সে ঠিকই ভেবেছিল। কসেত্তে’র বিশ্রামের জন্য লোকটা কিছুক্ষণ বসেছিল সেখানে।
থেনার্দিয়ের তাদের সামনে গিয়ে সরাসরি বলল, মাপ করবেন মঁসিয়ে, আমি আপনার পনেরো শো ফ্রাঁ ফিরিয়ে দিচ্ছি।
এই বলে সে তিনটে ব্যাংকনোট দেবার জন্য তুলে ধরল।
নবাগত তার মুখপানে তাকিয়ে বলল, এর মানে?
থেনার্দিয়ের গম্ভীরভাবে বলল, এর মানে মঁসিয়ে আমি কসেত্তেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
কসেত্তে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লোকটিকে জড়িয়ে ধরল।
নবাগত থেনার্দিয়েরের মুখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শান্ত কণ্ঠে বলল, আপনি কসেত্তেকে নিয়ে যাবেন?
থেনার্দিয়ের বলল, হ্যাঁ মঁসিয়ে। আমি অনেক ভেবেছি। তাকে আপনার হাতে তুলে দেবার আমার কোনও অধিকার নেই। আমার একটা সম্মান আছে। মেয়েটা আমার নয়, ওর মা আমার কাছে ওকে রেখে গেছে। সুতরাং তার মায়ের হাতেই আমাকে তুলে দিতে হবে তাকে। আপনি হয়তো বলবেন তার মা-বাবা মারা গেছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সে লোক তার মায়ের সই করা কোনও চিঠি দেখাবে তারই হাতে তুলে দিতে হবে মেয়েটাকে। এই চিঠি খুবই আবশ্যক।
নবাগত তার পকেট থেকে আবার সেই চামড়ার প্যাকেটটা বার করল। তাতে অনেক ব্যাংকনোট ছিল।
থেনার্দিয়ের ভাবল লোকটা তাকে আবার টাকার ঘুষ দিতে আসছে। এই সময় তার বন্দুকটা থাকলে ভালো হত।
নবাগত প্যাকেটটা বার করার আগে তার চারদিকে একবার তাকাল। জায়গাটা একেবারে নির্জন। কেউ কোথাও নেই। প্যাকেটটা খুলে নোটের পরিবর্তে সে একটা কাগজ বার করল। কাগজটা ভাঁজ করে সে থেনার্দিয়েরের হাতে তুলে দিল।
নবাগত বলল, আপনি এটা চেয়ে ঠিকই করেছেন। দয়া করে পড়ে দেখুন। থেনার্দিয়ের দেখল একটা ছোট্ট চিঠি। সে পড়তে লাগল,
মন্ত্রিউল-সুর-মের
২৫ মার্চ, ১৮২৩ সাল।
মঁসিয়ে থেনার্দিয়ের,
আপনি পত্রবাহকের হাতে কসেত্তেকে দিয়ে দেবেন। আপনার পাওনা টাকা সব শোধ করে দেবেন উনি। আমার শ্রদ্ধা গ্রহণ করবেন।
ফাঁতিনে
নবাগত বলল, আপনি স্বাক্ষরটা বুঝতে পারছেন?
থেনার্দিয়ের বুঝতে পারল, হাতের লেখাটা যে ফাঁতিনের সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কোনও উত্তর খুঁজে পেল না থেনার্দিয়ের। দু দিক থেকে রাগ হতে লাগল। নবাগতের কাছ থেকে আর কোনও টাকা পাওয়ার কোনও অবকাশ বা উপায় রইল না। তার ওপর তাকে হার মানতে হল।
নবাগত বলল, আপনি চিঠিটা প্রমাণ হিসেবে রেখে দিতে পারেন।
থেনার্দিয়ের একবার শেষ চেষ্টা করে বলল, সইটা ভালোভাবেই জাল করা হয়েছে। তবু যাই হোক, আপনি যখন চিঠিটা এনেছেন আপনার কথাই মেনে নিচ্ছি। তবে লেখা আছে আমার সব পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সে তো অনেক টাকা হবে।
নবাগত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মঁসিয়ে থেনার্দিয়ের, কসেত্তে’র মা গত জানুয়ারি মাসে বলেছিল তার কাছ থেকে আপনি একশো কুড়ি ফ্র পাবেন। ফেব্রুয়ারি মাসে আপনি পাঁচশো ফ্রা’র এক বিল পাঠান। আপনি ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে তিন শো ফ্রাঁ আর মার্চের শেষে তিনশো ফ্ৰাঁ পান। তার পর ন’ মাস কেটে গেছে। মাসে পনেরো ফ্রাঁ করে দেবার কথা হয়েছে। তা হলে এই ন’মাসের জন্য আপনার পাওনা হয় এক শো পঁয়ত্রিশ ফ্রাঁ। আপনাকে প্রথমেই এক শো ফ্ৰাঁ অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। তা হলে আপনি সব বাদ দিয়ে মাত্র পঁয়ত্রিশ ফ্র পাবেন। অথচ আপনাকে আমি পনেরো শো ফ্রাঁ দিয়েছি।
থেনার্দিয়েরের মনে হল সে ফাঁদেপড়া এক নেকড়ে। সে ভাবতে লাগল, কে এই শয়তান?
থেনার্দিয়ের তখন সব ভদ্রতা ঝেড়ে ফেলে বলল, হে নাম-না-জানা ভদ্ৰ মহাশয় আপনাকে আরও এক হাজার ফ্রাঁ দিতে হবে। তা না হলে আমি কসেত্তেকে নিয়ে যাব।
নবাগত শান্ত কণ্ঠে ডাক দিল, এস কসেত্তে।
সে বাঁ হাত দিয়ে কসেত্তেকে তুলে ধরে ডানহাত দিয়ে তার ছড়িটা তুলে নিল মাটি থেকে। যেনার্দিয়ের ভাবল ছড়িটা লাঠির মতো, মাথায় গোল হাতল আছে। তার উপর। জায়গাটা নির্জন। আর কোনও কথা না বলে নবাগত কসেত্তে’র হাত ধরে বনের মধ্যে ঢুকে গেল। থেনার্দিয়ের সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বজ্রাহতের মতো। সে নবাগতের চওড়া কাঁধ আর হাতের মুঠোগুলোর সঙ্গে তার নিজের রোগা রোগা চেহারাটার তুলঁনা করে ভয় পেয়ে গেল। সে নিজের মনে বলতে লাগল, আমি কী বোকা, সঙ্গে বন্দুকটা শিকার করতে যাচ্ছি বলে আনতে পারতাম।
তবু সে আশা ছাড়ল না। সে ভাবল, ওরা কোথায় কোন দিকে যাচ্ছে তা অন্তত দেখব।
এই ভেবে সে ওদের অনুসরণ করতে লাগল। এই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে লাগল সে ফাঁতিনের সই করা একটা চিঠি হাতে পেয়েছে। তাতে অবশ্য তার কোনও লাভ হবে না। কিন্তু পনেরো শো ফ্ৰাঁ সে পেয়েছে।
নবাগত কসেত্তেকে সঙ্গে নিয়ে লিভরির দিকে এগিয়ে চলেছিল। এক বিষণ্ণ চিন্তায় মাথাটা নত করে পথ হাঁটছিল সে। শীতের মরশুমে সব গাছের পাতা ঝরে যাওয়ায় বনের ফাঁকে ফাঁকে তাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। এরপর লোকটা কসেত্তেকে নিয়ে কতকগুলি গাছের জটলার আড়ালে চলে গেল। থেনার্দিয়ের আর তাদের দেখতে পেল না। একটা আস্ত শয়তান’ এই বলে সে তাদের ধরার জন্য ছুটতে লাগল।
বনটা সেখানে ঘন থাকায় উভয় পক্ষে পথ চলায় অসুবিধা হচ্ছিল। থেনার্দিয়ের যথাসম্ভব গাছের আড়ালে অনুসরণ করলেও নবাগত একসময় পেছন ফিরে তাকে দেখতে পেল। সে মাথা নেড়ে আবার পথ চলতে লাগল। থেনার্দিয়ের তবু অনুসরণ করতে থাকায় নবাগত আবার পেছন ফিরেই তাকে দেখতে পেল। কিন্তু এবার সে থেনার্দিয়েরের পানে এমন ভয়ঙ্করভাবে তাকাল যে থেনার্দিয়ের বুঝল আর অনুসরণ করা। উচিত নয় তার পক্ষে। তাই সে ঘুরে বাড়ির পথে রওনা হল।
