একটুখানি হেসে তার স্বামী বলল, হ্যাঁ, দেবে।
তার হাসিটার মধ্যে এক পরিপূর্ণ আশ্বাস আর একটা প্রভুত্বের ভাব ছিল। তার স্ত্রী আর এ নিয়ে কোনও কথা বলল না। সে ঘর পরিষ্কার করার কাজে মন দিল। থেনার্দিয়ের ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে একসময় বলল, আমি পনেরো শো ফ্ৰাঁ পাই।
এই বলে সে আগুনের কাছে বসে ভাবতে লাগল।
তার স্ত্রী বলল, পুতুলটার কথা ভাবলেই আমার মাথাটা খরাপ হয়ে যায়। তুমি নিশ্চয়। ভোলনি, আমি আজ কসেত্তেকে বার করে দিচ্ছি। আর একটা মিনিটও তাকে আমি সহ্য করতে পারব না।
থেনার্দিয়ের তার পাইপটা ধরাচ্ছিল। পাইপ থেকে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে সে বলল, বিলটা তাকে দিয়ে দেবে।
এই বলে সে বেরিয়ে গেল।
ঘর থেকে বেরোতে না বেরোতেই নবাগত এসে ঘরে ঢুকল। তার হাতে সেই লাঠি আর পুঁটলিটা ছিল। থেনার্দিয়ের আবার ফিরে এল। মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন! আপনি কি এখনি চলে যাবেন?
কথা বলার সময় বিলটা তার হাতে মোচড়ানো অবস্থায় ধরা ছিল। তার মুখের ওপর একটা নিবিড় কুণ্ঠা ফুটে উঠেছিল। যে লোকটাকে বেশভূষা এতখানি গরিব দেখায় তাকে কী করে সে এত টাকার বিল দেবে তা খুঁজে পাচ্ছিল না।
নবাগত আনমনে বলল, হ্যাঁ যাচ্ছি।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, মিতফারমেলে মঁসিয়ের কোনও কাজ নেই?
নবাগত বলল, না আমি এমনি এদিকে দিয়ে যাচ্ছিলাম এক জায়গায়। আমার কত হয়েছে মাদাম?
কোনও কথা না বলে তার হাতে বিলটা ধরিয়ে দিল মাদাম থেনার্দিয়ের। নবাগত একবার সেটা দেখল। কিন্তু কিছু বলল না। তার মনটা অন্য চিন্তায় নিবিষ্ট ছিল।
কিছু পরে নবাগত বলল, মঁতফারমেলে আপনাদের কারবার কেমন চলছে মাদাম?
বিলটা দেখে নবাগত রাগে ফেটে পড়ল না বা তার মধ্যে কোনও বিরূপ বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হল না দেখে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। সে উৎসাহিত হয়ে বলল, খুব ভালো।
তার পর একটু ভেবে করুণ সুরে বলল, দিনকাল বড় খারাপ যাচ্ছে মঁসিয়ে। আজকাল খরিদ্দার খুব কম আসে। গরিব দেশ। আপনার মতো কিছু ধনী খরিদ্দার মাঝে মাঝে না এলে আমরা চালাতেই পারতাম না। কত খরচ আমাদের। তার ওপর মেয়েটার ব্যয়ভার। আপনি জানেন না ওর পেছনে কত খরচ?
নবাগত বলল, কোন মেয়েটার কথা বলছেন?
কেন, যাকে আপনি গতকাল রাতে দেখছেন, কসেত্তে। বকাটে চাষিগুলো আবার একে লার্ক পাখি বলে। আমরা কারও কাছে কোনও দান চাইতে পারি না বা দিতে পারি না। আজকাল আমাদের রোজগার খুব কম হয়। তার ওপর দেনা শোধ দিতে হয়। এমন। সরকার হয়েছে, আমাদের লাইসেন্স, কর ইত্যাদির ব্যাপারে কত টাকা চলে যায়। তার ওপর আমাদের নিজেদের ছেলেমেয়ে আছে। তাদের দেখতে হয়। পরের মেয়ে মানুষ করার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই।
কিছুটা ইতস্তত করার পর কাঁপা কাঁপা কুণ্ঠিত গলায় বলল, মনে করুন আমি মেয়েটাকে আপনাদের কাছ থেকে যদি নিয়ে যাই?
কে–কসেত্তেকে?
হ্যাঁ।
মাদাম থেনার্দিয়েরের লাল ম্লান মুখখানা সহসা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, হ্যাঁ মঁসিয়ে, ওকে নিয়ে যান। আপনি ওকে নিয়ে যান। ওর ভার নিন। কুমারীমাতা মেরি আপনার মঙ্গল করবেন। স্বর্গের সাধুরা আপনাকে আশীর্বাদ করবেন।
ঠিক আছে, আমি ওকে নিয়ে যাব।
সত্যিই কি আপনি ওকে নিয়ে যাবেন?
হ্যাঁ।
এখনি?
নিশ্চয়। তাকে এখানে নিয়ে আসুন।
মাদাম থেনার্দিয়ের ডাক দিল, কসেত্তে!
নবাগত বলল, ইতোমধ্যে আমি আপনাদের টাকাটা দিয়ে দিই। কত হয়েছে বললেন?
এবার সে বিলটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চমকে উঠে বলল, তেইশ!
এই বলে সে মাদাম থেনার্দিয়েরের পানে তাকাল। তার দৃষ্টির মধ্যে কিছুটা বিস্ময়ের একটা প্রশ্ন মেশানো ছিল।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, হ্যাঁ, মঁসিয়ে, তেইশ ফ্রাঁ।
নবাগত টেবিলের উপর পাঁচ ফ্রাঁ করে পাঁচটা মুদ্রা রাখল। তার পর বলল, ঠিক আছে। মেয়েটাকে নিয়ে আসুন।
এমন সময় থেনার্দিয়ের এসে ঘরে ঢুকে বলল, মঁসিয়ের কাছে আমরা ছাব্বিশ স্যু পাব।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, কেন?
থেনার্দিয়ের বলল, কুড়ি স্যু ঘরের জন্য আর ছয় স্যু রাতের খাওয়ার জন্য। আর কসেত্তের ব্যাপারে মঁসিয়ের সঙ্গে কথা বলছি। তুমি একটু বাইরে যাও তো।
মাদাম থেনার্দিয়ের ব্যাপারটা এক মুহূর্তে বুঝে নিল। যখন প্রধান অভিনেতা মঞ্চের উপর এসে হাজির হয়েছে তখন সে নিজে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। এসব ব্যাপার এক লহমায় বোঝার মতো তার একটা সহজাত ক্ষমতা ছিল।
থেনার্দিয়ের এবার নবাগতকে বসতে বলে নিজে দাঁড়িয়ে রইল। এবার তার মুখের ওপর এক কৃত্রিম সরলতা আর একটা শান্ত ভাব ছিল।
থেনার্দিয়ের বলল, মঁসিয়ে, আমি মেয়েটাকে ভালোবাসি।
কোন মেয়ে?
থেনার্দিয়ের বলল, আসক্তি জিনিসটা সত্যিই আশ্চর্যের। এখানে টাকার কথাটা বড় নয়। আমি টাকা চাই না, আমি মেয়েটাকে রেখে দিতে চাই।
কোন মেয়ের কথা বলছেন আপনি?
কেন, আমাদের কসেত্তে’র কথা। আপনি মেয়েটাকে নিয়ে যেতে চাইছেন না? ভদ্রলোকের মতো আমরা খোলাখুলি আলোচনা করতে চাই। আমি তাকে যেতে দিতে পারি না। সে চলে গেলে তার অভাবটা আমায় খুব বেশি অনুভব করতে হবে। আমি তাকে ছোট থেকে দেখে আসছি। একথা সত্যি যে তার জন্য খরচ হয় এবং তার দোষত্রুটিও আছে। এটাও ঠিক যে আমরা ধনী নই এবং একবার তার অসুখের জন্য আমাকে চার শো ফ্রাঁ খরচ করতে হয়। কিন্তু এই সব কিছুই আমরা ঈশ্বরের সেবা এবং পবিত্র কর্তব্য হিসেবে করে যাই। তার বাবা-মা কেউ নেই। আমি শৈশব থেকে। লালন-পালন করছি তাকে। তাকে খাওয়াবার মতো সামর্থ্য আমার আছে। তাকে ছাড়া আমার চলবে না। স্নেহ কী বিষয় বস্তু তা জানেন না। আমি নির্বোধ, আমার কোনও যুক্তিবোধ নেই। তাই বোকার মতো তাকে ভালোবেসে যাই আর আমার স্ত্রীও তাকে ভালোবেসে যদিও সে মাঝে মাঝে দোষ করলে কিছু শক্ত কথা বলে। তিরস্কার করে। ও আমাদের নিজের সন্তানের মতোই হয়ে গেছে। আমি চাই ও আমাদের বাড়িতে খেলে ও ছোটাছুটি করে বেড়াক।
