কসেত্তে যেদিন ভলজাঁর সঙ্গে যেত না সেদিন সে বাসাতে বৃদ্ধার কাছে থাকত। তাকেই সবাই বাড়িওয়ালি বলত। তবে বাসায় সেই বুড়ির কাছে থাকার থেকে ভলজাঁ’র সঙ্গে বেড়াতে গিয়েই সবচেয়ে আনন্দ পেত কসেত্তে। তারা বাইরে বেড়াতে গিয়ে দু জনে হাতধরাধরি করে পথ হাঁটত, দু জনে কথা বলত। কসেত্তে’র আনন্দোচ্ছল ভাব দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত ভলজাঁ।
বুড়ি তাদের বাসার ঘর পরিষ্কার করত, রান্না করে দিত, তাদের দোকান-বাজার করত। তারা খুব হিসাব করে চলত, গরিব লোকদের মতো যথাসম্ভব কম টাকায় সংসার চালাত। ভলজাঁ ঘর সাজাবার জন্য কোনও আসবাবপত্রই কেনেনি। শুধু কসেত্তে’র ছোট ঘরটার কাঁচের দরজাটা পাল্টে একটা কাঠের দরজা লাগিয়ে দেয়।
সেই হলুদ কোটটা তখনও পরত ভলজাঁ। তাতে কয়েকটা ফুটো ছিল। তার মাথার টুপিটা মোচড়ানো ছিল। পাড়ার লোকেরা তাকে গরিব ভাবত এবং মাঝে মাঝে কোনও কোনও বাড়ির কোনও দয়াবতী গৃহিণী তাকে দু-একটা স্যু দিত। জাঁ ভলজাঁ তা নিত। পরে আবার কোনও ভিখারি তার কাছে পয়সা চাইলে সে তাকে তা দিয়ে দিত। কখনও কখনও ভিখারিকে এক-আধটা রুপোর মুদ্রাও দিত। এজন্য পাড়ার লোকেরা তার সম্বন্ধে বলাবলি করত সে এমনই ভিখারি যে সে অন্য ভিখারিকে ভিক্ষা দেয়।
বাড়িওয়ালি বুড়ির একটা ঈর্ষান্বিত কৌতূহল ছিল তার প্রতিবেশীদের প্রতি। জাঁ ভলজাঁ’র প্রতি এক বিরাট অদম্য কৌতূহল ও আগ্রহ ছিল তার। কিন্তু তার এই আগ্রহের কথাটা ভলজাঁকে বুঝতে দিত না সে। সে কানে কম শুনত। উপরে ও নিচে তার মাত্র দুটি দাঁত ছিল। সে খুব বেশি কথা বলত এবং কসেত্তেকে একা পেলেই নানারকমের অজস্র প্রশ্ন করত। কসেত্তে বলত সে কিছু জানে না, সে শুধু এইটুকু জানে যে তারা মঁতফারমেল থেকে এসেছে।
একদিন বুড়ি দেখল বারান্দার ধারে যেসব খালি ঘরগুলো আছে তার একটাতে হঠাৎ ভলজাঁ ঢুকে পড়ল। বুড়ির সন্দেহ হওয়ায় সে আড়াল থেকে দেখতে লাগল। ভলজাঁ কী করে তা দেখতে চায় সে। সতর্কতার জন্য দরজার দিকে পেছন ফিরে ছিল ভলজাঁ। বিড়ালের মতো গুঁড়ি মেরে এক জায়গায় একটা ফাঁক দিয়ে দেখতে লাগল বুড়িটা। সে দেখল ভলজাঁ পকেট থেকে কাঁচি বার করে তার কোটের ভেতরের দিকের এক জায়গায়। কাঁচি দিয়ে সেলাই কেটে ভেতর থেকে ভাঁজ করা একটা হলুদ কাগজ বার করল। তার। ভাঁজটা খুললে বুড়ি আশ্চর্য হয়ে দেখল, সেটা এক হাজার ফ্লার একটা নোট। এই নিয়ে হাজার ফ্রা’র নোট জীবনে মাত্র দু-তিনবার দেখল সে।
কিছুক্ষণ পর ভলজাঁ বাইরে এসে বুড়িকে নোটটা ভাঙিয়ে আনতে বলল। সে বলল, গতকাল সে তার তিন মাসের আয়স্বরূপ টাকাটা তুলে এনেছে ব্যাংক থেকে। কিন্তু কোথা থেকে আনল সে? বুড়ি ভেবে দেখল গতকাল সে সন্ধে ছ’টার আগে সারা দিনের মধ্যে কোথাও যায়নি বাসা থেকে। তা হলে ব্যাংক থেকে কী করে তুলঁল টাকাটা? ভাবতে ভাবতে আশ্চর্য হয়ে গেল বুড়িটা। সে নোটটা নিয়ে ভাঙাতে চলে গিয়ে পাড়ার সবাইকে বলে দিল। কোটের মধ্যে সেলাই করা হাজার টাকার নোট। র্যু দ্য ভিগনে সেন্ট মার্শেলের অনেক বাড়ির গিন্নিরা উত্তেজিতভাবে আলোচনা করতে লাগল কথাটা।
দিনকতক পরে একদিন ভলজাঁ বারান্দায় আগুনের জন্য কাঠ চেরাই করছিল বসে। বসে। কসেত্তেও তার কাছে বসে ছিল। বুড়িটা ঘর পরিষ্কার করছিল। ঘরেতে সে একা ছিল। ভলজাঁ’র হলুদ কোটটা দেয়ালের একটা পেরেকে টাঙানো ছিল। বুড়ি কোটটা নেড়ে-চেড়ে পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। সে দেখল যেখান থেকে সেদিন হাজার ফ্রা’র নোটটা বার করেছিল সে জায়গাটা আবার সেলাই করে দিয়েছে ভালো করে। সে হাত দিয়ে টিপে বুঝল আরও ভাজকরা কাগজ আছে তার মধ্যে। তার মনে হল আরও অনেক হাজার ফ্রা’র নোট আছে। এ ছাড়া সে দেখল কোটের বিভিন্ন পকেটে কাঁচি, সুচ, সুতো, ছুরি প্রভৃতি বিভিন্ন জিনিস রয়েছে। তাছাড়া আছে চামড়ার একটা মোটা প্যাকেট আর হাতলওয়ালা একটা বড় ছোরা। প্রতিটি পকেটে কিছু না কিছু দরকারি একটা জিনিস আছে।
তখন শীত শেষ হয়ে আসছিল।
.
৫.
সেন্ট মেদার্দ চার্চের কাছে একটা পুরনো সরকারি কূপের ধারে একটা ভিখারি বসত। ভলজাঁ তাকে প্রায়ই ভিক্ষা দিত। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় কয়েকটা স্যু তার হাতে না দিয়ে সে যেত না। মাঝে মাঝে ভিখারিটার সঙ্গে কথা বলত সে। স্থানীয় অনেক লোক বলত ভিখারিটা পুলিশের লোক, সংবাদদাতার কাজ করে। অতীতে একসময় সে গানের দলে থেকে সমবেত কণ্ঠে গাইত, প্রার্থনার স্তোত্রগুলোতে সুর দিত। তার বয়স হয়েছিল পঁচাত্তর।
একদিন সন্ধেবেলায় ভলজাঁ একা সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। ভিখারিটা পথের ধারে সেই একই জায়গায় বসে ছিল। সে তার দেহটাকে সামনে বাঁকিয়ে ঝুঁকে প্রার্থনা করছিল। ভলজাঁ তাকে অন্য দিনকার মতো পয়সা দিল। কিন্তু আজ ভিখারি মুখ তুলে ভলজাঁ’র মুখপানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সে যেন কার খোঁজ করছে। কিছুক্ষণ এইভাবে দেখার পর মাথাটা নামিয়ে নিল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ভিখারির মুখের কিছুটা ভলজাঁও দেখতে পেল। ভলজাঁ দেখল, সে মুখ কোনও ভক্তিভাবে অবনত কোনও ভিখারির মুখ নয়, তার চোখের দৃষ্টি কোনও ভবঘুরের শূন্য দৃষ্টি নয়। সে মুখ তার যেন অতি পরিচিত এক মুখ। অন্ধকারে যেন ক্ষুধিত বাঘের একজোড়া জ্বলন্ত চোখ দেখতে পেল ভলজাঁ। ভয়ে রক্ত হিম হয়ে উঠল তার। সে কয়েক পা পিছিয়ে এল। সে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, না ছুটে পালাবে তা বুঝতে পারল না। কিছু বলবে, না চুপ করে থাকবে তা-ও বুঝতে পারল না।
