সে দেখল ভিখারিটাও মাথা নত করে কী ভাবছে। সে যেন তার অস্তিত্বটা ভুলেই গেছে। ছেঁড়া কম্বল জড়িয়ে ভিখারিটা সেইখানে বসে রইল যেখানে সে বসে ছিল।
ভলজাঁ একবার ভাবল, আমি ভুল করছি, আমি পাগল। আসলে ও একটা ভিখারি। তবু আত্মরক্ষার তাগিদে সহজাত এক প্রবৃত্তির তাড়নায় সে কোনও কথা না বলে ভালোই করল। সে রাতে মনে এক দারুণ অশান্তি নিয়ে বাসায় ফিরল। সে যেন নিজের মনের কাছেও একথা স্বীকার করতে পারল না যে ভিখারির মধ্যে সে জেভার্তের মুখ দেখতে পেয়েছে।
তবু এ কথাটা বিশ্বাস করতে পারল না কিছুতেই। ভাবল, গতকাল কোনও কথা না বলে চলে এসে ভুল করেছে। ভিখারিকে তার মুখটা নামিয়ে নিয়ে বসে থাকার সময় তার মুখটা তোলার জন্য তাকে বলা উচিত ছিল।
পরদিন সন্ধ্যার সময় সাহসে ভর করে আবার গেল ভিখারির কাছে। আবার সে পয়সা দিল, ভিখারি তাকে ধন্যবাদ দিল। ভলজাঁ নতুন করে আশ্বস্ত হল। নিজেকে নিজে উপহাস করতে লাগল। সে তাকে জেভাৰ্ত মনে করে ভুল করেছে। সে আর এ নিয়ে কিছু ভাবল না।
কয়েকদিন পর একদিন সন্ধে আটটার সময় ভলজাঁ কসেত্তেকে পড়াচ্ছিল। সে শুনতে পেল রাস্তার দিকের সদর দরজাটা হঠাৎ কে খুলে আবার বন্ধ করল। এটা অস্বাভাবিক। এ সময় কেউ বাড়ি থেকে যায় না বা কেউ বাইরে থেকে আসে না। এ বাড়ির আর একমাত্র বাসিন্দা সেই বুড়িটা বাতিখরচের ভয়ে সন্ধে হতেই শুয়ে পড়ে। জাঁ ভলজাঁ ইশারায় কসেত্তেকে তার ঘরে পাঠিয়ে দিল। তার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল ভলজাঁ। সিঁড়ি বেয়ে নিশ্চয় কেউ উপরে আসছে। মনে হল ভারী জুতো পরে কোনও পুরুষমানুষ আসছে। এ পদশব্দ নিশ্চয় কোনও মেয়েমানুষের নয়, জ্বলন্ত বাতিটা নিবিয়ে দিল ভলজাঁ।
কসেত্তেকে চুম্বন করে পাঠিয়ে দিয়ে বিছানা থেকে উঠে স্থির হয়ে স্তব্ধ হয়ে একটা চেয়ারে বসে রইল শ্বাসরুদ্ধ হৃদয়ে। কিছুক্ষণ পর সে নিঃশব্দে উঠে দরজার একটা ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখল, বাতি হাতে কে একজন লোক বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েক মিনিট পরে ভলজাঁ দেখল বাতির আলোকটা বারান্দায় দেখা যাচ্ছে না। আর জুতোর শব্দও হচ্ছে না। সে বুঝতে পারল লোকটা জুতো খুলে নিঃশব্দে দরজার কাছে। কান পেতে তাদের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করছে।
ভলজাঁ পোশাক পরেই শুয়ে পড়ল বিছানায়। সারা রাত্রি একবারও চোখে-পাতায় করতে পারল না। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ বাইরে সদর দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ভলজাঁ’র। সিঁড়িতে আবার কাদের পদশব্দ শুনতে পেল। তার মনে হল গতকাল রাতে যারা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেছিল তারাই আবার উঠছে। ভলজাঁ বদ্ধ। দরজার স্বল্প ফাঁক দিয়ে দেখল একটা লোক সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে ভলজাঁ’র সামনে
থেমে বারান্দা দিয়ে চলে গেল। ভালো করে গোটা লোকটাকে দেখল ভলজাঁ পেছন থেকে। টেলকোট পরা লম্বা চেহারার একজন লোক বগলে একটা ছোট লাঠি নিয়ে ভারী জুতো পরে বারান্দার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে হেঁটে যাচ্ছে। সে পেছনটা দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারল লোকটা জেভাৰ্ত।
ভলজাঁ বুঝতে পারল কারও কাছ থেকে নিশ্চয় চাবি নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকেছে জেভাৰ্ত। নিশ্চয় সে কারও কাছ থেকে সন্ধান পেয়ে তার খোঁজে এসেছে। কিন্তু কে তাকে চাবিটা দিয়েছে? কে তাকে তার খবরাখবর দিয়েছে? ভলজাঁ কিছুই বুঝতে পারল না।
জেভার্ত বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাজারের দিকে চলে গেলে সেদিকের জানালাটা খুলে তাকে ভালো করে দেখার ইচ্ছা হল ভুলজার। কিন্তু ভয়ে জানালাটা খুলতে পারল না সে।
সকাল সাতটার সময় বুড়ি তার কাজে এল। ভলজাঁ তার পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তার মনে সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল। কিন্তু কোনও কথা বা প্রশ্ন করল না তাকে। বুড়িটার হাবভাব ঠিক আগের মতোই আছে। সে ঘর ঝাট দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করল, গতরাতে কারও আসার শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন মঁসিয়ে?
সে বোঝাতে চাইল তার মতো বয়সের বৃদ্ধার কাছে রাত্রি আটটা দুপুর রাতের সমান।
ভলজাঁ বলল, হ্যাঁ, শুনেছিলাম। কিন্তু কে এসেছিল?
বুড়ি বলল, নতুন ভাড়াটে। ঘর ভাড়া নিয়েছে।
তার নাম কী?
ঠিক মনে করতে পারছি না। হয় মঁসিয়ে দুমত অথবা দমত। ওই ধরনের একটা কিছু হবে।
কী কাজ করেন মঁসিয়ে দুমত?
খেঁকশেয়ালের মতো ধূর্ত চোখদুটো তুলে বুড়ি বলল, আপনার মতোই টাকা ধার দিয়ে বেড়ায়।
ভলজাঁ’র মনে হল বুড়ির এ কথার একটা মানে আছে।
বুড়ি চলে গেলে ড্রয়ার থেকে একশো ফ্রা’র মুদ্রাগুলো ধীরে ধীরে পকেটের মধ্যে ভরে নিল। যাতে কোনও শব্দ না হয় সেদিকে নজর রেখে সাবধানে সে মুদ্রাগুলো তুলে নিলেও একটা পাঁচ ফ্রাঁ মুদ্রা মেঝের উপর সশব্দে পড়ে গেল।
সন্ধ্যা হতে সে একবার নিচে রাস্তায় নেমে গিয়ে চারদিকে সাবধানে তাকাতে লাগল। সে দেখল রাস্তাটা তখন নির্জন। তবে গাছের আড়ালে কেউ লুকিয়ে আছে কি না, তা বুঝতে পারল না।
ভলজাঁ উপরতলায় উঠে গিয়ে কসেত্তেকে বলল, চলে এস।
কসেত্তে’র হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল সে।
২.৫ এরপর যেসব ঘটনা সংযোজিত হবে
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
এই কাহিনীতে এরপর যেসব ঘটনা সংযোজিত হবে সেই সব ঘটনার সঙ্গে পাঠকরা যাতে সহজে পরিচিত হতে পারেন তার জন্য আগে থেকে কিছু বলে রাখা প্রয়োজন। এই বইয়ের রচয়িতা কিছুকালের জন্য প্যারিস থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলেন। তার এই অনুপস্থিতিকালে প্যারিস শহরের এক পরিবর্তন ঘটে। এখন এমন এক শহরের উদ্ভব ঘটেছে যে শহর তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। যে প্যারিস শহরকে সে জন্মাবধি ভালোবেসে এসেছে, যে প্যারিস ছিল তার আধ্যাত্মিক আবাসভূমি, যার স্মৃতি আজও জেগে আছে তার অন্তরে। ভাঙচুর আর পুনর্গঠনের সময় সে প্যারিস অদৃশ্য হয়ে যায়। অতীতের বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং গ্রন্থকার যে প্যারিস শহরের কথা বলতেন সে প্যারিস হল অতীতের সেই শহর, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। তিনি যেসব রাস্তা বা বাতির উল্লেখ করবেন বর্তমানে তার খোঁজ করলে হয়তো পাওয়া যাবে na। অথচ গ্রন্থকারের ধারণা পুরনো শহরটার সব কিছু হয়তো বদলে যায়নি একেবারে। আমরা যখন আমাদের জন্মভূমি ও স্বদেশ ছেড়ে দূরে চলে যাই তখন তার প্রতি আমাদের ভালোবাসার টানটা বুঝতে পারি। তখন মনে হয় সেখানকার পথঘাট, ঘরবাড়ি, গাছপালা সবকিছুর মধ্যে আমাদের অন্তরের একটা অংশ ফেলে রেখে এসেছি। আমাদের অনুপস্থিতিকালে আমাদের অন্তরের স্পর্শে সেই সমগ্র জন্মভূমি যেন মায়াময় এক অপরূপ বস্তু হয়ে ওঠে। আমরা যখন আবার দূর প্রবাস থেকে সেই জন্মভূমিতে ফিরে আসি তখন আমাদের আগের দেখা সেই জন্মভূমির অবিকৃত রূপকে দেখতে চাই। সেই গাছপালা, ঘরবাড়ি, পথঘাট যেখানে যা কিছু দেখে গিয়েছিলাম সেখানেই সব কিছু দেখতে চাই।
