রাস্তার দিকে অর্থাৎ বাড়িটার পেছনে পাঁচিলের ওপার থেকে তখন জেভার্তের গলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তার লোকজন এখনও পাথরের পাঁচিলের গাঁয়ে বেয়নেট ঠুকে ঠুকে কার খোঁজ করে চলেছিল। জেভার্ত তখনও ভলজাঁকে না পেয়ে চিৎকার করছিল। তার সব কথা বোঝা যাচ্ছিল না এধার থেকে।
ক্রমে সময় যত কেটে যেতে লাগল তত অনুসন্ধানকারী দলের কথাবার্তার শব্দ স্তিমিত হয়ে আসছিল। ভয়ে ভলজাঁ তখনও নিশ্বাস পর্যন্ত ফেলেনি। শ্বাসরুদ্ধভাবে সে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কসেত্তে’র মুখের উপর একটা হাত দিয়ে রেখেছিল। রাস্তার দিকে পাঁচিলটার ওধারে যখন সৈনিকদের ভারী পায়ের শব্দ আর চেঁচামেচির জোর শব্দ হচ্ছিল তখন এপারে নির্জন বাগানটা অদ্ভুতভাবে শান্ত ও নিস্তব্ধ হয়ে ছিল।
হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে সেই সুগভীর নৈশ নির্জন প্রশান্তির মাঝে এক সুন্দর স্বর্গীয় কণ্ঠস্বর ককিয়ে উঠল। নিশীথ রাতের নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশের মাঝে সেই কণ্ঠস্বর রহস্যময় মনে হচ্ছিল ভলজাঁর। তার মনে হল সেই নির্জন পরিত্যক্ত অন্ধকার বাড়িটার মধ্যে কারা যেন সমবেত কণ্ঠে প্রার্থনা করছে। কণ্ঠস্বর শুনে বোঝা গেল একজন কুমারী মেয়ে আর শিশু প্রার্থনার গান করছে। মনে হচ্ছিল এ স্বর যাদের কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে তারা এই মর্তের মানুষ নয়। কোনও মৃতপ্রায় ব্যক্তির কর্ণকুহরে কোনও নবজাত শিশুর কণ্ঠস্বর প্রবেশ করলে তার যেমন মনে হয় সেই সমবেত প্রার্থনার কণ্ঠস্বর শুনে ভলজাঁর তাই মনে হচ্ছিল।
প্রার্থনার গানের শব্দটা আসছিল বাগানের ধারের ঘরগুলোর একটা থেকে। ভলজাঁ’র মনে হচ্ছিল দানবের গর্জন দূরে মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন দেবদূতদের সমবেত কণ্ঠস্বর এক স্বর্গীয় সুষমায় নৈশ নিস্তব্ধ বাতাসে ভেসে উঠতে শুরু করেছে।
কসেত্তে আর জাঁ ভলজাঁ দু জনেই হঠাৎ নতজানু হল। তারা কোথায় আছে এবং প্রার্থনা কারা করছে তার কিছু না জানতে পারলেও তারা সহজাত প্রবৃত্তির তাড়নায় একটা জিনিস বুঝতে পারল যে তাদের নতজানু হওয়া উচিত। তার মনে হল এই সমবেত প্রার্থনার গান নির্জন পরিত্যক্ত বাড়িটার প্রশান্তিকে ক্ষন্ন করেনি কিছুমাত্র। বরং তার মনে হল এ গান কোনও মানুষ গাইছে না, এক অতিপ্রাকৃত কণ্ঠনিঃসৃত এই গান যেন শূন্য নির্জন বাড়িটার মধ্যে ঐন্দ্রজালিকভাবে গীত হচ্ছে।
যতক্ষণ পর্যন্ত এই প্রার্থনার গান চলতে লাগল ততক্ষণ ভলজাঁ’র মনটা একেবারে শূন্য হয়ে রইল। কোনও কিছুই ভাবতে পারল না সে। কোনও দিকে তাকিয়ে কোনও কিছু দেখতে পারল না। সে কেবল তার চোখের সামনে অনন্ত প্রসারিত এক নীল আকাশ দেখতে লাগল আর তার সমগ্র অন্তরাত্মা পাখা মেলে সেই গোটা আকাশটাকে এক নীরব নিবিড় স্বাচ্ছন্দ্যে পরিক্রমা করে বেড়াতে লাগল। যখন সে প্রার্থনার গান শেষ হয়ে গেল, তখন ভলজাঁ বুঝতে পারল না এ গান কতক্ষণ চলেছে। গান যতক্ষণ চলেছে ততক্ষণ সময় সম্বন্ধে তার কোনও খেয়াল ছিল না, পার্থিব কোনও বিষয়েই তার কোনও চেতনা ছিল না।
এবার সব চুপচাপ। ওদিকের রাস্তায় অথবা এদিকে বাগানবাড়িতে কোথাও বিন্দুমাত্র শব্দ নেই। কোনও ভয় বা আশ্বাসের আভাস নেই কোথাও। শুধু নিশীথ রাতের অলস বাতাসের আঘাতে কম্পিত ও মৃদু শিহরিত ঘাসগুলো থেকে এক বিষণ্ণ শব্দের ঢেউ বয়ে আসছিল।
.
৭.
একটা দমকা বাতাস থেকে ভলজাঁ বুঝতে পারল রাত্রি তখন একটা থেকে দুটোর মধ্যে হবে। কসেত্তে চুপ করে ছিল। সে ভলজাঁর কাঁধের উপর মাথা রেখে বসেছিল বলে ভলজাঁ ভেবেছিল সে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু তার মুখপানে তাকিয়ে দেখল তার চোখ দুটো খোলা রয়েছে। সে ভয়ে চোখ দুটো বিস্ফারিত রেখে তাকিয়ে আছে। তার অবস্থা দেখে ভলজাঁর দুঃখ হল।
ভলজাঁ বলল, তুমি ঘুমোওনি?
কসেত্তে বলল, আমার শীত লাগছে।
কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল, এখনও সে আছে?
কে?
মাদাম থেনার্দিয়ের।
ভলজাঁ কসেত্তেকে চুপ করে থাকার জন্য মাদাম থেনার্দিয়েরের নাম করেছিল, সে কথাটা ভুলে গিয়েছিল, সে বলল, সে চলে গেছে। আর তোমার ভয়ের কিছু নেই।
কসেত্তে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল, যেন একটা বড় বোঝা তার বুক থেকে নেমে গেছে।
যে চালাঘরটার মেঝের উপর তারা বসেছিল সেটা স্যাঁতসেঁতে ছিল। চালাঘরটার চারদিকে কোনও দেয়াল ছিল না। ভলজাঁ তার কোটটা খুলে কসেত্তে’র গাঁয়ে জড়িয়ে দিল। বলল, এটা ভালো হল তো?
কসেত্তে বলল, হ্যাঁ বাবা।
শুয়ে পড়। আমি এখনি ফিরে আসছি।
চালাঘরটা ছেড়ে ভলজাঁ বাগানবাড়ির বাইরের দিকটা খুঁজে দেখতে লাগল এর থেকে কোনও ভালো আশ্রয়ের আশায়। সে বাড়িটার নিচের তলায় প্রতিটা ঘরের সামনে গিয়ে দেখল সব ঘরের দরজাই বন্ধ। নিচের তলার সব ঘরের জানালাগুলো বন্ধ। ঘুরতে ঘুরতে সে দেখল আর একটা দিকের কতকগুলি ঘরের সারিবদ্ধ জানালাগুলোর একটা হতে একটা ক্ষীণ আলোর রশ্মি বেরিয়ে আসছে। সে তখন পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে সেই জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে তাকাল। সেই আধখোলা জানালাটা দিয়ে সে দেখল ঘরটা বড়, তার মেঝেটা পাথরের। প্রশস্ত ঘরখানার মধ্যে অনেকগুলো স্তম্ভ রয়েছে। ঘরের এককোণে একটা আলো জ্বলছে। আলোটা ক্ষীণ বলে ঘরের মধ্যে জমে থাকা ছায়াগুলোকে অপসারিত করতে পারছিল না। ঘরটা একেবারে নির্জন; কোনও মানুষ দেখা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে দেখল ঘরের মেঝের উপর একজন মানুষ শুয়ে রয়েছে; তার গোটা গা-মুখে একটা কাপড় ঢাকা। মনে হল লোকটা উপুড় হয়ে হাত দুটো ছড়িয়ে মড়ার মতো শুয়ে আছে। মনে হল তার ঘাড়ে একটা দড়ি জড়ানো আছে। মৃদু আলোকিত ঘরখানার ছায়া-ছায়া অন্ধকার দৃশ্যটাকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল।
