একই সঙ্গে বেদনা আর আনন্দের আবেগ আর কোনও কথার ওপর এমনভাবে ঝরে পড়েনি কখনও।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, নিশ্চয়, এটা তোমার। ভদ্রলোক তোমায় দিয়েছেন।
কসেত্তে আবার বলল, এটা কি সত্যি মঁসিয়ে? পুতুলটা আমার?
নবাগতের চোখে জল এসে গিয়েছিল। তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে তাই কথা বলতে পারছিল না। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল এবং পুতুলটা কসেত্তে’র হাতের মধ্যে দিল।
কসেত্তে হাতটা পুতুল থেকে সরিয়ে নিল যেন পুতুলটার স্পর্শে তার হাত পুড়ে গেছে।
অবশেষে সে মেঝের দিকে তাকিয়ে পুতুলটা নিয়ে বলল, আমি এর নাম দেব ক্যাথারিন।
সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। মেয়েটির ছেঁড়াখোঁড়া পোশাকের পটভূমিকায় পুতুলটার গোলাপি চকচকে রঙটা বেমানান লাগছিল।
কসেত্তে বলল, পুতুলটাকে চেয়ারের উপর বসাতে পারি মাদাম?
এপোনিনে আর অ্যাজেলমা ঈর্ষান্বিতভাবে তাকিয়ে রইল পুতুলটার পানে। কসেত্তে পুতুলটাকে আরেকটা চেয়ারের উপর বসিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
নবাগত বলল, পুতুলটা নিয়ে খেলা করো কসেত্তে।
আমি তো খেলা করছি।
সেই সময় মাদাম থেনার্দিয়ের সারা পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র নবাগত ছাড়া আর কাউকে এত বেশি ঘৃণা করত না। নবাগত যেন অন্য এক জগৎ থেকে হঠাৎ কসেত্তে’র জীবনে নেমে এসেছে। মাদাম থেনার্দিয়ের যদিও সব কাজে তার স্বামীর কথামতো চলার চেষ্টা করে অথবা তার ভান করে তথাপি এই মুহূর্তে নবাগতের প্রতি তার নবজাগ্রত ঘৃণার অনুভূতিটাকে দমন করতে পারল না। সে তাড়াতাড়ি তার মেয়েদের বিছানায় শুতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে নবাগতের কাছে গিয়ে কসেত্তেকে শুতে পাঠাবার অনুমতি চাইল। মাতৃসুলভ আগ্রহের সঙ্গে বলল, সারাদিন মেয়েটা কাজ করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কসেত্তে পুতুলটা হাতে নিয়ে চলে গেল।
মাদাম থেনার্দিয়ের তার স্বামী যেখানে বসে ছিল সেইখানে গিয়ে কথার বন্যা ছুটিয়ে তার অবদমিত আবেগকে মুক্ত করল। কথাগুলো চাপা গলায় বলতে হচ্ছিল বলে সেগুলো আরও তীক্ষ্ণ ও আরও বিষাক্ত হয়ে উঠল।
সে বলল, ওই বুড়ো পাগলটা কোথায় থেকে এসে সব ওলটপালট করে দিল, মেয়েটাকে অনবরত খেলা করতে বলছে, তাকে চল্লিশ ফ্রাঁ দিয়ে একটা পুতুল কিনে দিল। অথচ আমরা চল্লিশ স্যু দিয়েও ও পুতুল কিনতাম না। এরপর সে মেয়েটাকে ‘মহারানি’ বলে ডাকবে। লোকটা কি পাগল?
থেনার্দিয়ের বলল, মেয়েটাকে খেলতে দেখে সে যদি মজা পায় তো পাক না। তুমি যেমন ওকে কাজ করিয়ে আনন্দ পাও, ও তেমনি মেয়েটাকে খেলতে দেখে আনন্দ পায়। খরিদ্দার যদি আমাদের হোটেলখরচ মিটিয়ে দেয় তা হলে যা খুশি সে করতে পারে। সে পরোপকারী বা অপদার্থ যা-ই হোক না কেন তাতে তোমার কী আসে-যায়? তার নিশ্চয় অনেক টাকা আছে।
নবাগত আবার টেবিলের উপর কনুই রেখে ভাবতে শুরু করল। যারা গান করছিল তারা গান থামিয়ে দিয়ে বসে ছিল। তারা সবাই ভয়মেশানো শ্রদ্ধার সঙ্গে নবাগতকে দেখছিল। যে মানুষটা এমন গরিবের মতো পোশাক পরে আছে, সে কী করে একটা ছোট মেয়ের পেছনে একটা স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে? এ সত্যিই দেখার মতো জিনিস।
কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। দুপুররাতের সমবেত প্রার্থনা শেষ হয়ে গেল। হৈ-হুল্লোড় থামিয়ে সবাই শুতে চলে গেল। তখন ঘর একেবারে ফাঁকা। আগুনটা জ্বলতে জ্বলতে স্তিমিত হয়ে এসেছে। নবাগত কিন্তু যেখানে বসে ছিল সেখানেই একা বসে রইল। কসেত্তে চলে যাওয়ার পর সে একটা কথাও বলেনি।
থেনার্দিয়েররা পাশের ঘর থেকে দেখতে পেল নবাগতকে। তারা বলাবলি করতে লাগল, ও কি এইভাবেই রাত কাটাবে?
কিন্তু রাত দুটো বাজতেই মাদাম থেনাদিয়েরের ঘুম এসে পড়ল। সে আর বসে থাকতে পারল না। বলল, তোমার যা খুশি করতে পার।
থেনার্দিয়ের টেবিলের এক কোণে বসে একটা খবরের কাগজ পড়তে লাগল। গোটা কাগজটা তার পড়া হয়ে গেল, কিন্তু নবাগত তবু একটুও নড়ল না। যেমন বসে ছিল তেমনিই বসে বসে ভাবতে লাগল।
থেনার্দিয়ের কেশে, চেয়ারটার সরিয়ে কিছু শব্দ করে নবাগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। সে ভাবল, লোকটা কি বসে বসেই ঘুমোচ্ছে?
কিন্তু লোকটা সত্যি সত্যিই ঘুমোচ্ছিল না। কিন্তু কিছুতেই সে উঠছিল না বা কোনও দিকে তাকাচ্ছিল না। অবশেষে থেনার্দিয়ের তার মাথা থেকে টুপিটা খুলে নবাগতের কাছে গিয়ে সাহস করে বলল, মঁসিয়ে, বিশ্রাম করতে যাবেন না?
কথাটা সাবধানে কায়দা করে বলল থেনার্দিয়ের। শুতে যাওয়ার থেকে বিশ্রাম করতে যাওয়ার কথাটা আরও শোভন ও সম্মানজনক। এ কথার গুণে আগামীকাল অনেক বেশি টাকার বিল করা যাবে। সাধারণ একটা শোবার ঘরের ভাড়া হল কুড়ি স্যু, কিন্তু একটা বিশ্রামাগারের ভাড়া হল কুড়ি।
নবাগত বলল, অবশ্যই। আপনি ঠিকই বলছেন। আপনাদের আস্তাবলটা কোথায়?
থেনার্দিয়ের মৃদু হেসে বলল, মঁসিয়ে চাইলে আমিই আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।
নবাগত তার লাঠি আর পুঁটলিটা তুলে নিল। বাতি হাতে থেনার্দিয়ের নবাগতকে দোতলার একট ঘরে নিয়ে গেল। মেহগনি কাঠের আসবাব আর লাল পর্দা দেওয়া ঘরটা এক অপ্রত্যাশিত ঐশ্বর্যে ভরা।
নবাগত বলল, এ কী?
থেনার্দিয়ের বলল, এটা আমাদের বিয়ের বাসরঘর। আমি আর আমার স্ত্রী এখন অন্য ঘরে শুই। বছরে মাত্র তিন-চারবার এই ঘরটা ভোলা এবং ব্যবহার করা হয়।
