ফাঁতিনেকে ভোলেনি জেভাৰ্ত। আর সে একথাও ভোলেনি যে ভলজাঁকে গ্রেপ্তার করার সময় সে তিন দিনের সময় চেয়েছিল, যাতে সে মঁতফারমেলে গিয়ে ফাঁতিনের মেয়েকে নিয়ে আসতে পারে। এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়েছিল জেতার্ত। তার একথাও মনে পড়ে গেল যে মঁতফারমেলের গাড়িতে চাপার সময়েই ভলজাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাছাড়া এর আগের দিনও সে মঁতফারমেল অঞ্চলে একবার গিয়েছিল যদিও সে গাঁয়ের মধ্যে তাকে দেখা যায়নি। মঁতফারমেল কেন গিয়েছিল ভলজাঁ একথা অন্য কেউ না জানলেও জেভার্তের সে কারণ বুঝতে বাকি নেই। সে সেখানে গিয়েছিল ফাঁতিনের সন্তানের জন্য এবং সেই সন্তানকে একজন বিদেশি অপরিচিত ব্যক্তি অপহরণ করে নিয়ে যায়। তবে ভলজাঁই সেই ব্যক্তি। কিন্তু ভলজাঁ মারা গেছে বলে খবর বেরিয়েছে। যাই হোক, এ বিষয়ে কাউকে কোনও কথা না বলে একদিন মঁতফারমেল যাবার গাড়ি ধরে জেভার্ত।
ঘটনাটা জানার জন্য সেখানে যায় জেভাৰ্ত। সেখানে গিয়ে দেখে ঘটনাটা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তাতে আরও জট পাকিয়ে গেছে।
কসেত্তেকে নিয়ে যাবার পর প্রথম প্রথম হতাশ হয়ে পড়ে থেনার্দিয়েরেরা এবং সেই হতাশার আঘাতে কথাটা বলে বেড়াতে থাকে সারা গায়ে। কসেত্তে’র অপহরণ নিয়ে গাঁয়ের নানা লোকে নানা কথা বলতে থাকে। এ বিষয়ে বিভিন্ন কাহিনী প্রচারিত হতে থাকে। পুলিশ রিপোর্টের মধ্যে তাই অসংলগ্নতা দেখা দেয়। দুঃখ আর হতাশার প্রথম আঘাতের ব্যথাটা কাটলে পর থেনার্দিয়ের তার সাবধানি বুদ্ধির সাহায্যে একটা কথা বুঝতে পারে। এ বিষয়ে অভিযোগ করে সরকারি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত হবে না। সে যদি বিধিমতো এই অপহরণ সম্বন্ধে অভিযোগ করে সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে তা হলে তার ও তার নানারকমের সন্দেহজনক কাজ-কারবারের ওপর আইনের ঈগল দৃষ্টি পড়বে। পেঁচা কখনও কোনও বাতির আলোয় নিজেকে দেখা দিতে চায় না। সে যে পনেরোশো ফ্রাঁ নিয়েছে সে কথা কী করে চাপা দেবে সে? সে তাড়াতাড়ি সুর পাল্টে ফেলে এই সব ভেবে। তার স্ত্রীর কণ্ঠরোধ করে দেয় এবং গাঁয়ের কোনও লোক চুরির কথাটা তুলঁলেই চরম বিস্ময় প্রকাশ করতে থাকে যেন মেয়েটা আসলে অপহৃত হয়নি। আসল কথা অকস্মাৎ কসেত্তেকে তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সে ঘাবড়ে গিয়েছিল। কসেত্তে’র প্রতি স্নেহবশত সে চেয়েছিল কসেত্তেকে কিছুদিন পরে তার কাছ থেকে নিয়ে যাবে। সে ভাবতে পারেনি এত তাড়াতাড়ি তাকে নিয়ে যাবে কেউ। জেভার্ত যখন মঁতফারমেলে তদন্ত করতে এসেছিল তখন থেনার্দিয়ের বলেছিল, যে ভদ্রলোক কসেত্তেকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছিল সে তার পিতামহ। থোর্দিয়ের এইভাবে জাঁ ভলজাঁকে কসেত্তে’র পিতামহ হিসেবে চালিয়ে খুশি হয়।
তবু জেভাৰ্ত এ কাহিনীর সত্যতা নির্ণয়ের জন্য কয়েকটা প্রশ্ন করে। কসেত্তে’র এই পিতামহ লোকটা কে? তার নামই বা কী? থেনার্দিয়ের সরলভাবে উত্তর করে, সে একজন ধনী জমিদার। সে বলে, আমার মনে হয় লোকটার নাম মঁসিয়ে গিলম ল্যাম্বার্ত।
ল্যাম্বাৰ্ত নামটা সম্মানজনক। জেভার্ত প্যারিসে চলে যায়। সে আপন মনে বলে, ভলজাঁ মারা গেছে। আমি একটা গাধা।
জেভার্ত ব্যাপারটা ভুলে যেতে বসেছিল। তার পর ১৮২৪ সালের মার্চ মাসে একটা ঘটনার কথা জানতে পারে। প্যারিসের মফস্বল অঞ্চলে সেন্ট মেদার্দে একজন বাস করে। সে নিজে ভিখারি হয়েও ভিক্ষা দেয়। লোকটা তার ব্যক্তিগত আয়ের উপর স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করে এবং একটা ছোট মেয়ে তার কাছে থাকে। মেয়েটা শুধু জানে সে মঁতফারমেল থেকে এসেছে। এছাড়া তার বর্তমান অবস্থার কথা সে কিছুই জানে না। জেভার্ত তখন কান খাড়া করে তৎপর হয়ে ওঠে।
একজন প্রবীণ ভিখারি যে আগে অপরাধীদের সম্বন্ধে পুলিশকে খবরাখবর দিত সে জেভাৰ্তকে সেন্ট মেদর্দের বসবাসকারী লোকটা সম্বন্ধে আরও কিছু খবর দেয়। সে জেভার্তকে বলে, লোকটা অদ্ভুত ধরনের। সে একমাত্র গরিবদের সঙ্গে ছাড়া কারও সঙ্গে কোনও কথা বলে না। সে সব সময় একটি হলুদ রঙের কোট পরে যার দাম লক্ষ লক্ষ টাকা কারণ তাতে অনেক ব্যাংকনোট সেলাই করা আছে।… এ সব কথা শুনে জেভার্তের কৌতূহল বেড়ে যায়। সেই লোকটাকে একবার নিজের চোখে দেখার জন্য সে সেই ভিখারির বহিরঙ্গের পোশাকগুলো ধার নিয়ে তাই পরে রোজ সন্ধেবেলায় সেন্ট মেদার্দ অঞ্চলে পথের ধারে এক জায়গায় বসে প্রার্থনার স্তোত্র আওড়াত। আর চোখ দুটো খুলে তাকিয়ে থাকত লোকটা পথ চেয়ে।
সেই সন্দেহভাজন ব্যক্তি সন্ধের সময় নিয়মিত আসত এবং ছদ্মবেশী ভিখারিকে পয়সা দিত। সে ভিখারিবেশী জেভার্তের দিকে তাকালে জেভাৰ্তও তার দিকে তাকাত ভিখারিবেশী জেভাৰ্ততে চিনতে পেয়ে ভলজাঁ যে বিস্ময়ের চমক অনুভব করে, জেভার্তও ভলজাঁকে চিনতে পেরে অনুরূপ চমক অনুভব করে। সেই সঙ্গে জেভার্ত বুঝতে পারে অন্ধকারে তার ভুল হতে পারে। সরকারি খবরে জানা যায় ভলজাঁ মারা গেছে। এ বিষয়ে সন্দেহের প্রচুর অবকাশ আছে। জেভাৰ্তও দ্বিধাবশত এ বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে তার ওপর হাত দেয়নি।
লোকটাকে অনুসরণ করে জেভার্ত একদিন তার বাসায় যায়। গার্বোর সেই। বাড়িটাতে গিয়ে বাড়িওয়ালি মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে। মেয়েটা বলে, লোকটার হলুদ ওভারকোটটায় লক্ষ লক্ষ টাকা আছে সেলাই করা। সে নিজে একদিন এক হাজার ফ্রা’র একটা নোট ভাঙিয়ে আনে। একথা শুনে সেদিন সন্ধ্যার সময় জেভাৰ্তও সেই বাড়িটার মধ্যে একটা ঘর ভাড়া করে। সে ভলজাঁ’র ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শোনার জন্য কান পেতে থাকে। কিন্তু ভুল বারান্দায় তার ঘরের সামনে বাতির আলো দেখে চুপ করে থাকে। ফলে জেভার্তের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।
