কিন্তু একমাত্র সমস্যা হল কসেত্তেকে নিয়ে। তাকে সে ছাড়তে পারে না। কিন্তু কসেত্তেকে ওই দেয়ালের উপর বয়ে নিয়ে যাওয়াও এক অসম্ভব ব্যাপার। সে তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে এই দেয়ালের উপর উঠে যেতে পারে। কিন্তু তার পিঠে বা কাঁধে কোনও বোঝা থাকলে সে কেন্দ্রচ্যুত হয়ে পড়ে যাবে।
তার একটা দড়ি দরকার। কিন্তু র্যু পোলোনমো’র এই জনমানবহীন জায়গায় দুপুর রাতে দড়ি কোথায় পাওয়া যাবে? জাঁ ভলজাঁ’র হাতে যদি একটা রাজ্য থাকত তা হলে সামান্য একটা দড়ির জন্য সেই গোটা রাজ্যটা দিয়ে দিতে পারত।
অবস্থার প্রবল চাপে মানুষের বুদ্ধি বাড়ে। তখন যে কোনও বস্তু দিয়ে প্রয়োজন মেটাবার চেষ্টা করে সে। সেকালে প্যারিসের রাস্তায় গ্যাসলাইটগুলো একটা মোটা দড়ি দিয়ে ঝোলানো থাকত। গ্যাসের আলোটা থাকত একটা লোহার বাক্সের মধ্যে। আর মোটা দড়িটা একটা ধাতব হাতলের সঙ্গে বাঁধা থাকত।
ভলজাঁ মরিয়া হয়ে ক্ষিপ্র গতিতে তার ছুরি দিয়ে সেই মোটা দড়িটা কেটে নিয়ে কসেত্তেকে বেঁধে ফেলল। দড়িটা বেশ লম্বা ছিল।
আমরা আগেই বলেছি সে রাতে পূর্ণ চাঁদের আলো থাকায় রাস্তায় কোনও আলো জ্বালানো হয়নি। ছায়ান্ধকারভরা নির্জন নৈশ পরিবেশ, পলাতক ভলজাঁর বিভিন্ন আচরণ বিব্রত করে তোলে কসেত্তেকে। অন্য কোনও শিশু হলে এই অবস্থায় কেঁদে ফেলত সে। কিন্তু কসেতে বিব্রত ও বিপন্নবোধ করলেই শুধু ভলজাঁর কোটের আঁচলটা টানত।
এবার জের্তের সেনাদলের মার্চ করে এগিয়ে আসার শব্দটা আরও জোর হয়ে উঠল।
সে শব্দ শুনে কসেত্তে বলল, আমার ভয় করছে। কে আসছে বাবা?
ভলজাঁ বলল, চুপ। মাদাম থেনার্দিয়ের আসছে।
ভয়ে কাঁপতে লাগল কসেত্তে। ভলজাঁ বিব্রত হয়ে বলতে লাগল, কথা বল না। আমার ওপর সবকিছু ছেড়ে দাও। তুমি কথা বললেই মাদাম থেনার্দিয়ের শুনতে পাবে। সে তোমাকে নিয়ে যেতে আসছে।
এরপর ভলজাঁ আর দেরি করল না। কারণ সে বুঝল জেভাৰ্ত তার দলবল নিয়ে এখনি এসে পড়বে। সে তার দড়ির একটা প্রান্ত কসেত্তে’র বগলের তলা দিয়ে বেঁধে দেয়ালের উপর উঠে গেল। তার জুতো-মোজাটা ওপারে ছুঁড়ে দিল। কসেত্তে নিচে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখতে লাগল। সে তখন মাদাম থেনার্দিয়েরের কথা ভাবতে লাগল।
ভলজাঁ তাকে চুপি চুপি ডাক দিল, কসেত্তে, দেয়ালে পিঠ দিয়ে চুপ করে দাঁড়াও। কোনও শব্দ করো না। ভয় করো না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কসেত্তেকে টেনে পাঁচিলের উপর তুলে নিল ভলজাঁ। কসেত্তে কিছু বুঝতেই পারল না। কসেত্তে পাঁচিলের মাথায় দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে পিঠের উপর চাপিয়ে নিল ভলজাঁ। সে দেখল পাঁচিলের সঙ্গে লাগোয়া একটা ছাদ রয়েছে। ছাদটা নিচু হয়ে ওদিকে নেমে গেছে। সেখান থেকে বাগানের মাটিটা অনেক কাছে। লাইমগাছের ডালগুলো ছাদের উপর এসে পড়েছে।
ভলজাঁ ছাদে গিয়ে সেখান থেকে গাছের ডাল ধরে মাটিতে নেমে পড়ল। এমন সময় জেভার্তের গলা শুনতে পেল। জেভাৰ্ত তার লোকদের হুকুম করছে, এই জায়গাটা খোঁজ কর। আমি জোর গলায় বলতে পারি ও এখানেই লুকিয়ে আছে।
সৈনিক ও পুলিশরা ভলজাঁ আগে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেই ফাঁকা জায়গাটা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল।
বাগানের মাটিতে নেমে ভয় বা সাহস যে কোনও কারণেই হোক কসেত্তে একটা কথাও বলল না, বা কোনও শব্দ করল না।
.
৬.
ভলজাঁ দেখল এ এক অদ্ভুত বাগান। মনে হল এ বাগানে কোনও মানুষ আসে না। এখানে-সেখানে কিছু পপলার গাছের জটলা। কোণে কোণে কাটাগাছগুলো লম্বা হয়ে উঠছে। বাগানের মাঝখানে একটুখানি ফাঁকা জায়গা আছে। মাঝে মাঝে এক একটা পথ আছে। কিন্তু পথগুলো ঘাসে ঢেকে গেছে। দু-একটা পাথরের বেঞ্চ আছে। কিন্তু সেগুলো ব্যবহার না করার জন্য শ্যাওলায় ভরে গেছে।
ভলজাঁ দেখল যে বাড়ির ছাদ থেকে সে বাগানে নেমেছে সে বাড়িতে অনেকগুলো ঘর রয়েছে। কিন্তু কোনও ঘরে মানুষ নেই। ছায়া-ছায়া অন্ধকার বাড়িটার সামনে একটা পাথরের প্রতিমূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু মূর্তিটার মুখটা একেবারে ভেঙে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। গোটা বাড়িটা একেবারে ভাঙা এবং বসবাসের অযোগ্য। ভাঙা বাড়িটা অনেকখানি লম্বা র্যু দ্ৰয়েত মুর থেকে পোতিত র্যু পিকপাস পর্যন্ত বিস্তৃত। বাড়িটার সামনেই বাগান। বাড়িটার অবস্থা রাস্তার দিক থেকে ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছিল না। বাড়িটা দোতলা। কিন্তু দুটো তলার সব ঘরের জানালাগুলোই বন্ধ ছিল।
বাগানটার শেষ প্রান্তটা অন্ধকার আর কুয়াশায় ঢাকা থাকায় তা দেখতে পাচ্ছিল না ভলজাঁ। বাগানটার চারদিকেই উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তার মনে হল বাগানটা যেখানে শেষ হয়েছে তার পাঁচিলঘেরা সীমানার ওপারে আবাদি জমি আছে। দু একটা বাড়ির নিচু ছাদ দেখা যাচ্ছিল।
এর থেকে নির্জন এবং পরিত্যক্ত জায়গা আর হতে পারে না। শীতের রাতে এ জনহীন পরিত্যক্ত বাগানটায় কেউ আসতে পারে না এটা ভলজাঁ বেশ বুঝল। কিন্তু তার মনে হল শুধু রাত্রিবেলায় নয়, দিনের বেলাতেও এদিকে কোনও মানুষ আসে না।
বাড়িটার একদিকে মাল রাখার চালাঘর ছিল। ভলজাঁ প্রথমে ওধার থেকে ফেলে দেওয়া জুতো ও মোজাজোড়াটা খুঁজে বার করে কসেত্তেকে নিয়ে সেই চালাঘরটায় গেল। কোনও পলাতকের মতো কখনই কোনও জায়গাকে একেবারে নিরাপদ বোধ করে না। এত নির্জন এবং পরিত্যক্ত জায়গাটাতে এসেও মাদাম থেনার্দিয়েরের ভয়ে বুকটা কাঁপছিল কসেত্তে’র। সে তখন লুকোঁতে চাইছিল।
