সঁইত্রিশ বছর আগে ৫০-৫২ নম্বর এই বাড়িটা এই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জায়গা ছিল। ভালো ও ভদ্র বাসিন্দাদের বাড়িগুলো তৈরি হতে শুরু হয় তার পঁচিশ বছর পরে। বধ্যভূমি ছাড়াও এ জায়গায় মেয়েদের একটা পাগলাগারদও ছিল। এ অঞ্চলে এলে পর যে দিকেই দৃষ্টি যাবে দেখা যাবে শুধু কসাইখানার মতো বাড়িগুলো এক একটি হত্যাকাণ্ডের ভয়ঙ্কর সাক্ষীরূপে দাঁড়িয়ে আছে। কোনও জায়গা দেখে যদি ভয়ঙ্কর এক নারকীয় যন্ত্রণার কথা, হত্যা আর মারাত্মক পীড়নের কথা মনে পড়ে যায় তা হলে বুলভার্দ দ্য হপিতাল হল তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
কিন্তু বিশেষ করে শীতকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন সব আলো নিভে যায়, যখন সারাদিন ধরে এলমগাছের পাতাগুলো ঝরবার কাজ করে হিমেল বাতাসে স্তব্ধ হয়ে যায়, যখন কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশে কোনও তারা দেখা যায় না, যখন বাতাসের সাহায্যে মেঘের এক একটা অংশ কিছুটা কাটিয়ে দিয়ে চাঁদের আলো বেরিয়ে আসে তখন ওই বুলভার্দ অঞ্চলটা হয়ে ওঠে আরও ভয়ঙ্কর। এ অঞ্চলের সীমারেখাগুলো অন্তহীন এক ঘন কালো ছায়ার মধ্যে ডুবে যায়। এক ভয়াবহ নির্জনতার মধ্যে ডুবে গিয়ে বহু হত্যাকাণ্ডের আধারভূমি এই জায়গাটা পথচারীর মনে কত অশুভ দুঃস্বপ্নের সৃষ্টি করে। ঝোঁপঝাড় আর গাছগুলোর মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গাগুলোকে এক একটা মৃত্যুর ফাঁদ বলে সন্দেহ হয়। ছায়াঘন প্রতিটি জায়গাকেই মৃত্যুকুটিল এক একটা সমাধিগহ্বর বলে সন্দেহ হয়। দিনের বেলায় জায়গাটা কুৎসিত দেখায়, সন্ধ্যার সময় বিষণ্ণ দেখায়, আর রাত্রিবেলায় ভয়ঙ্কর দেখায়।
গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যায় গাছগুলোর তলায় অনেক বৃদ্ধা বৃষ্টির জলে-ভেজা আধপচা কাঠের রেকে বসে থাকে ভিক্ষাপাত্র হাতে।
এছাড়া বুলভার্দের বাকি অঞ্চলটায় দিনে দিনে কত পরিবর্তন ঘটেছে। ফবুর্গের পাশ দিয়ে প্যারিস থেকে অর্লিয়ান্সের পথে যে রেলপথ চলে গেছে সেই রেলপথের দৌলতেই এ অঞ্চলের যত কিছু উন্নতি। এই অঞ্চলেই বিপ্লবের ঢেউটা বেশি জোরে আছাড় খেয়ে পড়ে, গণ-অভ্যুত্থান তীব্রতর হয়ে ওঠে। মনে হয় সভ্যতার বেগবান ঘোড়াটা কয়লা আর আগুনের শিখা গ্রাস করতে করতে এগিয়ে যায়, কলুষিত পৃথিবীর মাটি মানুষের মতো সব প্রাচীন আবাসগুলোকে যেন খেয়ে ফেলে আর সেই সব জায়গায় গড়ে ওঠে নতুন আবাস। প্যারিস-অর্লিয়ান্স লাইনের প্রান্তভাগে সালপেত্রিয়ের অঞ্চলের সরু রাস্তাটার দু পাশের পুরনো বাড়িগুলো যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাপে বিলুপ্ত হয়ে যায় একে একে। এইভাবে ধীরে ধীরে এক নতুন শহর গড়ে ওঠে। এক নতুন জীবনের স্পন্দন দেখা দেয় সমস্ত অঞ্চলজুড়ে। যত যব নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা আর অখণ্ড নিস্তব্ধতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় যানবাহন আর লোকজনের চাপে। অবশেষে ১৮৪৫ সালের জুলাই মাসের কোনও এক সকালে সভ্যতার ছুটন্ত ঘোড়াটা র্যু লোসিনে পর্যন্ত এগিয়ে আসে আর প্যারিস শহরটা নিজেকে প্রসারিত করে ফবুর্গ সেন্ট মার্কোর দিকে চলে আসে।
.
২.
গোর্বোতে একটা বাড়ির সামনে এসে থেমে যায় জাঁ ভলজাঁ। কোনও শিকারি পাখির মতো বাসা বাঁধার জন্য দূরতম কোনও নির্জন প্রদেশের খোঁজ করছিল সে। কসেত্তেকে তখনও সে বয়ে বেড়াচ্ছিল পিঠের উপর। তার কোটের পকেটে যে চাবিটা ছিল সেটা বার করে একটা ঘরের দরজা খুলে তার মধ্যে ঢুকে পড়েই দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে সিঁড়ির উপর দিয়ে উঠে গেল উপরে।
দোতলার বারান্দায় উঠে আর একটা চাবি বার করে আর একটা ঘরের দরজা খুলল সে। সে ঘরের মধ্যে ঢুকেও দরজাটা বন্ধ করে দিল। রাস্তার ধারে যে একটা ল্যাম্প পোস্ট ছিল তার আলোয় ঘরের ভেতরের অনেকখানি দেখা যাচ্ছিল। ঘরখানার আয়তনটা ছিল মাঝারি ধরনের! মেঝের উপর একটা তোষক পাতা ছিল। একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার ছিল এক জায়গায়। ঘরের এক কোণে একটা স্টোভ জ্বলছিল। ঘরের পেছন দিকে তার গায়ে আর একটা ছোটা ঘর ছিল। সে ঘরে একটা ছোট বিছানা পাতা ছিল। জাঁ ভলজাঁ সেখানে গিয়ে কসেত্তেকে সেই ছোট বিছানাটায় শুইয়ে দিল। তাকে জাগাল না।
টেবিলে একটা বাতি প্রস্তুত হয়ে ছিল। কাছেই চকমকি আর লোহা ছিল। ভলজাঁ চকমকির সাহায্যে আগুন জ্বেলে বাতিটা জ্বালাল। যে নিবিড় মমতা মানুষের আত্মাকে এক সমুন্নতির স্তরে নিয়ে যায় সেই মমতার সঙ্গে গতকালকের মতো কসেত্তে’র মুখপানে তাকিয়ে রইল জাঁ ভলজাঁ। যে পরিপূর্ণ বিশ্বাস মানুষের মনে দারুণ জোর নিয়ে আসে অথবা সে মনকে একটা স্বেচ্ছাকৃত দুর্বলতার স্রোতে ভাসিয়ে দেয় সেই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে সে কোথায় কার কাছে আছে তা জেনেই নিশ্চিন্ত ঘুমিয়ে পড়েছে। নত হয়ে কসেত্তের একটা হাত টেনে নিয়ে চুম্বন করল সে। আজ হতে নয় মাস আগে তার মা-ও এমনি করে ঘুমিয়ে পড়লে তার হাত চুম্বন করে সে। সেদিনকার মতোই আজও এক ধর্মীয় অনুভূতি অপরিসীম বেদনা আর অপার করুণায় বিগলিত হয়ে তার মর্মকে ভেদ করল। নতজানু হয়ে সেদিনকার মতো প্রার্থনা করতে লাগল সে।
পরদিন সকালবেলা দেখা গেল কসেত্তে তখনও ঘুমোচ্ছে। খোলা জানালা দিয়ে শীতের ম্লান রোদ এসে ঘরের কড়িকাঠগুলো ধরে যেন ঝুলছিল। কম্পিত আলোছায়ার খেলা চলছিল ঘরখানার মধ্যে। হঠাৎ রাস্তার উপর একটা বড় মালবোঝাই গাড়ির চাকার ঘর্ঘর আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে ঘুমের ঘোরেই বলে উঠল, যাচ্ছি মাদাম। আমার ঝাটাটা কোথায়?
