সে কথা তো আমি আপনাকে একটু আগেই মনে করিয়ে দিয়েছি।
ঠিক আছে, এখন তুমিও আমার জন্য কিছু করতে পার।
হঠাৎ ফশেলেভেন্ত ভলজাঁ’র হাত দুটো ধরে টেনে নিয়ে আবেগে এমনভাবে বিচলিত হয়ে উঠল সে যে কোনও কথা বলতে পারল না। তার পর সে আবেগের সঙ্গে বলে ওঠে, যদি আমি এখন আপনার জন্য কিছু করে আপনার ঋণ কিছুটা শোধ করতে পারি তা হলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেব আমি। এখন দরকার হলে আপনার জীবন আমি রক্ষা করব। আমি আপনার দাস। আপনি যা বলবেন তাই করব আমি।
তার মুখটা যেন সহসা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার মুখ থেকে যেন একটা জ্যোতি বার হচ্ছিল। সে বলল, এখন আমাকে কী করতে বলছেন?
আমি বলছি কি, তোমার থাকার ঘর আছে এখানে?
এই কনভেন্টের যে দিকটা ভেঙে গেছে সেই ভগ্ন্যুপের কাছে আমার একটা বাসা আছে। তাতে তিনখানা ঘর আছে। সেদিকে কেউ যায় না।
সত্যিই, সে বাসাটা এমন জায়গায় আছে যে ভলজাঁ আগে দেখতে পায়নি তা।
ভলজাঁ বলল, আমার দুটো কথা তোমায় রাখতে হবে। প্রথমত, তুমি আমার সম্বন্ধে যা জান কাউকে তা বলবে না। আর দ্বিতীয়ত, আমার সম্বন্ধে এর থেকে বেশি কিছু জানতে চাইবে না।
ফশেলেভেন্ত বলল, ঠিক আছে, আপনি যা বলছেন তাই হবে। আপনার মতো ঈশ্বরবিশ্বাসী ও ভক্তিমান মানুষ কখনও কোনও অন্যায় বা অপমানজনক কোনও কাজ করতে পারেন না। আপনিই আমাকে এ কাজে নিযুক্ত করেন। আপনার আদেশ মেনে চলাই আমার কর্তব্য। আপনি কী করেন না-করেন তা দেখা আমার কাজ নয়।
ধন্যবাদ, এখন আমার সঙ্গে এস। একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে আসতে হবে।
আর কোনও কথা না বলে অনুগত কুকুরের মতো ভলজাঁকে অনুসরণ করতে লাগল ফশেলেভেন্ত।
ফশেলেভেস্ত বলল, একটা শিশু আছে নাকি?
আধ ঘণ্টার মধ্যেই কসেত্তেকে মালীর বাসায় নিয়ে গিয়ে আগুন জ্বালা এক গরম ঘরের মধ্যে একটি বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হল। ভলজাঁ তার কোট আর টুপিটা পরল। ফশেলেভেন্ত তার হাঁটুর উপর থেকে সেই চামড়ার আবরণী আর ঘণ্টাটা খুলে রাখল।
এরপর তারা দু জনে এক টেবিলে পাশাপাশি বসল। টেবিলের উপর মাখন, রুটি, এক বোতল মদ আর দুটো গ্লাস রাখল ফশেলেভেন্ত। তার পর ভলজাঁ’র একটা হাঁটুতে হাত রেখে সে বলল, পিয়ের ম্যাদলেন, আমাকে তা হলে আপনি চিনতেই পারলেন না। আপনি যাদের জীবন বাঁচান পরে তাদের ভুলে যান। কিন্তু তারা আপনাকে ভোলে না। আপনি কিন্তু এদিক দিয়ে অকৃতজ্ঞ পিয়ের ম্যাদলেন।
.
১০.
যেসব ঘটনা আমরা ঘটতে দেখলাম সেসব ঘটনা নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই ঘটে যায়।
জাঁ ভলজাঁ যেদিন দ্বিতীয়বার জের্তের হাতে গ্রেপ্তার হয় এবং যেদিন সন্ধ্যাবেলায় মঁতফারমেলের জেল হাজত থেকে পালিয়ে যায় সেদিন সেখানকার পুলিশমহল ভেবেছিল সে প্যারিসে পালিয়ে যাবে। প্যারিস শহর এমনই এক বিরাট ঘূর্ণাবর্ত যেখানে যে কোনও ব্যক্তিই বিশাল জনারণ্যে সহজেই হারিয়ে যেতে পারে, যেখানে বিশাল সমুদ্রে ভাসমান ভগ্ন জাহাজের মতো যে কোনও মানুষ সহজেই ডুবে যেতে পারে। সব পলাতক আসামি একথা ভালোভাবেই জানে যে প্যারিসের জনবহুল পথে-ঘাটে যেভাবে কোনও লোক গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে তেমনটি কোনও গভীর অরণ্যে থাকা যায় না। পুলিশমহলও একথা ভালোভাবেই জানে বলে যে কোনও পলাতক আসামির জন্য প্যারিস শহরকে তারা তন্ন তন্ন করে খোঁজে। ভলজাঁকে ধরার জন্য প্যারিসে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুসন্ধানকার্য চালানো হয়, তাতে সাহায্য করার জন্য জেভার্তকে ডেকে পাঠানো হয় এবং জেভাৰ্তও তাতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে জেভার্তের উদ্যম এবং তৎপরতা পুলিশ বিভাগের সেক্রেটারি মঁসিয়ে শ্যাপুলেতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জেভার্তের কাজকর্ম দেখে তার প্রতি আগে হতেই আগ্রহান্বিত হন শ্যাপুলেত এবং তাই তিনি জেভার্তকে মন্ত্রিউল-সুর-মের থেকে বদলি করে প্যারিসে নিয়ে আসেন। তার ওপর যে কাজের ভার দেওয়া হয় সেই কার্য সম্পাদনের জেতার্তও বিশেষ সম্মানজনক দক্ষতার পরিচয় দান করে।
১৮২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কোনও একদিন একটা খবরের কাগজে জাঁ ভলজাঁ’র নাম না দেখা পর্যন্ত তার কথা একবারও মনে করেনি জেভাৰ্ত। নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ত না জেভাৰ্ত। কিন্তু একজন গোঁড়া রাজতন্ত্রী হিসেবে সে বেয়নে যুবরাজের আগমন সম্বন্ধে তার কৌতূহল ছিল বলে সে একদিন খবরের কাগজটা পড়তে থাকে। যুবরাজের আসার ব্যাপারটার পর গোটা কাগজটার ওপর চোখ বুলাতে বুলোতে হঠাৎ কাগজের একটা পাতার তলার দিকে একটা খবর তার চোখে পড়ে। তাতে কয়েদি জাঁ ভলজাঁ’র মৃত্যুর সংবাদ ছিল। ঘটনার বিবরণটা এমন নিখুঁত ছিল যে তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ ছিল না। ফলে সে ভাবল এতে ভালোই হল। ক্রমে সে ভলজাঁর ব্যাপারটাকে মন থেকে মুছে ফেলে একেবারে।
প্যারিসে বদলি হয়ে আসার পর জেতার্ত পুলিশ বিভাগের আসা একটা অভিযোগের বিবরণ থেকে জানতে পারে মঁতফারমেলের একটা হোটেল থেকে একটি শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এই অপহরণকার্য রহস্যময়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়। শিশুটি একটি মেয়েছেলে এবং তার বয়স সাত অথবা আট। তার মা এক হোটেল মালিকের ওপর তার সব ভার দিয়ে যায়। মেয়েটির নাম কসেত্তে এবং তার মা’র নাম ফাঁতিনে যে কোনও এক হাসপাতালে মারা যায়। পুলিশের কাছে এ বিষয়ে যে অভিযোগ পাওয়া যায় তাতে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পাওয়া না গেলেও সে অভিযোগ জেতার্তকে ভাবিয়ে তোলে।
