরি করেছিলেন। দাঁতন আর্সি-সুর-আবেতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
ভুল করলেও জেতার্ত যখন দেখল ভলজাঁ পালিয়ে গেছে তখন সে মাথা গরম করল না বা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল না। সে বুঝল তার শিকার হাতছাড়া হয়ে গেলেও বেশি দূর যেতে পারেনি। সে তাই আশেপাশে কয়েকটি জায়গায় পাহারায় নিযুক্ত করে রাখল কয়েকজনকে। পাহারাদারেরা লুকিয়ে ওত পেতে রইল। হঠাৎ একসময় জেভার্ত দেখল রাস্তার লাইটপোস্টের মধ্যে একটা বড় দড়ি নেই। এটা এক মূল্যবান হদিশ হলেও জেভাৰ্ত ভাবল ভলজাঁ জেলরতের দিকে গেছে। সে তাই সেখানে খুঁজতে গেল। ওদিকের পথটা বাগানের একটা পাঁচিলের গাঁয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে। বাগানটার ওপারে আছে কিছু আবাদযোগ্য জমি। সে ভাবল ভলজাঁ এই পথেই গেছে। যদি সে সে-পথে যেত তা হলে তার আর অব্যাহতি ছিল না। জেভার্ত বাগানটা তন্ন তন্ন করে খুঁজল ঠিক যেন খড়ের গাদায় একটা সূচ হারিয়ে গেছে।
