এই বলে ঘরে থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য দরজা খুঁজতে লাগল সে। এমন সময় জাঁ ভলজাঁ’র হাসিমাখা মুখখানা দেখেই বলল, সুপ্রভাত মঁসিয়ে। তা হলে দেখছি সব সত্যি।
আনন্দ আর উল্লাস যেন বাচ্চাদের এক সহজাত অনুভূতি, তাদের মনের এক স্বাভাবিক অঙ্গ। তাই যে কোনও অবস্থাতেই তারা অতি সহজেই আনন্দে মেতে উঠতে পারে, এক সরল সুখানুভূতিতে গাঁ ঢেলে দিতে পারে। বিছানার তলার দিকে ক্যাথারিন নামে তার পুতুলটাকে পড়ে থাকতে দেখে সেটাকে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল। তার পর জাঁ ভলজাঁকে নানারকম প্রশ্ন করতে লাগল, আমরা এখন কোথায় আছি? প্যারিস কি খুব একটা বিরাট শহর? মাদাম থেনার্দিয়ের কি অনেক দূরে আছে! সে কি তাদের কাছে আসবে?
সহসা বলে উঠল, জায়গাটা কত সুন্দর!
তাদের ঘরটা ছিল ছাদের ঘর। কসেত্তে নিজেকে মুক্ত এবং নিরাপদ ভাবল।
কসেত্তে আবার জিজ্ঞাসা করল ভলজাঁকে, তুমি আমাকে দিয়ে ঘর ঝাঁট দেয়াবে না তো?
জাঁ ভলজাঁ বলল, না, তুমি শুধু আনন্দ করে বেড়াবে।
এইভাবে দিনটা কেটে গেল। কী ঘটেছে না ঘটেছে, কী কারণে সে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় এল তা জানতে চাইল না সে। শুধু তার ত্রাণকর্তা আর পুতুলটাকে নিয়ে এক অনির্বচনীয় সুখের অনুভূতিতে আত্মহারা হয়ে রইল।
.
৩.
পরদিনও সকাল হতেই কসেত্তে’র বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল জাঁ ভলজাঁ। সে জেগে না ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগল নীরবে।
সম্পূর্ণ নতুন একটা ভাব যেন ধীরে ধীরে মাথা তুলে উঠছিল তার অন্তরের মধ্যে।
জীবনে সে কখনও কাউকে ভালোবাসেনি। পঁচিশ বছর ধরে সে পৃথিবীতে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে এসেছে। কারও সঙ্গে তার কোনও আত্মীয় সম্পর্ক নেই, সে কারও পিতা নয়, কারও প্রেমিক নয়, স্বামী নয়, বন্ধু নয়। জেলখানায় সে সব সময় নিরানন্দ, বিষণ্ণ ও মনে মনে হিংস্র হয়ে থাকত। সেখানে কোনও কিছুই এই কয়েদির অন্তরকে স্পর্শ করতে পারত না। তার বোন ও বোনের ছেলেমেয়েদের জন্য তার মনে যে চিন্তা ছিল তা ক্রমে দূরে সরে যেতে যেতে বিলীন হয়ে যায় অবশেষে। সে তাদের খুঁজে বার করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে। কিন্তু না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে মন থেকে তাদের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দেয়। মানবমনের এই হল ধর্ম। তার যৌবনের অন্যান্য স্মৃতিগুলোও কোথায় হারিয়ে গেল একে একে।
কিন্তু কসেত্তেকে দেখা এবং তাকে তার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আনার পর থেকে এক অনুভূতির অবতারণা হয় তার মধ্যে। ভালোবাসার সব অনুভূতিগুলো এক সঙ্গে সজাগ হয়ে উঠে কসেত্তে’র পানে একটি মাত্র ধারায় পরিণত হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। কসেত্তে’র শয্যাপার্শ্বে দাঁড়িয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মানে এক রোমাঞ্চকর আনন্দের আবেগে বিকশিত হওয়া। মাতৃসুলভ এক বেদনার্ত মমতার অনুভূতি জাগল তার মধ্যে, কিন্তু সে অনুভূতির স্বরূপটাকে সে বুঝে উঠতে পারল না। অকস্মাৎ এক নবজাগ্রত ভালোবাসার আবেগে অভিভূত অন্তরের মতো গভীরতর ও মধুরতম আর কিছু হতে পারে না। সে আবেগের স্পর্শে বিষণ্ণ বয়োপ্রবীণ অন্তরও নতুন হয়ে ওঠে সহসা।
যেহেতু জাঁ ভলজাঁর বয়স তখন পঞ্চান্ন এবং কসেত্তে’র বয়স আট, ভলজাঁ’র সমস্ত ভালোবাসার ঐশ্বর্য শুধু স্নেহে ঘনীভূত হয়ে উঠল। বিশপ ভলজাঁকে একদিন গুণশীলতার কথা শেখান। আজ কসেত্তে তাকে ভালোবাসা কী জিনিস তা শেখাল। প্রথম দু-একটা দিন এই সব চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে কেটে গেল।
কসেত্তে’র মধ্যেও একটা পরিবর্তন দেখা দিল। অথচ সে তা বুঝতে পারল না। তার মা যখন তাকে হোটেলে রেখে চলে যায় তখন সে এত ছোট যে সে কথা তার মনে নেই। সকল অনাথ শিশুই আঙুরগাছের লতার মতো একটা শক্ত জিনিসকে অবলম্বন করে বেড়ে উঠতে চায়। এই অবলম্বনের জন্য ভালোবাসার এক সুদৃঢ় বনস্পতিকে খুঁজে পেতে চায়। কিন্তু তা পায়নি সে। ভালোবাসার পরিবর্তে পেয়েছে শুধু ঘৃণা। থেনার্দিয়ের আর তাদের ছেলেমেয়েরা তাকে বরাবর ঘৃণা করে এসেছে। সে যেন তাদের বাড়িতে কুকুরের মতো ছিল। পৃথিবীতে কেউ তাকে চায়নি কোনওদিন। কেউ তাকে ভালোবাসেনি। তার ফলে মাত্র আট বছর বয়সেই তার শিশু-অন্তর ভালোবাসার অভাবে নীরস হয়ে ওঠে, ভালোবাসার সব ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তার পর জাঁ ভলকে কাছে পাওয়ার পর থেকে ভলজাঁই তার সকল চিন্তা ও অনুভূতির বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। আত্মোঘাটনের যে রহস্য আগে কখনও কোনওদিন অনুভব করেনি সে, সে রহস্য আজ প্রথম অনুভব করল।
ভলজাঁকে গরিব বা বৃদ্ধ বলে মনে হল না কসেত্তে’র। বরং সে দেখতে সুন্দর বলেই মনে হল। ঘৃণার মাঝে ভালোবাসা, দুঃখের মাঝে সুখের স্পর্শ পেয়ে নতুন জায়গায় এসে নতুন জীবন শুরু করে মনটা যেন একেবারে নতুন হয়ে ওঠে কসেত্তে’র।
জাঁ ভলজাঁ আর কসেত্তে’র মধ্যে পঞ্চাশ বছরের যে প্রকৃতিদত্ত ব্যবধান ছিল, নতুন পরিস্থিতি এক সেতুবন্ধের দ্বারা সে ব্যবধান ঘুচিয়ে দিল। নিয়তির অপ্রাকৃত শক্তি বয়সের ব্যবধানে বিচ্ছিন্ন দুটি প্রাণসত্তাকে এক অবিচ্ছিন্ন ঐক্যসূত্রে বেঁধে দিল। পরস্পরের সাহচর্য পরস্পরের নিঃসঙ্গতার সব বেদনাকে দূরীভূত করে দেয়। পিতার প্রতি এক সহজাত অভাববোধ ছিল কসেত্তে’র আর সন্তানের জন্য এক সহজাত অভাববোধ ছিল জাঁ ভলজাঁর। তাদের দুজনের দেখা হওয়ার পর থেকে দু জনের প্রয়োজনের পরিব্যাপ্তি ঘটতে থাকে। একজন অন্যজনকে দেখেই তার অভাব ও প্রয়োজনীয়তার কথা জানতে পারে এবং সে অভাব পূরণ করতে থাকে। বিপত্নীক-এর মতো এক নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করত জাঁ ভলজাঁ আর কসেত্তে ছিল পিতামাতাহীন এক অনাথ শিশু। অনাথা কসেত্তে’র পিতা হয়ে উঠল ভলজাঁ। সেদিন রাত্রিকালে বনভূমিতে ভলজাঁ’র ওপর যে আস্থা স্থাপন করে কসেত্তে, সে আস্থা মিথ্যা হয়নি। তার জীবনে ভলজাঁ’র আবির্ভাব যেন স্বয়ং ঈশ্বরের আবির্ভাব।
