.
১১.
সমুদ্রে পড়ে গিয়ে জাঁ ভলজাঁ’র মৃত্যু হয়নি। আমরা জানি সে যখন জাহাজ থেকে সমুদ্রের জলে পড়ে যায় অথবা নিজে থেকেই ঝাঁপ দেয় তখন তার পায়ে শিকল ছিল না। সে জলের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কেটে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা জাহাজের পাশে একটা নৌকোয় গিয়ে ওঠে এবং রাত্রি না হওয়া পর্যন্ত সেই নৌকোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে। অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠার পর সে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে ক্যাপ ব্রান থেকে কিছু দূরে কূলের উপর একটা জায়গায় ওঠে। তার কাছে টাকা থাকায় তাই দিয়ে জামা-প্যান্ট কিনে নেয়। তার পর সে বানাগিয়েরের কাছে একটা মদের দোকানে গিয়ে ওঠে। সেই দোকানে পলাতক কয়েদিদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করা হত। এরপর জাঁ ভুলা অন্যান্য পলাতক কয়েদিদের মতো অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে পথ চলতে থাকে এক নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। সে প্রথমে বোসেতের। কাছে লে পার্দো নামে এক জায়গায় আশ্রয় পায়। সেখানে থেকে হতেস আল্পস-এর অন্তর্গত ব্রিয়া নামে একটা গাঁয়ে যায়। এইভাবে ছুঁচোর মতো লুকিয়ে লুকিয়ে এখানে-সেখানে বেড়াত। পরে সে পিরেনিজের অন্তর্গত একটা গাঁয়ে এবং তার কাছাকাছি পেরিগো নামে আর একটা গাঁয়ে যায়। সেখানে থেকে কালক্রমে প্যারিস এবং পরে প্যারিস থেকে যায় মঁতফারমেলে।
প্যারিসে গিয়ে সে প্রথমে একটা ঘর ভাড়া করে এবং তার পর আট বছরের মেয়ের জন্য শোকসূচক কালো পোশাক কেনে। পরে পুলিশ জানতে পারে মন্ত্রিউল সুর-মেরের পুলিশ-হাজত থেকে পালাবার পর ভলজাঁ একবার তফারমেল ও তার পাশাপাশি এলাকায় যায়। কিন্তু জেলের কয়েদি হিসেবে কাজ করতে করতে একটা। লোককে বাঁচাবার পর সমুদ্রের জলে যখন সে পড়ে যায় তখন সবাই ভাবে সে মারা গেছে। পুলিশের এখনও ধারণা সে আর জীবিত নেই। ভলজাঁ নিজেও খবরের কাগজে প্রকাশিত তার মৃত্যুর খবরটা দেখে আশ্বস্ত হয়। তার মনে হয় সে সত্যিই মারা গেছে।
মঁতফারমেল থেকে কসেত্তেকে উদ্ধার করার পর ভলজাঁ তাকে প্যারিসে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর প্যারিসে পৌঁছবার পর একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে এসপ্লানেদ দ্য অবজারভেটারির কাছে গাড়িটা ছেড়ে দিয়ে কসেত্তে’র হাত ধরে নির্জন গলিপথ দিয়ে বুলভার্দ দ্য হপিতালে গিয়ে ওঠে।
একটা দিনের মধ্যে কসেত্তে’র জীবনে কত আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যায়। পথে কখনও পায়ে হেঁটে, কখনও গাড়িতে আসে তারা। পথের ধারে যেসব দোকান পায় তার থেকে রুটি আর মাখন কিনে বনের মধ্যে বসে দু জনে খায়। পথ হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে কসেত্তে। তবু সে তার ক্লান্তির কথা বলেনি। এক সময় ভলজাঁ তার ক্লান্তির কথা বুঝতে পেরে তাকে পিঠের উপর চাপিয়ে পথ হাঁটতে থাকে। কসেত্তে হাতের পুতুলটা ধরে তার ঘাড়ে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
২.৪ আজ হতে চল্লিশ বছর আগে
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
১.
আজ হতে চল্লিশ বছর আগে কেউ যদি ঘুরতে ঘুরতে সালপেত্রিয়ের পার হয়ে বুলভার্দ দ্য হপিতালে আসত এবং সেখানে থেকে ব্যারিয়ের দ্য ইতালির পথে এগিয়ে যেত তা হলে তার মনে হত এটা হচ্ছে এমনই এক অঞ্চল সেখান থেকে প্যারিস শহরটা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। সে বেশ বুঝতে পারত এটা কোনও অরণ্য নয়, কারণ সেখানে মানুষ বাস করে। এটা কোনও গ্রাম বা গ্রামাঞ্চল নয়, কারণ যেখানে বড় বড় চওড়া রাস্তা এবং বড় বড় পাকা বাড়ি আছে, যা সাধারণত গাঁয়ে নেই। আবার ঠিক খাঁটি শহরও বলা যায় না, কারণ সেখানকার রাস্তাগুলো কাঁচা এবং তাতে ঘাস গজিয়ে উঠেছে। তবে জায়গাটা কী? এটা প্যারিসেরই এক রাস্তা, যে রাস্তা রাত্রিবেলায় অরণ্যের থেকেও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে আর দিনেরবেলায় সমাধিভূমির থেকেও নির্জন আর বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এ অঞ্চলটা আগে ছিল ঘোড়ার হাট যার নাম ছিল মার্শে-অ-শেভভা।
বাজারের ভাঙা দেয়ালগুলোর বাইরে র্যু দা পেতিত ব্যাংকিয়েরের ওধারে দেয়ালঘেরা একটা জায়গা আছে। কেউ যদি সেদিকে এগিয়ে যায় তা হলে দু দিকে দুটো বাগানবাড়ির মাঝখানে একটা কারখানার কাছে পুরনো আমলের একটা কটেজ ধরনের বাড়ি দেখতে পাবে। বাড়িটা কটেজ ধরনের দেখতে একতলা হলেও সামনে থেকে যতটা ছোট মনে হয় আসলে তা নয়। আসলে বাড়িটা এক বড় গির্জার মতোই বড়। সামনে থেকে শুধু বাড়িটার একটা মাত্র জানালা দেখা যায়। জায়গাটার নাম ভিগনে সেন্ট মাইকেল।
বাড়িটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে যে কারণে আশ্চর্য লাগে সেটা হল এই যে বাড়িটার দরজাগুলো কটেজ ধরনের বাড়িটার সঙ্গে খাপ খেয়ে গেলেও তার জানালাগুলো অট্টালিকা ধরনের এক বাড়ির উপযুক্ত। তাছাড়া দরজাগুলো কেনা ছিল না; এখান-সেখান থেকে কাঠ জোগাড় করে তৈরি করা হয়। সামনের দরজাটা খুললেই সামনেই চওড়া সিঁড়ি পাওয়া যায়। বাইরে থেকে মনে হয় একটা যেন বড় মই অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। দরজার মাথার উপর একটা তিনকোনা ঘুলঘুলি আছে যাতে দরজা বন্ধ থাকলে তার মধ্য দিয়ে আলো-বাতাস ঢুকতে পারে। দরজার ভেতরে কপাটের উপর ৫২ আর কপাটের উপর ৫০ লেখা আছে। একটা ময়লা কম্বল পর্দার মতো ঘুলঘুলির ফাঁকটা ঢেকে আছে। অতীতে এখানে এক হত্যাকাণ্ড ঘটে যার রহস্য আজও উদঘাটিত হয়নি। এই হত্যাকাণ্ড ফতেনব্লো হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। এর কিছুদূর আগে ক্রোলগর্বে নামে একটা জায়গা আছে যেখানে উলবাক নামে একটা লোক এক ছাগলওয়ালীকে কোনও এক ঝড়ের রাতে হত্যা করে। কতকগুলি এলমগাছ জটলা পাকিয়ে হত্যাকাণ্ডের জায়গাটাকে লোকচক্ষু থেকে আড়াল করে আছে।
