জাঁ ভলজাঁ র্যু পিকপাসের দিকটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখল। ফুটপাতের উপর অন্ধকারে যে প্রহরী মূর্তিটা দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে পালাতে গেলে তার হাতে ধরা পড়তে হবে। আবার পেছন দিকে পালাতে গেলে জেভার্তের হাতে ধরা পড়তে হবে। ভলজাঁর মনে হল এমন একটা জালের মধ্যে সে ধরা পড়েছে, যে জালটা ক্রমশই শক্ত হয়ে উঠছে। এক নিবিড় হতাশায় আকাশের পানে মুখ তুলে তাকাল ভলজাঁ।
.
৪.
ব্যাপারটা অর্থাৎ ভলজাঁ’র তখনকার অবস্থাটা ঠিকমতো বুঝতে হলে র্যু দ্ৰয়েত মুর-এর আসল ছবিটা দেখা দরকার। র্যু পোলেনসো’র দিক থেকে গলিপথটাতে ঢুকে একটা মোড় ফিরলেই র্যু দ্ৰয়েত মুরে গিয়ে পড়তে হবে। র্যু দ্ৰয়েত মুর জায়গাটা ডানদিকে কতকগুলি যত সব বিশ্রী রকমের বাড়ি দিয়ে ঘেরা আর তার বাঁ দিকে আছে এমন একটা বিরাট বড় বাড়ি যার র্যু পিকপাসের দিকে মাথাটা ক্রমশই উঁচু হয়ে উঠছিল, কিন্তু র্যু পোলোনসোর দিকে তার মাথাটা খুবই নিচু ছিল। বাড়ি বলতে শুধু দু দিকে দুটো বড় দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে আর তার ভেতরকার ঘরগুলো ভেঙে গেছে।
ভজ তার এই বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে পড়ে ভাবতে লাগল সে একবার যদি জোড়া বাড়িটির মধ্যে গিয়ে পৌঁছতে পারে তা হলে সে নিরাপদ। তা হলে আর কোনও ভয় নেই তার। বাড়িটার আপাতত নির্জনতা আর নীরবতার একটা আকর্ষণ ছিল তার কাছে। ভজ দেখল বাড়িটার প্রতিটি ঘরের জানালার নিচে একটা করে পাইপ আছে। সেইসব পাইপ একটা বড় পাইপে গিয়ে মিশেছে। ভলজাঁ ভাবল পাইপ বেয়ে কসেত্তেকে নিয়েই সে বাড়িটার উপরে উঠে যাবে। পাইপগুলো একতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত যুক্ত আছে। তবে জানালাগুলো সব বন্ধ। তাছাড়া বাড়িটার সামনের দিকটা চাঁদের আলোয় ভাসতে থাকায় সেখানে আশ্রয় নিতে গেলেই তাকে দেখতে পাওয়া যাবে। তাছাড়া পাইপগুলো বহুকালের পুরনো হওয়ায় পচে গেছে। তিনতলা বাড়িটার উপরে কসেত্তেকে পিঠে নিয়ে পাইপ বেয়ে ওঠা সম্ভবও নয়।
সে আশা ত্যাগ করে ছায়ান্ধকার জায়গাটায় এসে দাঁড়াল ভলজাঁ। ভাবল এখানে দাঁড়ালে অন্তত তাকে দেখা যাবে না এবং দরজাটা খোলার চেষ্টা করবে। লাইমগাছের শাখাগুলোকে অবলম্বন করে আইভি লতাগুলো দেয়ালে উঠে গেছে। মনে হল দরজা আর দেয়ালের ওপারে একটা বাগান আছে। সে বাগানে একবার গিয়ে পড়তে পারলে বাকি রাতটা তারা লুকিয়ে থাকতে পারবে।
সময় কেটে যাচ্ছে। যা কিছু করতে হবে তাড়াতাড়ি করতে হবে। সে সদর দরজাটা চাপ দিয়ে খোলার চেষ্টা করল। মনে হল দরজার কাঠটা পুরনো আর পচা। যে লোহা দিয়ে কাঠগুলো আটকানো আছে তাতে মরচে পড়েছে। কিন্তু সে পরীক্ষা করে দেখল আসলে সেটা দরজাই নয়। তাতে কোনও কপাট নেই। লোহার পাত আর কাঠ দিয়ে সেটা ঢাকা। তার ওপারে দেয়াল। সে দরজা কোনওমতেই ভোলা যাবে না।
.
৫.
এমন সময় দূর থেকে কতকগুলি লোকের পথচলার শব্দ আসতে লাগল। সে সেই ছায়ান্ধকার থেকে দূরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেখল সাত-আটজন সৈনিক দুই সারিতে বিভক্ত হয়ে মার্চ করে তার দিকেই আসছে। তাদের বন্দুকের বেয়নেটগুলো চকচক করছিল।
সে আরও দেখল সেই সৈনিকদলের সামনে জেভার্তের লম্বা মূর্তিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সে ধীরগতিতে সতর্কতার সঙ্গে পথ হাঁটছিল। সে মাঝে মাঝে থেমে পথের দু ধারের প্রতিটি অলিগলি এবং বাড়ির দরজাগুলো খুঁটিয়ে দেখে কার খোঁজ করছিল। সে বুঝতে পারল জেভাৰ্ত তার দু জন পুলিশ নিয়ে তার সন্ধান করার সময় প্রহরারত এক সৈনিকদল দেখতে পেয়ে তার কাজে লাগায়। তারা একযোগে মার্চ করে তার দিকে আসছিল।
তাদের চলার গতি দেখে ভলজাঁ বুঝতে পারল সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে তাদের এসে পৌঁছতে এখনও পনেরো মিনিট সময় লাগবে। এই নিয়ে তৃতীয়বার সে এক বিরাট শূন্য খাদে পড়তে চলেছে। আবার তাকে সেই দুর্বিষহ কারাজীবনে প্রবেশ করতে হবে। যে বিরাট শূন্য খাদটা তার জীবনকে গ্রাস করার জন্য মুখ ব্যাদান করে তার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে, সেই খাদ আর তার মাঝখানে মাত্র পনেরো মিনিটের ব্যবধান। সেই খাদের করাল গ্রাসে পড়ে যাওয়া মানেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে নরকের অন্ধকারে প্রবেশ করা। কিন্তু এবার সে কারাজীবন আগের থেকে আরও ভয়ঙ্কর। কারণ এবার কারাজীবনে প্রবেশ করার মানেই চিরদিনের মতো কসেত্তেকে হারানো আর তার মানেই এক জীবন্ত মৃত্যু।
এই মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা মাত্রই উপায় আছে।
জাঁ ভলজাঁ’র জীবনে দুটো প্রবৃত্তি কাজ করে যেত সব সময়। ক্ষেত্রবিশেষে দরকার মতো এই দুটো প্রবৃত্তির একটাকে কার্যে রূপায়িত করার জন্য কাজ করার এক বিশেষ ক্ষমতা ছিল তার। সে যেমন সাধু হবার এক উচ্চাভিলাষের তাড়নায় অনেক বড় কাজ করতে পারত তেমনি একজন পাকা স্বভাবসিদ্ধ অপরাধীর মতো অনেক হীন কাজও করতে পারত।
পাঠকদের স্মরণ থাকতে পারে এর আগে সে তুলঁ জেল থেকে বার বার পালাবার সময় কয়েকটা কৌশল আয়ত্ত করে। এই সব কৌশলের একটা হল বাইরের কোনও কৃত্রিম সাহায্য ছাড়াই শুধু হাতের পেশির শক্তি ও কলাকৌশল অবলম্বন করে এবং পিঠ, কাঁধ আর হাঁটু প্রয়োগ করে যে কোনও উঁচু খাড়া দেয়াল বা প্রাচীরের উপর অবলীলাক্রমে উঠে যাওয়া। কোনও পাইপ ধরে বা শুধু পায়ের বুড়ো আঙুল বা হাতের আঙুলে ভর করে সে ছয়তলা কোনও দেয়াল বা প্রাচীরের উপর উঠে যেতে পারত। এই কৌশল অবলম্বন করেই ব্যাটলমোত নামে এক দণ্ডিত অপরাধী প্যারিসের আদালত-প্রাঙ্গণের এক উঁচু পাঁচিল পার হয়ে পালিয়ে গিয়ে খ্যাতি লাভ করে।
