এই সব চিন্তা-ভাবনা নিয়ে তার সকালের কাজে যথারীতি মন দেয় কসেত্তে। সে প্রথমে সিঁড়িগুলোতে ঝাঁট দিতে থাকে। কিন্তু মাঝেমধ্যে সে কাজ ফেলে, কাজের কথা ভুলে থমকে দাঁড়িয়ে তার পকেটের ভেতর চকচকে স্বর্ণমুদ্রাটাকে দেখতে থাকে।
এমন সময় মাদাম থেনার্দিয়ের এসে শান্ত কণ্ঠে তাকে বলে, তোমাকে এখনি আসতে হবে।
কসেত্তে নিচের তলায় নেমে এলে নবাগত তার পুঁটলি খুলে আট বছরের এক মেয়ের উপযুক্ত দামি পশমি পোশাক, মোজা আর জুতো বার করে দিল। তার সঙ্গে একটা শালও আছে। সব পোশাকের রঙগুলো কালো।
নবাগত বলল, এইগুলো সব তোমার। যত তাড়াতাড়ি পার, পরে নাও।
সেই মঁতফারমেলে সকাল হতেই বাড়ির সদর দরজা খুলতে শহরের অনেকইে দেখল দীনহীনের মতো পোশাকপরা একটি লোকের সঙ্গে একটি ছোট মেয়ে দামি পোশাক পরে একটা বড় পুতুল হাতে র্যু দ্য প্যারিসের পথে হেঁটে চলেছে। ওরা যাচ্ছে লিভরি’র পথে। লোকটি কে তা শহরের কেউ চিনতে পারল না। ভালো পোশাক পরে থাকায় কসেত্তেকেও চিনতে পারল না তারা।
কোথায় কার সঙ্গে যাচ্ছে তা কসেত্তে নিজেও জানত না। সে শুধু জানত চিরদিনের মতো থেনার্দিয়েরদের বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছে সে। কেউ তাকে বিদায় দেয়নি সে বাড়ি থেকে, সে-ও বিদায় জানায়নি কাউকে। সে যেমন এতদিন ধরে এক তীব্র ঘৃণা পেয়ে এসেছে তাদের কাছ থেকে তেমনি তাদের প্রতিও এক তীব্র ঘৃণা নিয়েই সে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এতদিন সে তার কোনও সহজাত অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারেনি।
গম্ভীরভাবে পথ হেঁটে চলেছিল কসেত্তে। মাঝে মাঝে বিস্ফারিত চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাকাচ্ছিল মুক্তনীল আকাশের পানে। জীবনে আজ প্রথম মুক্তির আনন্দ অনুভব করল সে। তার ওপর স্বর্ণমুদ্রা আর পুতুল। স্বর্ণমুদ্রাকে তার নতুন অ্যাপ্রনের পকেটে রেখেছিল আর মাঝে মাঝে উঁকি মেরে দেখছিল। এক একবার সে নিঃশব্দে পথ চলতে থাকা তার পাশের লোকটিকেও দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল সে যেন ঈশ্বরের অনেক কাছে চলে এসেছে।
.
১০.
মাদাম থেনার্দিয়ের তার অভ্যাসমতো বড় কিছু প্রাপ্তির আশায় স্বামীকে নবাগতের কাছে ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে গেল। নবাগত কসেত্তেকে নিয়ে হোটেল ছেড়ে চলে যাবার মিনিট পনেরো পর থেনার্দিয়ের তার স্ত্রীকে ডেকে পনেরো শো ফ্রাঁ দেখাল।
কিন্তু মাদাম থেনার্দিয়ের তাতে রুষ্ট হয়ে বলল, শুধু এই পেলে?
গুরুত্বপূর্ণ সব কাজে স্বামীকে বরাবর সমর্থন করে আসছে মাদাম থেনার্দিয়ের। একমাত্র এই ব্যাপারেই জীবনে আজ প্রথম প্রতিবাদ করল সে তার স্বামীর কাজের।
কথাটার আঘাতে হুঁশ হল তার স্বামীর।
থেনার্দিয়ের বলল, ঠিক বলেছ, আমিই বোকা। আমার টুপিটা কোথায়?
এই বলে সে নোটগুলো পকেটে ভরে রেখে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। কিন্তু সে বা দিকে না গিয়ে ডান দিকের পথ ধরল। তার পর যখন পথে একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানল একটা ভবঘুরের মতো লোক একটা মেয়েকে সঙ্গে করে উল্টো দিকে গেছে তখন সে ঘুরে আবার ঠিক পথ ধরল। সে লিভরি’র পথে জোরে ছুটতে লাগল।
পথে ভাবতে লাগল থেনার্দিয়ের, হলুদ কোটপরা লোকটা নিশ্চয় লক্ষপতি আর আমি বোকা। প্রথমে সে কুড়ি স্যু দেয় তার পর পাঁচ ফ্রাঁ। তার পর পঁচিশ আর তার পর পনেরো শো ফ্রাঁ। এত সব দেয় প্রতিবাদের একটা গুঞ্জনও না তুলে। তাকে জোর করে চেপে ধরলে সে নিশ্চয় পনেরো হাজার ফ্ৰাঁ দিত। যাই হোক, আমি তাকে ধরে ফেলব।
তাছাড়া তার সেই পুঁটলিটাতে মেয়েটার সব পোশাক আগে হতেই নিয়ে এসেছিল। এটা সত্যিই আশ্চর্যজনক ব্যাপার। ও কী করে কসেত্তেকে চিনল, তার জন্য পোশাকই-বা আনল কী করে? ধনীদের রহস্য কে জানে? তাদের কাছ থেকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় কিভাবে করতে হয়, তা জানতে হয়। তাই সে বারবার ভাবতে লাগল, আমি বোকা।
মঁতফারমেল গা-টাকে পেছনে ফেলে লিভরি যাবার পথের মোড়ে এলেই দেখা যায় সামনে এক বিরাট প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে পথটা চলে গেছে। থেনার্দিয়ের ভাবল, এইখানে সে লোকটার দেখা পাবে। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে সে কিছুই দেখতে পেল না। এইখানে আর একজনকে জিজ্ঞাসা করতে হল। কিছুটা সময় নষ্ট হল। একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানল, তারা গ্যাগনির দিকে একটা বনের মধ্য দিয়ে গেছে।
এ অঞ্চলের সব পথঘাট চেনা ছিল থেনার্দিয়েরের। সে তাড়াতাড়ি সেইদিকে চলে গেল। মেয়েটা নিশ্চয় বেশি জোরে হাঁটতে পারবে না।
হঠাৎ থেমে কপালে একটা হাত দিয়ে কী দেখতে লাগল থেনার্দিয়ের। সে নিজের মনে মনে বলল, আমার বন্দুকটা আনা উচিত ছিল।
উপর থেকে দেখলে মনে হবে থেনার্দিয়ের একজন সৎ ব্যবসায়ী। একজন শান্ত নিরীহ নাগরিক। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে স্বার্থপূরণের উপযুক্ত সুযোগ পেলে সে এক পুরো শয়তান হয়ে উঠতে পারে। সে ব্যবসায়ী হলেও আসলে সে একটা রাক্ষস।
কিছুক্ষণ ভেবে সে ঠিক করল তাদের সন্ধানে এখন কালবিলম্ব না করে এগিয়ে যাবে। এখন ফিরে গিয়ে বন্দুক আনতে গেলে তারা তার নাগালের বাইরে চলে যাবে। শিকারের গন্ধে উন্মত্ত খেকশিয়ালের মতো সে ছুটতে লাগল। অবশেষে বড় প্রান্তরটা পার হয়ে একটা পাহাড়ের ধারে একটা বনের প্রান্তে একটা টুপি দেখতে পেল। থেনার্দিয়েরের মনে হল এরা এক জায়গায় বসে আছে। মেয়েটার পুতুলের মাথাটা দেখা যাচ্ছে।
