পরের দিন ভলজাঁ পালিয়ে যায় বাড়ি ছেড়ে। বেরোবার সময় ভুলজা’র হাত থেকে পাঁচ ফ্রা’র একটা মুদ্রা পড়ে যায়। তার শব্দ শুনে বাড়িওয়ালি বুঝতে পারে ভলজাঁ চলে যাবে। সে জেতার্তকে সাবধান করে দেয়। ভলজাঁ তখন বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে জেভার্ত দু জন লোক নিয়ে বুলভার্দের রাস্তায় গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।
জেভাৰ্ত পুলিশ বিভাগের বড় কর্তাদের কাছে এ বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতা চেয়ে আবেদন করে কিন্তু কাকে সে গ্রেপ্তার করতে চায় তা সে জানায়নি। তিনটে কারণে সে একথা জানায়নি। প্রথম কারণ হল, হঠাৎ কিছু করে বসলে ভলজাঁ সাবধান হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত সরকারি নথিপত্রে ভয়ঙ্করজনকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত উল্লিখিত এক জেল-পলাতক কয়েদিকে ধরতে পারাটা তার মতো এক অফিসারের পক্ষে এক বিরাট গৌরব এবং প্যারিসের পুলিশ বিভাগ এটা জানতে পারলে এই কৃতিত্ব ও গৌরব যাতে সে লাভ করতে
পারে হিংসাবশত তার জন্য তারা চেষ্টা করবে। সুতরাং কাজটা ভাবনা-চিন্তা করে স্থির করতে হবে। তৃতীয়ত জেভার্তের মনের মধ্যে একটা শিল্পীসুলভ ভাব ছিল বলে এক নারকীয় আকস্মিকতার প্রতি একটা মোহ ছিল তার। এত বড় কাজের কথা আগে থেকে ঘোষণা করে ফেললে সে কাজ সম্পাদনের মধ্যে কোনও জয়ের গৌরব থাকবে না পরিশেষে। কাজটা তাই সে অকস্মাৎ করে ফেলে তাক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল সকলকে।
জেভার্ত তাই ভলজাঁকে সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিটি বৃক্ষান্তরালে ও পরে মাঠে ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছিল। এমনকি ভলজাঁ যখন তাকে দেখতে পায়নি, যখন সে নিজেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ভেবেছিল তখনও তার ওপর কড়া নজর রেখেছিল জেভাৰ্ত।
তবু সে কেন তাকে গ্রেপ্তার করেনি এত কাছে এসেও? তার শুধু একটাই কারণ–তার মনে তখনও সন্দেহ ছিল। সে তখনও নিশ্চিত হতে পারেনি।
একথা আমাদের মনে রাখতে হবে, এ বিষয়ে তখনকার দিনে প্যারিসের পুলিশমহল সাংবাদিকদের জ্বালায় বড় বিব্রত বোধ করছিল। ভালো করে নিশ্চিত না হয়ে উপযুক্ত প্রমাণাদি সংগ্রহ না করেই পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করে বসলে খবরের কাগজে পুলিশের নামে নিন্দাবাদ প্রকাশিত হত। পুলিশকে ধিক্কার জানাত সাংবাদিকরা। ফলে পার্লামেন্টে কথাটা উঠত এবং সদস্যদের কাছ থেকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হত মন্ত্রীদের। পুলিশ বিভাগ তখন স্বাভাবিকভাবেই বিব্রত হয়ে উঠত এবং এক অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়ত। কোনও নির্দোষ লোকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করাটা এক গুরুতর অন্যায়। কোনও পুলিশ এই ধরনের বড় রকমের এক ভুল করে বসলে তার চাকরি থেকে সে বরখাস্ত হত।
এই ধরনের এক সংবাদ সেকালে একদিন প্রায় কুড়িটা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। সংবাদটা এই: গতকাল প্রবীণ পকূকেশ এক পিতামহ, এক বাড়ির মালিক, করদাতা এবং সমাজের একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি তাঁর আট বছরের পৌত্রীকে নিয়ে বেড়াতে বেরোলে তাকে পুলিশ এক পলাতক কয়েদি হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশের সদর দপ্তরে নিয়ে যায়।
এই সব সংবাদ পুলিশের পক্ষে সত্যিই অপমানজনক।
তাছাড়া আমরা জানি জেভার্তের একটা নীতি আছে। সে পুলিশ হলেও তার বিবেক বলে একটা জিনিস আছে। তার মনে তখনও সন্দেহ ছিল। ভলজাঁ যখন তার সামনে দিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায় সে তখন তার শুধু পিঠটা দেখতে পায়। তাছাড়া তখন তার মুখ দেখেও চেনার উপায় ছিল না। সে নতুন করে এক ঘোরতর বিপদে পড়ায় কসেত্তের জন্য উদ্বেগ তার দারুণ বেড়ে যায়, সে পাগলের মতো যেখানে-সেখানে আশ্রয়ের সন্ধান করতে থাকে। এই সব উদ্বেগ, অশান্তি আর চরম দুরবস্থা হঠাৎ যেন। তার বয়সটা বাড়িয়ে দেয়, তার চোখ-মুখ বিবর্ণ ও বিকৃত হয়ে ওঠে এমনভাবে যে তাকে তখন তার মুখ ও চেহারা দেখে চিনতে পারাটা কোনও ধুরন্ধর পুলিশের পক্ষেও সম্ভব ছিল না। তাছাড়া তখন তার পোশাকটা অদ্ভুত ধরনের ছিল। দেখে মনে হত যেন কোনও প্রবীণ স্কুলমাস্টার। তার ওপর থেনার্দিয়ের জেতার্তকে বলেছিল যে কসেত্তেকে তার কাছ থেকে নিয়ে গেছে সে তার পিতামহ; আবার সরকারি সূত্রে জানা যায় সে মারা গেছে। এই সব কিছু মিলে জেভার্তের মনের মধ্যে অনিশ্চয়তার ভাবটা বাড়িয়ে দেয়।
জেভার্ত একবার ভাবে সে সরাসরি লোকটার কাছে গিয়ে তার পরিচয় সম্বন্ধে কাগজপত্র চাইবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে লোকটা যদি ভুল না হয়, আবার কোনও নির্দোষ ভদ্রলোকও না হয়, যদি সে প্যারিসের এক দাগি অপরাধী বা ডাকাতদলের সর্দার হয় তা হলে তাকে ঘিরে, যে গোপন চক্ৰজাল বিস্তৃত হয়েছে সে জাল ছিন্ন করতে হলে অনেক ঝামেলা সহ্য করতে হবে তাকে। তাকে অনেক তদন্ত ও অনেক ঘোরাঘুরি করতে হবে এবং তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে আসল ভলজাঁকে ধরতে পারার চরম গৌরব অর্জন করার ব্যাপারটা সোনার ডিমের লোভে হাঁসের পেট কাটার মতো হাস্যাস্পদ ও অবান্তর হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং অপেক্ষা করায় ক্ষতি কী? জেভার্তের দৃঢ় বিশ্বাস ভলজাঁ কিছুতেই তার জাল থেকে পালাবে না।
জেতার্ত তাই ভলজাঁকে র্যু পন্তয়ের একটা হোটেল পর্যন্ত অনুসরণ করে চলল। হোটল থেকে যে আলো বেরিয়ে আসছিল তাতে সে ভলজাঁকে স্পষ্ট দেখতে পেল। সে বুঝতে পারল সে-ই হচ্ছে ভলজাঁ। কোনও মা তার হারানো সন্তানকে ফিরে পেলে অথবা কোনও বাঘ তার হারানো শিকারকে ফিরে পেলে যেমন হয় তখন জেভার্তের মনেও এই ধরনের এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি জাগছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে তার ভয়ও লাগছিল। সে যখন বুঝতে পারল পলাতক লোকটা জাঁ ভলজাঁ এবং তাকে ধরার জন্য তার হাতে মাত্র দু জন পুলিশ আছে তখন সে রুপন্তয়ের পুলিশ ফাঁড়িতে সাহায্য চাইল। আমরা কাঁটাওয়ালা ছড়ি ধরার সময় কাটার ভয় করি।
