নবাগত বলল, আস্তাবল হলেই আমার চলে যেত।
থেনার্দিয়ের যেন শুনেও শুনল না। সে দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে আলমারির উপর রেখে দিল। উনোনে আগুন জ্বলছিল। একটা বড় কাঁচের জারের মধ্যে মেয়েদের মাথায় পরার একটা পোশাক ছিল। একটা রুপোর তার দিয়ে সেটা বাঁধা ছিল।
নবাগত বলল, ওটা কী?
থেনার্দিয়ের বলল, এটা আমার স্ত্রীর বিয়ের বনেট।
আসলে কিন্তু সেটা বিয়ের বনেট নয়। ওটা পুরনো, এক জায়গা থেকে কেনা। থেনার্দিয়ের মিথ্যা কথা বলছিল। শুধু তার স্ত্রীকে খাতির করত এই কথা বলে।
হঠাৎ নবাগত মুখ ঘুরিয়ে দেখল সে ঘরের মধ্যে একা। থেনার্দিয়ের কখন একসময় ঘর থেকে নিঃশব্দে চলে গেছে তাকে ‘শুভরাত্রি না জানিয়েই। কারণ সে জানে পরদিন যার নামে মোটা বিল করে টাকা আদায় করবে তার সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব করা ভালো নয়।
থেনার্দিয়ের তার শোবার ঘরে গিয়ে দেখল তার স্ত্রী বিছানায় শুয়ে আছে, কিন্তু ঘুমোয়নি তখনও।
মাদাম থেনার্দিয়ের তাকে ঘুরে ঢুকতে দেখে বলল, আমি ভাবছি কসেত্তেকে কাল ছেড়ে দেব।
থেনার্দিয়ের বলল, তুমি সব ব্যাপারেই তাড়াহুড়ো করতে চাও।
আর কেউ কোনও কথা বলল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বাতিটা নিবিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল।
নবাগত তার ছড়ি আর পুঁটলিটা এক জায়গায় রেখে একটা আর্ম চেয়ারে বসে ভাবতে লাগল। সে একসময় পায়ের জুতো জোড়াটা খুলল। তার পর বাতিটা নিবিয়ে দিল। সে দরজাটা খুলে কসেত্তে যে ঘরে শুয়ে আছে সেই ঘরে যাবার পথটা খুঁজতে লাগল। সে বারান্দা দিয়ে সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গেল। এমন সময় একটা ঘরে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়ে সেই শব্দ অনুসরণ করে সে সিঁড়ির তলায় দেখল তিন কোনা দরজাহীন ঘরের মতো একটা জায়গায় কতকগুলি ভাঙা ঝুড়ি, বাক্স, ধুলো আর মাকড়সার জালের মধ্যে একটা ছেঁড়া তোষক পাতা রয়েছে মেঝের উপর আর কসেত্তে তার উপর শুয়ে ঘুমোচ্ছে।
নবাগত অদূরে দাঁড়িয়ে তা দেখতে লাগল।
কসেত্তে শীতের ভয়ে জামা-প্যান্ট পরেই ঘুমোচ্ছে। পুতুলটা তার হাতেই ধরা আছে। মাঝে মাঝে সে একটা করে জোর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিল যেন এখনি জেগে উঠবে। কিন্তু সে ঘুমের ঘোরেই পুতুলটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরছিল। একটা কাঠের জুতো তার পায়ে ছিল আর একটা জুতো তোষকের পাশে পড়ে ছিল। কসেত্তে যেখানে ঘুমোচ্ছিল তার কাছেই একটা ঘর ছিল। অন্ধকারে ঘরটা দেখা যাচ্ছিল না। নবাগত সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরটা দেখতে লাগল। সে দেখল ঘরটার একপ্রান্তে সাদা ধবধবে চাদর পাতা দুটো বিছানায় এপোনিনে আর অ্যাজেলমা ঘুমোচ্ছিল। তাদের বিছানার পাশে একটা দোলনায় একটি শিশুপুত্র ঘুমোচ্ছিল। নবাগত বুঝতে পারছিল সারা সন্ধে ধরে এই ছেলেটির কান্না তারা শুনে এসেছে।
নবাগত বুঝল এই ঘরটার পাশেই একটা ঘর আছে এবং সেখানে থেনার্দিয়ের দম্পতি ঘুমোচ্ছে। হঠাৎ দেখল থেনাদিয়েরের মেয়েরা যে ঘরে ঘুমোচ্ছিল সেই ঘরে আগুন জ্বালার জায়গাটার কাছে একটা করে জুতো পড়ে আছে। নবাগত বুঝতে পারল এটাই। হল রীতি। ছেলেমেয়েরা আগুনের চুল্লির কাছে একপাটি করে জুতো রেখে যায়। তা হলে সকালে উঠে তারা দেখবে সেই জুতোর মধ্যে এক সদাশয় পরী কখন এসে একটা করে উপহার দিয়ে গেছে। নবাগত দেখল, পরীর পক্ষ থেকে তাদের মা-ই সেই জুতো দুটোর মধ্যে একটা করে দশ স্যু’র মুদ্রা রেখে দিয়ে গেছে।
নবাগত এবার চলে যাচ্ছিল সেখান থেকে। কিন্তু যেতে গিয়ে হঠাৎ দেখতে পেল সেই জুতোর পাটি দুটোর থেকে কিছু দূরে একপাটি কাঠের কুৎসিত জুতো পড়ে রয়েছে। কিন্তু কোনও মুদ্রার উপহার নেই তার মধ্যে। মা’র রূপ ধরে কোনও সদাশয় পরী কোনও উপহার দিয়ে যায়নি তাতে।
নবাগত তার পকেট থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা বার করে সেই জুতোটার মধ্যে ফেলে দিল। তার পর সে তার নিজের ঘরে চলে গেল।
.
৯.
পরদিন সকাল হবার দু ঘণ্টা আগেই বড় বসার ঘরটাতে টেবিলের ধারে বসে থেনার্দিয়ের কলম হাতে নবাগতের জন্য হোটেলখরচের বিল তৈরি করতে লাগল। সকালের আলো তখন ফুটে না ওঠায় বাতি জ্বেলে কাজ করছিল সে। তার স্ত্রী তার পাশে তার ঘাড়ের উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল। কেউ কোনও কথা বলছিল না। তাদের একজন খুঁটিয়ে হিসাব করে যাচ্ছিল একমনে আর একজন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির শক্তি কতখানি হতে পারে এবং কিভাবে তার প্রকাশ ঘটতে পারে তা এক ভীতিবিহ্বল শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতে যাচ্ছিল। সিঁড়িতে কিসের শব্দ হচ্ছিল। তারা বুঝল কসেত্তে উঠে সিঁড়ি ঝাট দিচ্ছে।
পনেরো মিনিট ধরে চেষ্টা করার পর অবশেষে বিলটা তৈরি করে ফেলল থেনার্দিয়ের। বিলটা হল এই রকম : রাতের খাওয়া ৩ ফ্রাঁ, ঘরভাড়া ১০ ফ্রাঁ, বাতিখরচ ৫ ফ্রাঁ, আগুন ৪ ফ্রাঁ, ভূত্যখরচ ১ ফ্রাঁ–সব মিলিয়ে মোট ২৩ ফ্রাঁ। ভৃত্যখরচের জায়গায় বানানটা ভুল করল।
মাদাম থেনার্দিয়ের ভয়ে ভয়ে বলে উঠল, তেইশ ফ্রাঁ!
বড় বড় শিল্পীদের মতো নিজের কাজে নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারল না থেনার্দিয়ের।
বলল, বাহ্, এ তো কিছুই হল না।
তার মেয়েদের সামনে লোকটা একট দামি পুতুল কিনে দিয়েছে এজন্য নবাগতের ওপর রাগ ছিল মাদাম থেনার্দিয়েরের। তাই সে কথা মনে করে বলল, ঠিক করেছ প্রিয়তম। ঠিক হয়েছে। তবে বিলটা বেশ হয়েছে। এত টাকা দেবে কি?
