নবাগত নীরবে তার মুখপানে তাকিয়ে রইল।
থেনার্দিয়ের আবার বলতে শুরু করল, মাপ করবেন মঁসিয়ে। কেউ কখনও কোনও পথিকের হাতে তার ছেলেকে তুলে দেয় না। আমি কি ঠিক বলছি না? অবশ্য যদিও আপনি পথিক হলেও ধনী এবং সৎ বলেই মনে হচ্ছে। আমি তার ভালোর জন্যই এ কথা বললাম। আমি আশা করি আপনি তা বুঝতে পারবেন। মনে করুন, আমি তাকে যেতে দিলাম তার প্রতি আমার সব অনুভূতিকে দমন করে। কিন্তু তাই বলে তাকে চিরদিনের মতো চোখের আড়াল করতে পারি না। আমার জানা উচিত সে কোথায় থাকবে, যাতে আমি মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসতে পারি, যাতে সে-ও বুঝতে পারে তার পালকপিতা তার ওপর লক্ষ রাখে। আমি আপনার নাম-ধাম কিছুই জানি না। আপনি যদি তাকে নিয়ে যান তা হলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগবে আমার মনে, কসেত্তে কোথায় গেল? কী ঘটল তার জীবনে? আপনার পাসপোর্ট বা বাসস্থান সম্বন্ধে অন্তত একটুকরো কাগজ দেখান।
নবাগত থেনার্দিয়েরের ওপর থেকে তার তীক্ষ্ণ মর্মভেদী দৃষ্টিটা সরিয়ে নিয়ে দৃঢ়স্বরে বলল, মঁসিয়ে থেনার্দিয়ের, প্যারিস থেকে পাঁচ-দশ মাইলের মধ্যে কোথাও গেলে কখনও পাসপোর্টের দরকার হয় না। আমি যদি কসেত্তেকে নিয়ে যাই তা হলে ব্যাপারটার এইখানেই নিষ্পত্তি ঘটবে চিরদিনের জন্য। আমার নাম বা বাসস্থানের কথা কিছুই বলা হবে না আপনাকে। আমার ইচ্ছা সে আর কখনও চোখ জুড়বে না আপনার সঙ্গে। তার এই বর্তমান জীবনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাই আমি। বলুন আপনি রাজি আছেন?
দানবরা যেমন উচ্চস্তরের দেবতার উপস্থিতির কথা কোনও না কোনও লক্ষণ দ্বারা বুঝতে পারে থেনার্দিয়ের তেমনি বুঝতে পারল প্রভূত নৈতিক শক্তিসম্পন্ন এক ব্যক্তির সঙ্গে এবার তাকে লড়াই করতে হবে। এটুকু বোঝার মতো অন্তদৃষ্টি তার ছিল। গতকাল সন্ধে থেকে রাত পর্যন্ত সে হৈ-হুল্লোড় ও গান-বাজনায় মত্ত থাকলেও সে বারবার তার তীক্ষ্ণ সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে নবাগতকে বারবার নিরীক্ষণ করেছে। এক নীতিগত কর্তব্যবোধ ও কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই এ কাজ করেছে সে। ফলে হলুদ কোটপরা নবাগতের কোনও অঙ্গভঙ্গি বা কথাবার্তাই দৃষ্টি এড়ায়নি তার। কসেত্তে’র প্রতি নবাগত কোনও আগ্রহ বা মমতা দেখাবার আগে সে এটা অনুমান করেছিল। সে বারবার কসেত্তে’র ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখেছে তাকে। কসেত্তে’র প্রতি তার এই আগ্রহের কারণ কী? তার কাছে থলেভরা টাকা থাকা সত্ত্বেও সে কেন এমন দীনহীনের মতো পোশাক পরে থাকে? সারারাত ভেবেও এই সব বিভ্রান্তিকর বিরক্তিকর প্রশ্নের কোনও সংগত উত্তর খুঁজে পায়নি থেনার্দিয়ের। লোকটা কখনই কসেত্তে’র পিতা হতে পারে না। তবে কি সে তার পিতামহ? কিন্তু তা হলে কেন সে দাবি জানাচ্ছে না কসেত্তে’র ওপর? তবে কে সে? থেনার্দিয়েরের মাথাটা খারাপ হয়ে যেতে লাগল। সে অনেক কিছু অনুমান করল, কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। তবু যখন সে বুঝল নবাগতের জীবনে কিছু একটা গোপন। ব্যাপার আছে, যা সে গোপন রাখতে চায় তখন সে তার নিজের দিকটাকে জোরালো ভাবল। আবার যখন দেখল নবাগত কোনওক্রমেই তার রহস্যকে উদ্ঘাটিত করতে চায় না, বরং চাপ দেওয়া সত্ত্বেও সে রহস্যের আবরণটা আরও জোর করে জড়িয়ে নিতে চায়। তখন সে হতাশ না হয়ে পারল না। সে তখন ঠিক করল এইভাবে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি না করে তার আসল কথাটা খোলাখুলিভাবে সোজাসুজি বলা উচিত। অভিজ্ঞ সেনানায়কের মতো একনজরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে থেনার্দিয়েরের।
সে বলল, মঁসিয়ে, আমি পনেরোশো ফ্রাঁ চাই।
নবাগত সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা চামড়ার প্যাকেট থেকে পাঁচশো ফ্রা’র তিনটে ব্যাংকনোট বার করে টেবিলের উপর রাখল। তার পর বলল, নিয়ে আসুন কসেত্তেকে।
এদিকে কসেত্তে সেদিন সকালে জেগে উঠেই তার সেই একপাটি কাঠের কদাকার জুতোটার মধ্যে একটা স্বর্ণমুদ্রা পেল। মুদ্রাটা কুড়ি ফ্রা’র। মুদ্রাটা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বেরিয়েছে। যদিও এ মুদ্রা সে কখনও দেখেনি এর আগে এবং কত দাম তা সে জানে না, তবুও সে এটা পেয়ে খুশি হয়ে সে তার জামার পকেটে রাখল। কোথা হতে সে মুদ্রাটা এসেছে, এটাও বুঝতে পারল সে। আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও হচ্ছিল তার। আনন্দের থেকে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল বেশি। এই সব অকাতর দান, এত সুন্দর সুন্দর উপহার দেখে সে সত্যিই ভীত হয়ে পড়েছিল। এই দামি পুতুল আর এই স্বর্ণমুদ্রার মতো ঐশ্বর্যের জৌলুসভরা জিনিস দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকে সে। তবে অবশ্য এই সব জিনিস যে তাকে দিয়েছে সেই নবাগতকে দেখে কিন্তু তার ভয় করে না, বরং এক পরম আশ্বাস খুঁজে পায় তার জীবনে। গতকাল সন্ধে থেকে এক পরম বিস্ময়ের সঙ্গে সর্বক্ষণ এই অচেনা-অজানা লোকটির কথা ভেবেছে। ঘুমের মধ্যেও স্বপ্নে তাকে দেখেছে। লোকটিকে দেখে গরিব, বৃদ্ধ ও বিষণ্ণ মনে হলেও সে ধনী এবং দয়ালু। গত সন্ধ্যায় সেই অন্ধকার বনভুমিতে লোকটির সঙ্গে দেখার পর থেকে কসেত্তে’র গোটা জীবনটার মধ্যেই যেন এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। বনের পক্ষীশাবকদের মতো সে তার মায়ের ডানার তলায় কোনওদিন কোনও নিশ্চিন্ত আশ্রয় পায়নি। তখন থেকে সে তার জীবনের কথা মনে করতে পারছে সেই পাঁচ বছর থেকে আজ পর্যন্ত সে শুধু ভয়ে কেঁপে এসেছে। সহায়-সম্বলহীন একটি নিঃসঙ্গ আত্মা ক্রমাগত বয়ে যাওয়া চরম দুর্ভাগ্যের হিমশীতল এক প্রচণ্ড ঝড়ের সামনে সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে নীরব নিরুচ্চার এক বেদনায় কাঁপতে থেকেছে। এখন মনে হল তার, তার সে আত্মা আর অনাবৃত নেই। সে আর নিঃসঙ্গ বা অসহায় নয়। এখন আর সে তার মালিকপত্নীর ভয়ে ভীত নয় আগের মতো। এখন একজন তার পাশে আছে। প্রতিরক্ষাগত এক উত্তপ্ত আশ্বাসে তার অসহায় নিঃসঙ্গতার যত সব হিমশীতল বেদনা কোথায় উবে গেছে।
