পাঠকদের কাছে অতীতের সেই প্যারিস শহরকে বর্তমানে চালিয়ে দেবার অনুমতি চেয়ে আবার কাহিনী শুরু করছেন তিনি।
জাঁ ভলজাঁ বাজার এলাকাটা ছেড়ে দিয়ে গলিপথ ধরে প্রায়ই পেছন ফিরে তাকাতে তাকাতে শিকারির তাড়া খাওয়া হরিণের মতো জোর পায়ে হাঁটতে লাগল কসেত্তেকে নিয়ে। সে প্রায়ই দিক পরিবর্তন করে এক পথ থেকে ভিন্ন পথ ধরতে লাগল।
সেদিন ছিল পূর্ণিমারাত্রিচাঁদটা তখনও দিগন্তেই ছিল। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল রাস্তার উপর। ভলজাঁ রাস্তার কোল ঘেঁষে ছায়ায় গা-ঢাকা দিয়ে আলোর দিকে চোখ রেখে পথ হাঁটছিল। নির্জন রাস্তাটায় বেশ কিছুক্ষণ চলার পর সে অন্তত বুঝতে পারল কেউ তাদের অনুসরণ করছে না।
কসেত্তে কোনও প্রশ্ন না করেই ভলজাঁর পাশে পাশে পথ হাঁটতে লাগল। ক্রমাগত ছয় বছর ধরে সে যে কষ্ট জীবনে পেয়েছে তাতে এক নীরব সহনশীলতা আপনা থেকে শিখে ফেলেছে। তাছাড়া এই কদিনের মধ্যেই ভলজাঁ’র কতকগুলি বাতিকের ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অপ্রত্যাশিত কোনও ঘটনাই আর বিস্মিত করতে পারে না তাকে। ভলজাঁ’র কাছে থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করে সে।
কসেত্তের মতো ভলজাঁ নিজেও জানত না সে কোথায় যাচ্ছে। ভলজাঁর ওপর কসেত্তের যেমন অকুণ্ঠ বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বরের ওপর ভলজাঁ’র তেমনি ছিল অকুণ্ঠ অবিচল বিশ্বাস। তার মনে হল এক অদৃশ্য বৃহত্তর শক্তি তার হাত ধরে তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে কী করবে বা কোথায় যাবে, সে বিষয়ে কোনও ধারণা বা নির্দিষ্ট কোনও পরিকল্পনা ছিল না। সে যে জেতার্তকে ঠিক দেখেছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারল
সে। আর সে যদি জেতার্তকে দেখেও থাকে তা হলে তার মানে এই নয় যে জেতার্ত তাকে জাঁ ভলজাঁ বলে চিনতে পেরেছে। কারণ সে এমনভাবে ছদ্মবেশ ধারণ করে আছে যাতে তাকে ভলজাঁ বলে কেউ চিনতে না পারে। সবাই জানে ভুলা মারা গেছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেসব ঘটনা ঘটে গেছে সেসব ঘটনাকে অস্বীকার করতে পারে না সে। তবে সে মনে মনে সংকল্প করল গর্বোর সেই বাড়িটাতে আর ফিরে যাবে না কখনও। আপন গুহা থেকে বিতাড়িত এক জন্তুর মতো এক অস্থায়ী অথচ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে।
অনেক পথ ঘুরে ঘুরে র্যু মুফের্দ অঞ্চলে এসে দেখল সমস্ত অঞ্চলটা এরই মধ্যে মধ্যযুগীয় এক গ্রামের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। যেন সান্ধ্য আইন জারি আছে গোটা এলাকাটায়। র্যু সেনসিয়ের, র্যু কোপো, সেন্ট ভিক্টর, র্যু দু পুইত, লার্মিতে প্রভৃতি নামে কতকগুলি রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কতকগুলি হোটেল দেখতে পেল ভলজাঁ। কিন্তু হোটেল পছন্দ হল না তার। কারণ তাকে যে কেউ অনুসরণ করছে না। এবং সে অনুসরণকারীদের নাগালের বাইরে চলে এসেছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারল na তখনও।
সেন্ট এতিয়েনে চার্চে এগারোটা বাজল। রাস্তার অন্ধকার দিকটায় র্যু পস্তয় নামে একটা পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। ভলজাঁ একবার পেছন ফিরে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখল ফাঁড়ির সামনে লণ্ঠন জ্বালিয়ে তিনটে পুলিশ বসে আছে। তাদের দলের নেতার সন্দেহ হওয়ায় সে কসেত্তেকে নিয়ে র্যু পন্তয় ছেড়ে অন্য পথ ধরল।
র্যু দে পোস্তের কাছে এসে একটা বড় ফাঁকা জায়গা দেখতে পেল ভলজাঁ। গোটা জায়গাটা জুড়ে চাঁদের আলো ঝরে পড়ছিল। ভলজাঁ কাছাকাছি একটা বাড়ির সদর দরজার আড়ালে লুকিয়ে লক্ষ করতে লাগল তাকে কেউ অনুসরণ করছে কি না। সে ভাবল, এতক্ষণ ছায়ায় ভালো করে লক্ষ করতে পারেনি। এবার কেউ যদি সত্যিই তাদের পিছু পিছু আসে তা হলে তাকে ওই ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে আসতে হবে আর তা হলে চাঁদের আলোয় তাকে স্পষ্ট দেখা যাবে।
ভলজাঁ যা ভেবেছিল ঠিক তাই হল। মিনিট তিনেকের মধ্যেই চারজন লোক সেই চাঁদের আলোঝরা ফাঁকা জায়গাটার মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তারা চারজনই ছিল পুলিশ। লম্বা চেহারা, গায়ের রঙ বাদামি, মাথায় গোল টুপি আর হাতে লাঠি। ফাঁকা জায়গাটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা বুঝতে পারছিল না কোনদিকে যাবে। তাদের মধ্যে একজন ভলজাঁ যেদিকে এসেছিল সেই দিকে আসছিল। কিন্তু অন্যরা উল্টো দিকের পথ ধরল। তখন সে ভলজাঁর দিকে আসছিল। সে মুখটা ঘোরাতেই চাঁদের আলোটা তার মুখের উপর পড়ল। ভজ দেখল লোকটা জেতার্ত।
.
২.
এতক্ষণে অস্বস্তিকর যে অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত যাপন করছিল ভলজাঁ তা অন্তত দূর হল। তার অনুসরণকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায় এবং দেরি করে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভলজাঁ লাভবান হয়। সেই অবকাশে ভলজাঁ দরজার সেই আশ্ৰয়টা ছেড়ে র্যু দে পোস্তের দিয়ে জাদিল দে প্ল্যান্তের দিকে চলে গেল। কসেত্তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ভলজাঁ তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে পথ চলতে লাগল। রাস্তায় কোনও লোক ছিল না। চাঁদের আলো থাকায় রাস্তার লাইটপোস্টের আলো জ্বালা হয়নি।
ভলজাঁ তার চলার গতি বাড়িয়ে দিয়ে ফতেন সেন্ট ভিক্টর পার হয়ে জার্দিল দে প্ল্যান্তের চারদিকে ঘুরে অবশেষে নদীর ধারের বাঁধের উপর এসে উঠল। বাঁধের উপর কোনও লোক না থাকায় সে এবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এবার সে সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের বর্তমান অবস্থাটা খতিয়ে দেখতে লাগল।
বাঁধটা ধরে কিছুদূর গিয়ে নদীর সেতুটা পেল। সেতুটা পার হতে হয় পয়সা দিয়ে। একজন আদায়কারী সামনে বসে ছিল। ভলজাঁ তার কাছে গিয়ে একটা স্যু দিল। কিন্তু লোকটা বলল, দুটো স্যু লাগবে। তোমার সঙ্গে একটা মেয়ে আছে। সে হাঁটতে পারে, তাই তোমাকে দু জনের ভাড়া দিতে হবে।
