ভজ তাই দিয়ে হাঁটতে লাগল। একটা মালবোঝাই গাড়ি ধীর গতিতে পুলের উপর দিয়ে আসছিল, ভলজাঁ সেই গাড়িটার পাশে পাশে আড়ালে পথ চলতে লাগল। অর্ধেকটা যাওয়ার পর কসেত্তে বলল, সে এবার হেঁটে যেতে পারবে।
সেতুর উপর দিয়ে নদীটা পার হয়ে ওপারে গিয়ে ডানদিকে কতকগুলি কাঠের গুদাম দেখতে পেল ভলজাঁ। সেইদিকে যাবার ঠিক করল সে। একটা ফাঁকা জায়গা পার হয়ে তবে সেখানে যেতে হবে। কোনও দ্বিধা না করেই সে সেটা পার হয়ে কাঠগোলার কাছে গিয়ে হাজির হল। পাশাপাশি অনেকগুলো গোলার মাঝে মাঝে এক-একটা সরু অন্ধকার গলি আছে। এমনি একটা গলির ভেতর ঢোকার আগে ভলজাঁ একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে লাগল তাদের পিছু পিছু কেউ আসছে কি না।
ভলজাঁ ভালো করে দেখল সেতুটার ওপারে জার্দিল দে প্ল্যান্তের কাছে সেই চারটে ছায়ামূর্তি ধীর গতিতে আসছে। তবে ভলজাঁ দেখল এখনও আশা আছে। ওরা তাকে সেতু পার হতে দেখেনি, এখনও এখানে আসতে ওদের দেরি আছে। সে ভাবল নীরব নির্জন ছায়ান্ধকার গলিপথ তার পক্ষে অনেক নিরাপদ, এই ভেবে একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল।
.
৩.
গলির ভেতরে ভেতরে তিনশো গজ যাবার পর ভলজাঁ দু দিকে দুটো পথ দেখতে পেল তার সামনে। কোনও দ্বিধা না করেই ডানদিকের পথটা ধরল সে। কারণ সে দেখল বা দিকের পথটা সোজা শহরের মাঝখানে চলে গেছে। কিন্তু ডান দিকের পথটা গেছে গ্রামাঞ্চলের পথে।
কসেত্তে’র জন্য সে তাড়াতাড়ি যেতে পারছিল না। কসেত্তে হাঁটতে পারছিল না বলে তাকে আবার তুলে নিল পিঠের উপর। কসেত্তে তার কাঁধের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। গলিপথে তাড়াতাড়ি যেতে যেতে প্রায়ই পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল ভলজাঁ।
প্রথমে দু-তিনবার তাকিয়েও পেছনে কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু পরে একবার তাকাতেই সে দেখল কারা যেন ছায়ার মধ্যে কথা বলতে বলতে আসছে। ভলজাঁ তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে যেতে লাগল। ভাবল আবার সে একটা দোমাথা রাস্তার সামনে। গিয়ে পড়বে এবং একটা পথ ধরে তার অনুসরণকারীদের ধোকা দেবে।
এইভাবে গলিপথটা পার হয়ে সামনে একটা বিরাট প্রাচীর দেখতে পেল। দেখল গলিপথটার সেখানেই শেষ এবং আবার দু দিকে দুটো রাস্তা চলে গেছে। আবার তাকে ঠিক করতে হবে সে বাঁ অথবা ডান কোনদিকে যাবে।
এবারও ডানদিকের পথ ধরল ভলজাঁ। সেটাও একটা গলিপথ। পথটার দু ধারে কতকগুলি বড় বড় পাকা বাড়ি রয়েছে। সেগুলো বসতবাড়ি নয়। দোকান অথবা মাল রাখার গুদাম। সেই গলিপথটাও একটা বড় সাদা প্রাচীরের সামনে এসে শেষ হয়ে গেছে। এখানেও আবার দু দিকে দুটো পথ চলে গেছে।
ভলজাঁ দেখল বাঁ দিকে একটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। জায়গাটা পার হলেই একটা বড় রাস্তা পাওয়া যাবে। সে ঠিক করল বাঁ দিকের পথটায় যাবে সে।
কিন্তু বাঁ দিকে যাবার জন্য ঘুরতেই ভজ দেখল গলিপথটা যেখানে বড় রাস্তায় গিয়ে মিশেছে তার মুখে একটা লোক স্তব্ধ প্রতিমূর্তির মতো ছায়ান্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হল তারই পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
প্যারিসের যে অংশে ভলজাঁ তখন উপনীত হয়েছিল সে অংশ ফবুর্গ সেন্ট আঁতয়নে আর লা রেনির মধ্যে আবদ্ধ ছিল। বর্তমানে সে জায়গাটা একেবারে বদলে গেছে। সে জায়গার এখন অনেক উন্নতি হয়েছে। অনেকের মতে সেটা দেখতে খারাপ হয়েছে, আবার অনেকের মতে জায়গাটা উন্নত হয়েছে আগের থেকে। এখন সেখানে অনেক বাজার, কাঠগোলা, বড় বড় বাড়ির পরিবর্তে বড় বড় রাস্তা, থিয়েটার হল, রেলস্টেশন আর কারখানা গড়ে উঠেছে।
অর্ধশতাব্দী আগে প্যারিসের এই অঞ্চলটাকে বলা হত লে পেতিত পিপাস। পুরনো প্যারিসের পোর্তে সেন্ট জ্যাক, পোর্তে প্যারিস, ব্যভিয়ের দে সার্জেন্ট, লা গ্যালিওত, লা পেতিত প্রোলোতানে প্রভৃতি নামগুলো আজও চলে আসছে।
তখন লে পেতিত পিকপাস অঞ্চলের চেহারাটা ছিল কোনও স্প্যানিশ শহরের মতো হতশ্রী। তার রাস্তাঘাটগুলো ছিল খারাপ, এবড়ো-খেবড়ো, বাড়িগুলো ছিল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। দু-তিনটে বড় চওড়া রাস্তা ছাড়া চারদিকে ছিল শুধু বড় বড় প্রাচীর আর একটা করে ফাঁকা জায়গা। এমনি একটা বড় প্রাচীরের গাঁয়ে কতকগুলি বাগান আর একতলা বাড়ি, কাঠগোলা আর দোকান গড়ে উঠেছিল।
আজ হতে প্রায় তিরিশ বছর আগে পেতিত পিকপাস নামে অঞ্চলটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আজ তার কোনও চিহ্নই নেই। এ যুগের কোনও মানচিত্রে তার কোনও উল্লেখ নেই। শেষ ১৭৭২ সালের প্রকাশিত এক সরকারি মানচিত্রে লে পেতিত পিকপাসের উল্লেখ পাওয়া যায়।
সেদিন রাত্রিতে এই লে পেতিত পিকপাস অঞ্চলেই এসে পড়ে ভলজাঁ।
র্যু দ্রয়েত মুর আর র্যু পিকপাসের মাঝখানে এক কোণে একটি অন্ধকার মূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পিছিয়ে গেল ভলজাঁ। যে লোকটার মূর্তি সে দেখতে পেয়েছে সে লোকটা নিশ্চয় তার ওপর নজর রাখতে এসেছে।
এখন সে কী করবে? কিছুক্ষণ আগে পেছন ফিরে দেখেছে তিন-চারজন লোক তার পিছু পিছু আসছে অর্থাৎ তাকে অনুসরণ করছে তারা। তার মানে পেছন দিকে পালাবার পথ তার বন্ধ। মনে হয় জেতার্ত তার দলবল নিয়ে সেখানে পাহারায় আছে। তাকে ধরার জন্য তৈরি হয়ে আছে। আর জেভাৰ্তই হয়তো একজনকে সামনের দিকে পথটা রুদ্ধ করে দেবার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছে। এই সব অনুমান নিশ্চয়তার রূপ ধরে দমকা বাতাসের আঘাতে ঝরে পড়া ধুলোর মতো তার মনের ওপর ঝরে পড়তে লাগল।
