জাঁ ভলজাঁ পরে বলেছিল, জীবনে অনেক ভয়ের বস্তু সে দেখলেও গায়ের রক্ত হিম করে দেওয়া এমন রহস্যময় ও ভয়াবহ বস্তু সে কখনও দেখেনি। লোকটা মৃত বলে একটা ভয়ের ব্যাপার ঠিক, কিন্তু জীবিত থাকলে সেটা আরও ভয়ের ব্যাপার।
সাহস করে ভলজাঁ জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জানালার গরাদের উপর মুখ রেখে দেখতে লাগল শায়িত লোকটার মধ্যে জীবনের কোনও লক্ষণ আছে কি না। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করেও সেই শায়িত মূর্তির মধ্যে কোনও জীবনের লক্ষণ দেখতে পেল না। একবারও নড়াচড়া করল না মূর্তিটা। এক অনির্বচনীয় ভয়ের আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল ভুলজা’র মনটা এবং সে পেছন ফিরে ছুটতে শুরু করে দিল। যেখানে সে কসেত্তেকে রেখে এসেছিল সেই চালাঘরটার দিকে ছুটতে ছুটতে মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখতে লাগল জীবিত বা মৃত সেই রহস্যময়ভাবে শায়িত লোকটা হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে আসছে কি না। সে যখন এইভাবে ছুটতে ছুটতে চালাটায় পৌঁছল তখন সে হাঁপাচ্ছিল। তার গা দিয়ে ঘাম ঝরছিল। তার হাঁটু দুটো অবশ হয়ে আসছিল।
এখন সে কোথায়? কে কল্পনা করতে পারে প্যারিস শহরের মধ্যে এই ধরনের এক সমাধিভূমি থাকতে পারে! এক নৈশ রহস্যে মণ্ডিত এ কোন স্থান যেখানে দেবদূতদের আলোকিত কণ্ঠস্বর শুনে কেউ এগিয়ে গেলে এমন এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে যে দৃশ্যের। মধ্যে স্বর্গীয় দ্যুতির মহিমার সঙ্গে সঙ্গে পাশাপাশি প্রকটিত হয়ে উঠেছে সমাধিগহ্বরের এক মৃত্যুনিবিড় নরকান্ধকার। অথচ এটা কোনও স্বপ্ন নয়। রাস্তার ধারে একটা আস্ত বাড়ি। সে হাত দিয়ে বাড়িটার পাথরগুলো স্পর্শ করে দেখতে লাগল। নিশীথ রাতের এই শৈত্যনিবিড় স্তব্ধতা, আশ্রয়হীন অসহায়তা, মনের নিরন্তর উদ্বেগ অসুস্থ করে তুলেছিল তার দেহটাকে। সে জ্বর-জ্বর অনুভব করছিল। সে কসেত্তে’র উপর ঝুঁকে পড়ে দেখল কসেত্তে ঘুমিয়ে পড়েছে।
.
৮.
একটা পাথরের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে কসেত্তে। ভলজাঁ তার পানে তাকিয়ে বসে থাকতে থাকতে শান্ত হয়ে ভাবতে লাগল।
সে এখন স্পষ্ট বুঝতে পারল কসেত্তেই তার জীবনের একমাত্র কেন্দ্রীয় সত্য, যাকে ঘিরে সে আবর্তিত করে চলেছে নিজেকে। সে যতক্ষণ তার কাছে থাকবে ততক্ষণ একমাত্র কসেত্তে’র প্রয়োজন ছাড়া তার নিজের কোনও প্রয়োজন নেই। এখন যদি সে কোনও কিছুকে ভয় করে তা হলে কসেত্তে’র জন্যই করবে। এমনকি এই দারুণ শীতে তার গায়ের কোটটা কসেত্তেকে খুলে দিলেও সে কোনও শীত অনুভব করছিল না।
সে বসে বসে ভাবতে লাগল। ক্রমে আবার একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল কানে। সে স্পষ্ট শুনতে পেল বাগানের ভেতর থেকে নৈশ মাঠে চরে বেড়ানো ভেড়ার গলায় বাঁধা ঘণ্টার ধ্বনির মতো এক ঘণ্টাধ্বনি শান্ত হিমেল বাতাসে ভেসে আসছিল। সেই ধ্বনি শুনে মুখ ফিরিয়ে লক্ষ করে দেখল ভলজাঁ বাগানের ভেতর একটা ছায়ামূর্তি কী করছে। সে আরও ভালো করে দেখল মানুষের মতো একটা মূর্তি বাগানের মাঝখানে তরমুজের ক্ষেতের উপর ঝুঁকে বীজ ছড়াচ্ছে।
জাঁ ভলজাঁ পিছিয়ে এল। ক্রমাগত তাড়া খেয়ে খেয়ে ধরা পড়ার ভয়ে এমনই বিব্রত হয়ে পড়েছিল যে সব মানুষকেই সে তার শত্রু আর সন্দেহজনক ভাবছিল। সব তাড়া খাওয়া পলাতক ব্যক্তিরাই তাই করে। তারা দিনের আলোকে ভয়ের চোখে দেখে, কারণ সবাই তাদের দেখে ফেলবে। হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় রাতের অন্ধকারকেও তারা ভয় করে। বাগানবাড়ির নির্জনতায় সে ভয়ে শিউরে উঠেছিল ঠিক, কিন্তু সেই নৈশ নির্জন বাগানের মধ্যে একটা লোক দেখে সে ভয়ে কাঁপতে লাগল।
এবার সে কাল্পনিক ভয় থেকে বাস্তব ভয়ের সম্মুখীন হল। সে ভাবল, জেভার্ত তার সহকারীদের নিয়ে এই এলাকাতেই আছে এখনও। ওপারের বড় রাস্তায় সে হয়তো একদল লোককে পাহারায় রেখে গেছে। বাগানের ওই লোকটা তাকে দেখে চিৎকার করে উঠলে সেই প্রহরী ছুটে আসবে। সে তাই ঘুমন্ত কসেত্তেকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে চালাঘরটার এক প্রান্তে যেখানে একরাশ পুরনো ভাঙা আসবাব জড়ো করা ছিল তার আড়ালে গিয়ে লুকোল। সে তবু সেখানে থেকে তরমুজক্ষেতের সেই লোকটার দিকে নজর রাখল।
সে দেখল লোকটা যতবার নড়াচড়া করছে ততবারই ঘণ্টার শব্দ হচ্ছে। সে যখন থেমে থাকছে ঘণ্টাটাও স্তব্ধ হয়ে থাকছে। মনে হয় তার দেহের কোনও না কোনও অঙ্গের সঙ্গে একটা ঘন্টা বাধা আছে। কিন্তু এর মানে কী? যে ঘণ্টা কোনও গরু বা পশুর গলায় বাঁধা থাকে, তা মানুষের দেহে কেন?
ভলজাঁ যখন এই সব কথা ভাবছিল তখন হঠাৎ কসেত্তে’র একটা হাত তার গায়ে লাগল। সে দেখল হাতটা বরফের মতো ঠাণ্ডা।
সে নিচু গলায় বলে উঠল, হা ভগবান!
সে নিচু গলায় এবার কসেত্তেকে ডাকতে লাগল, কসেত্তে, কসেত্তে!
কিন্তু চোখ খুলল না কসেত্তে। সে জাগল না।
ভলজাঁ এবার কসেত্তে’র ঘুমন্ত দেহটাকে জোরে নাড়া দিতে লাগল। তবু সে জাগল না।
তবে কি সে মারা গেছে?
সহসা এই কথা ভেবে সে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। তার আপাদমস্তক কাঁপতে লাগল।
কত সব অশুভ চিন্তার ঢেউ বয়ে যেতে লাগল তার মনের মধ্যে। অনেক সময় কতকগুলি ভয় একসঙ্গে এক প্রচণ্ড সেনাদলের মতো আমাদের মস্তিষ্ককে আঘাত করতে থাকে ক্রমাগত। যে ভয়ের সঙ্গে আমাদের কোনও প্রিয়জন জড়িয়ে থাকে সে ভয়ের তখন সীমা-পরিসীমা থাকে না। সে ভেবে দেখল শীতের রাত্রিতে ভোলা বাতাসের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়াটা অনেক সময় মারাত্মক হয়ে ওঠে।
