তার পায়ের কাছে কসেত্তে’র অচেতন দেহটা স্তব্ধ হয়ে পড়ে ছিল। সে তার উপর ঝুঁকে তার বুকের স্পন্দন অনুভব করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার সে হৃৎস্পন্দন এতটা ক্ষীণ যে, মনে হল যে কোনও মুহূর্তে সে স্পন্দন থেমে যেতে পারে একেবারে।
কী করে সে কসেত্তের এই হিমশীতল দেহটাকে গরম করে তুলঁবে? কী করে তার হারানো চেতনাকে ফিরিয়ে আনবে? এ ছাড়া আর কোনও চিন্তা ছিল না তার মনে।
সে তখন মরিয়া হয়ে চালা থেকে বেরিয়ে পাগলের মতো ছুটতে লাগল। যা-ই ঘটুক মিনিট পনেরোর মধ্যে কসেত্তেকে কোনও এক গরম জায়গায় একটা বিছানার মধ্যে শোয়াতে হবে।
.
৯.
ভলজাঁ সোজা তরমুজক্ষেতে কাজ করতে থাকা লোকটার কাছে চলে গেল। কোটের পকেট থেকে কতকগুলি মুদ্রা বার করে হাতে ধরল সে। লোকটা নত হয়ে কী করছিল বলে ভলজাঁকে দেখতে পায়নি সে।
ভলজাঁ তার কাছে গিয়ে কোনও ভূমিকা না করে সরাসরি বলল, একশো!
লোকটা চমকে উঠে তার পানে তাকাল মুখ তুলে।
ভলজাঁ আবার বলল, যদি তুমি রাত্রির মতো আমাকে একটু আশ্রয় দিতে পার তা হলে তোমাকে একশো ফ্রাঁ দেব।
চাঁদের আলো তার সমস্ত মুখখানার উপর ছড়িয়ে পড়েছিল।
লোকটা আশ্চর্য হয়ে বলল, পিয়ের ম্যাদলেন আপনি!
সেই গভীর রাত্রিতে সেই নির্জন বাগানবাড়িতে একজন অপরিচিত লোকের কণ্ঠে তার নাম উচ্চারিত হতে শুনে চমকে উঠল ভলজাঁ চরম বিস্ময়ে। এটা সে কোনওমতেই আশা করতে পারেনি। যে তার নাম ধরে ডেকেছিল সে লোকটি একটু কুঁজো আর খোঁড়া ছিল। সে মাঠে কাজ করা চাষিদের পোশাক পরে ছিল। চামড়ার নরম আবরণী দিয়ে তার বাঁ পায়ের হাঁটুটা ঢাকা ছিল। তাতে একটা ঘন্টা বাধা ছিল। তার মুখের উপর একটা গাছের ছায়া পড়ায় মুখটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।
লোকটা তার মাথা থেকে টুপি খুলে বলে যেতে লাগল, ঈশ্বরের নামে বলছি, আপনি এখানে কী করে এলেন? কী করে আপনি এ বাগানে ঢুকলেন? মনে হল আপনি যেন আকাশ থেকে এখানে পড়েছেন। কিন্তু আপনি কী পোশাক পরে আছেন? আপনার মাথার টুপি নেই, গলায় নেকটাই নেই, ওভারকোট নেই। আমি আপনাকে অতি কষ্টে চিনতে পেরেছি। কিন্তু এসবের মানে কী? আপনি কী করে এলেন এখানে? আজকাল কি
ভালো লোকরা সব পাগল হয়ে গেছে।
কিন্তু তার এইসব কথার মধ্যে ভয়ের কিছু ছিল না। এক নিরীহ নির্দোষ গ্রাম্য চাষির মতো কথাগুলো সে সরলভাবে বলে ফেলল।
জাঁ ভলজাঁ বলল, তুমি কে? এটা কোন জায়গা?
লোকটা বলল, এই হল ধনীদের ব্যাপার। আপনিই তো আমাকে এই জায়গায় কাজে লাগান। আর আপনি বলছেন আপনি আমাকে চেনেন না।
না, আমি তোমায় চিনতে পারছি না, তুমি আমাকে কিভাবে চিনতে পারলে তা-ও বুঝতে পারছি না।
লোকটা বলল, আপনিই তো আমাকে বাঁচিয়ে ছিলেন।
এবার লোকটার মুখের উপর চাঁদের আলো পড়ায় ভলজাঁ তাকে চিনতে পারল।
লোকটা হল ফশেলেভেন্ত, যে একদিন গাড়ির তলায় চাপা পড়ে।
ভলজাঁ বলল, হ্যাঁ, এবার আমি তোমায় চিনতে পেরেছি।
তাই আমি ভেবেছিলাম।
কিন্তু এত রাত্রিতে এখানে তুমি কী করছ?
আমি তরমুজের উপর চাপা বা ঢাকনা দিচ্ছি।
তার হাতে তখনও খড়ের তৈরি মাদুরের মতো একটা জিনিস ছিল এবং সেটা একটু আগে তরমুজের উপর চাপিয়ে দিচ্ছিল সে। ভলজাঁ যখন তাকে প্রথম দেখে তখন সে এই কাজই করছিল।
ফশেলেভেন্ত হাসতে হাসতে বলল, আমি ভাবলাম জ্যোৎস্না রাত, একটু পরেই বরফ পড়বে। তাই তরমুজগুলোর গাঁয়ে জামা পরিয়ে দিই। আমার জায়গায় আপনি থাকলে আপনিও তাই করতেন।
লোকটা তাকে ম্যাদলেন নামে চিনে ফেলেছে। ভলজাঁ তাই সাবধানে কথা বলতে লাগল। সে তাকে প্রশ্ন করল, তোমার হাঁটুতে ঘন্টা বাধা কেন?
ফশেলেভেন্ত বলল, ও, এই ঘন্টাটা? এটা লোকদের সাবধান করে দেবার জন্য।
কিন্তু লোকদের কেন সাবধান করে দিতে হবে?
বৃদ্ধ ফশেলেভেন্তের মুখে মৃদু হাসি ছড়িয়ে বলল, জানেন না? এখানে শুধু মেয়েরা ছাড়া কোনও পুরুষ থাকে না। এখানে আমিই একমাত্র পুরুষ। তাই ঘণ্টার শব্দ শুনে আমার উপস্থিতির কথা জানতে পারবে তারা। তা হলে আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবে তারা।
কিন্তু এটা কোন জায়গা?
আপনার তো তা জানা উচিত।
আমি বলছি, আমি জানি না।
কিন্তু আপনিই তো এই বাগানের মালীর কাজ দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছিলেন এখানে।
এখনও আমি বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা। তুমি আমাকে সব খুলে বল।
কেন, এইটাই তো পেতিত পিকপাসের কনভেন্ট।
এবার মনে পড়ল ভলজাঁর। দৈবযোগে ঈশ্বরের বিধানেই সে সেন্ট আঁতোনে’র সেই কনভেন্টে এসে পড়ে যেখানে সে ফশেলেভেন্ত গাড়িচাপা পড়ে খোঁড়া হয়ে যাবার পর তাকে বাগানের মালীর কাজ দিয়ে পাঠায়। সে আজ থেকে দু বছর আগের কথা। ভলজাঁ আপন মনে কথাটার পুনরাবৃত্তি করতে লাগল, পেতিত পিকপাসের কনভেন্ট।
ফশেলেভেন্ত এবার বলল, সব তো শুনলেন। এবার বলুন তো মঁসিয়ে ম্যাদলেন, কিভাবে আপনি এলেন এখানে। আপনি একজন সাধু ব্যক্তি হলেও তো পুরুষ মানুষ।
এখানে কোনও পুরুষকে ঢুকতে দেওয়া হয় না কখনও।
কিন্তু তুমি তো রয়েছ।
আমিই এখানে একমাত্র পুরুষ আছি।
ভলজাঁ বলল, যাই হোক, এখানে আমাকে আসতে হল।
ফশেলেভেন্ত বলল, ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন।
ভলজাঁ তার খুব কাছে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, পিয়ের ফশেলেভেন্ত, আমি একদিন তোমার জীবন রক্ষা করেছিলাম।
