তার আশ্রয় নির্বাচনের ব্যাপারে প্রচুর সতর্কতা অবলম্বন করে ভলজাঁ। যে বাসা ভাড়া করে সে বাসার মধ্যে সে নিরাপদ বোধ করতে থাকে। তারা ছাদের উপর যে দুটো ঘর নিয়ে থাকত সেই ঘর দুটোর মধ্যে একটা মাত্র জানালা ছিল আর সে জানালা ছিল বাজারের দিকে। সেদিকে কোনও বাড়ি ছিল না। ফলে আশপাশের বাড়ির কোনও লোক তাদের জীবনযাত্রার কোনও কিছু দেখতে পেত না।
বাড়িটার নম্বর হল ৫০-৫২। এর নিচের তলাটা বাজারের লোকেরা ভাড়া নিয়ে ঘরগুলোতে তাদের পণ্যদ্রব্যগুলো মজুদ করে রাখত। নিচের তলায় কোনও লোক বাস করত না। উপরতলাতেও অনেকগুলো ঘর ছিল। সেইসব ঘরের একটাতে এক গরিব বুড়ি বাস করত। সেই বুড়িই জাঁ ভলজাঁর ঘরের সব কাজকর্ম করত। উপরতলার বাকি ঘরগুলো পড়ে থাকত।
এই বৃদ্ধাই বাড়িটার দেখাশোনা করত। লোকে তাকে অবশ্য প্রধান ভাড়াটে বলে জানত। এই বছরেই খ্রিস্টের জন্মদিনে এই বৃদ্ধাই ঘরভাড়া দেয় জাঁ ভলজাঁকে। ভলজাঁ তাকে বলে সে কোথাও চাকরি করে না, তার সঞ্চিত টাকা থেকে তার খরচ চলে। একবার এক স্পেনদেশীয় লোককে টাকা ধার দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়। আরও বলে সে তার নাতনিকে নিয়ে এখানে বাস করবে। সে একসঙ্গে প্রথমেই দু মাসের ভাড়া অগ্রিম দিয়ে দেয়। ভলজাঁ ঘরভাড়া করেই বাইরে চলে যায়। যাবার সময় বৃদ্ধাকে বলে যায় সে যেন ঘরগুলো পরিষ্কার করে স্টোভটা জ্বালিয়ে রাখে। বৃদ্ধা তাদের আসার আগেই সব ঠিক করে রেখেছিল।
এইভাবে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। দু জনে সেই বাসাটার মধ্যেই বাস করতে লাগল। সকাল হলেই পাখির মতো শিশুরাও গান করে। কসেত্তে মনের সুখে সারাদিন হাসত, কথা বলত, গান করত। জাঁ ভলজাঁ মাঝে মাঝে তার ছোট লাল একটা হাত টেনে নিয়ে স্নেহভরে চুম্বন করত। যে কসেত্তে বরাবর মার খেয়ে এসেছে সে ভলজাঁ’র এই চুম্বনের অর্থ বুঝতে পারত না, কেমন যেন বিব্রত বোধ করত। এক-এক সময় সে তার কালো পোশাকটার কথা ভাবত। এখন তাকে আর ছেঁড়া পোশাক পরতে হয় না, কিন্তু শোকসূচক এই পোশাকের অর্থ সে বুঝতে পারল না।
ভলজাঁ কসেত্তেকে পড়তে-লিখতে শেখাল। সে জেলে থাকাকালে যতটুকু লেখাপড়া শেখে, কসেত্তেকে তাই শেখাতে থাকে। অর্জিত জ্ঞানবিদ্যা কসেত্তেকে দান করতে পারার সুযোগ পেয়ে খুশি হয় সে। কসেত্তেকে লেখাপড়া শিখিয়ে তাকে জীবনে সুখী করে তোলাই জীবনের একমাত্র ব্রত হয়ে ওঠে তার। তাকে পড়াতে পড়াতে মুখে হাসি ফুটে উঠত তার। তার মনে হত সে যেন এক অদৃশ্য মহান শক্তির ইচ্ছা পালন করছে। জীবনের এক মহান কর্তব্য সে করে যাচ্ছে। এক-এক সময় কসেত্তেকে তার মার কথা বলত ভলজাঁ। তার মা’র প্রার্থনার কথাগুলো তাকে বলতে শেখাত। কসেত্তে ভলজাঁকে বাবা বলে ডাকত।
কসেত্তেকে দেখে, তার কথা শুনে ও তার পুতুল খেলা দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারত ভলজাঁ। কসেত্তে যখন তার পুতুলটাকে পোশাক পরাত ও সাজাত তখন একদৃষ্টিতে দেখত সে। বাঁচার এক নতুন আগ্রহ খুঁজে পেল ভলজাঁ। জীবন হয়ে উঠল অর্থময়, জগক্টাকে ভালো মনে হতে লাগল, যা আগে কখনও মনে হয়নি। কারও প্রতি তার আর কোনও ক্ষোভ নেই, কোনও অভিযোগ নেই। এখন কসেত্তে তাকে। ভালোবাসে। শ্রদ্ধা করে। এখন তাকে দীর্ঘদিন বাঁচতে হবে। কসেত্তে’র সুমধুর সাহচর্যে আলোকিত এক ভবিষ্যতের ছবি ফুটে উঠত তার চোখের সামনে।
এটা আমাদের ব্যক্তিগত মত হলেও একথা বলতে আমাদের কোনও দ্বিধা নেই যে জাঁ ভলজাঁ কসেত্তেকে ভালোবাসতে শুরু করলেও সে যে সারাজীবন নীতি ও ধর্মের পথ ধরে চলবে, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই। এজন্য এক নৈতিক অবলম্বন দরকার। মন্ত্রিউল-সুর-মেরে নতুন জীবন শুরু করার পরও মানুষের হিংসা-দ্বেষ ও সমাজের নিষ্ঠুরতার দিকগুলোর সম্মুখীন হয়েছে সে। সত্যের শুধু একটা দিক দেখেছে। ফাঁতিনের মধ্যে সে দেখেছে নারীজাতির চরম দুর্ভাগ্য আর বিড়ম্বনা, জেভার্তের মধ্যে দেখেছে শাসন কর্তৃপক্ষের নির্মম প্রভুত্ব। দ্বিতীয়বার সে জেলে যায়, এবার কিন্তু এক মহৎ কারণেই স্বেচ্ছায় কারাদণ্ড তুলে নেয় নিজের মাথায়। কিন্তু আগের বারের মতো এবারেও শ্রমজনিত এক নিবিড় ক্লান্তি, দুর্বিষহ অবসাদ, আর সমাজের প্রতি অদম্য ঘৃণা, বিতৃষ্ণা আর তিক্ততা তার মনটাকে এমন প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে বিশপের পবিত্র স্মৃতিটাও মাঝে মাঝে মুছে যায় মন থেকে। পরে অবশ্য সে স্মৃতি গ্রহণমুক্ত চাঁদের মতো। উজ্জ্বল হয়ে বেরিয়ে এলেও তার উজ্জ্বলতা অনেক কমে যায় আগের থেকে। ভলজাঁ যে হতাশ ও হতোদ্যম হয়ে তার নৈতিক সংগ্রাম ত্যাগ করেনি একথা জোর করে কে বলতে পারে? জীবনে একজনকে ভালোবাসতে পেরে সে অবশ্য মনের মধ্যে শক্তি খুঁজে পায়। তবু কিন্তু মনের দিক থেকে কসেত্তে’র থেকে কম দুর্বল ছিল না। কসেত্তেকে সবদিক দিয়ে রক্ষা করে চলত আর কসেত্তে মা’র মতো তার প্রাণশক্তিটাকে লালন করে চলত। তার জন্যই কসেত্তে জীবনে এগিয়ে যেতে পারত। ভলজাঁ ছিল কসেত্তে’র একমাত্র অবলম্বন আর কসেত্তে ছিল তার একমাত্র আশ্রয়স্থল। নিয়তির এক মহান ভারসাম্য দুটি জীবনকে ধরে রেখেছিল।
.
৪.
সদাসতর্ক হয়ে থাকত জাঁ ভলজাঁ। সতর্কতা হিসেবে সে দিনের বেলায় বাসা ছেড়ে কোথাও যেত না। প্রতিদিন সন্ধায় সে দু-এক ঘণ্টার জন্য বেড়াতে যেত বাইরে। কোনওদিন একা একা, আর কোনওদিন বা কসেত্তেকে সঙ্গে নিয়ে শহরের নির্জন রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ বেড়িয়ে আসত। রাত্রির অন্ধকার ঘন হয়ে উঠলে কোনও কোনওদিন চার্চে যেত। সবচেয়ে কাছে ছিল সেন্ট মেদার্দ নামে একটা চার্চ। ভলজাঁ সেখানেই যেত।
