কিন্তু কসেত্তে’র সে আনন্দ স্থায়ী হল না বেশিক্ষণ। তার সতর্কতা সত্ত্বেও সে বুঝতে পারেনি, পুতুলের একটা পা এমনভাবে বেরিয়ে আছে যাতে সেটা পেছন থেকে দেখা যায়। জ্বলন্ত আগুনের ছটায় অ্যাজেলমা পুতুলের গোলাপি পা-টা প্রথমে দেখতে পায়। সে তার দিদিকে দেখাল এবং তখন দুই বোনে এক ক্ষুব্ধ বিস্ময়ের সঙ্গে পেছন থেকে কসেত্তেকে দেখতে লাগল, ভাবল কসেত্তে’র এত বড় সাহস হল যে সে তাদের পুতুলে হাত দেয়!
এপোনিনে বিড়ালছানাটা ধরেই তার মাকে ডেকে নিয়ে এল।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, কী হয়েছে?
এপোনিনে হাত বাড়িয়ে কসেত্তেকে দেখিয়ে বলল, দেখ দেখ।
পুতুল পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা হয়ে সবকিছু ভুলে গিয়েছিল যেন।
মাদাম থেনার্দিয়েরের মুখখানা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। আহত অভিমান তার ক্রোধের আবেগকে শতগুণে বাড়িয়ে দিল। সব ছাড়িয়ে গেছে কসেত্তে। সে তার মালিকের মেয়েদের পুতুলে হাত দিয়েছে! এতদূর স্পর্ধা তার! রাশিয়ার সম্রাট জারের পত্নী কোনও গরিব কৃষককে তার রাজকুমারের নীল কোমরবন্ধনীতে সজ্জিত দেখলেও হয়তো এত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত না।
প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে কড়া গলায় মাদাম থেনার্দিয়ের ডাকল কসেত্তেকে, কসেত্তে!
কসেত্তে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পেছন ফিরল। তার মনে হল তার পায়ের তলার সব মাটি কাঁপছে।
মাদাম থেনার্দিয়ের আবার জোর গলায় ডাকল, কসেত্তে!
কসেত্তে এবার তার হাত থেকে পুতুলটা নামিয়ে রেখে তার হাত দুটো জড়ো করে মোচড়াতে লাগল। তার পর সে এমন একটা কাজ করল, আজ সারাদিনের এত সব প্রতিকূল ঘটনার নির্মমতা যা তাকে করাতে পারেনি। অন্ধকার বনের মধ্যে ঝরনা থেকে জল আনতে যাওয়া, ভারী বালতি বওয়ার কষ্ট, পয়সা হারানো, বেত মারার উপক্রম, মাদাম থেনার্দিয়েরের মুখ থেকে তার মার মৃত্যুসংবাদ শোনা প্রভৃতি কোনও ঘটনাই তাকে কাঁদাতে পারেনি। কিন্তু এবার জোরে কেঁদে উঠল কসেত্তে।
নবাগত খেতে খেতে উঠে দাঁড়াল। সে মাদাম থেনার্দিয়েরকে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে?
পুতুলটার দিকে হাত বাড়িয়ে মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, দেখতে পাচ্ছেন না?
নবাগত বলল, আমি বুঝতে পারছি না।
ওই মেয়েটা বেয়াদবি করে আমার মেয়েদের পুতুল নিয়েছে।
নবাগত সহজভাবে বলল, তাতে কী হয়েছে? পুতুলটা নিয়ে সে-ই বা কেন খেলবে না?
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, সে তার নোংব্রা হাত দিয়ে পুতুলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
নবাগত হঠাৎ রাস্তার দিকে দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেল। তার আকস্মিক অন্তর্ধানের সুযোগ নিয়ে কসেত্তেকে একটা লাথি মারল মাদাম থেনার্দিয়ের। তাতে আরও জোরে কাঁদতে লাগল কসেত্তে।
কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এল নবাগত। তার হাতে ছিল সেই সুন্দর বড় পুতুলটা যেটা সারাদিন ধরে গায়ের সব ছেলেমেয়ে পাবার জন্য লোভ করেছে। লুব্ধ দৃষ্টিতে বারবার তাকিয়ে থেকেছে সেটার দিকে।
পুতুলটা কসেত্তের সামনে রেখে নবাগত বলল, এই নাও, এটা তোমার।
হোটেলে এসে ওঠার পর থেকে জানালা দিয়ে রাস্তার ওপারের আলো ঝলমল দোকানগুলো, পানে মাঝে মাঝে তাকিয়েছে সে। আসার পথেও দেখেছে দোকানগুলো।
অন্ধকারাচ্ছন্ন দু চোখের দৃষ্টির সামনে হঠাৎ একঝলক সূর্যরশ্মি এসে পড়লে মানুষ যেমন অভিভূত হয়ে যায় তেমনি পুতুলটার পানে একবার তাকিয়েই অভিভূত হয়ে পড়ল কসেত্তে। এই পুতুলটা তোমার এই অবিশ্বাস্য কথাগুলো শুনে সে একবার নবাগতের পানে আর একবার পুতুলটার পানে তাকায়। তার পরই সে আবার টেবিলের তলায় চলে যায়। সেখানে গিয়ে ভয়ে স্থির ও জড়োসড়ো হয়ে থাকে।
মাদাম থেনার্দিয়ের, এপোনিনে আর অ্যাজেলমা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। যারা গান গাইছিল আর হৈ-হুল্লোড় করছিল তারাও থেমে গেল। এক গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল সারা বাড়িটার মধ্যে।
বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল মাদাম থেনার্দিয়ের। আবার ধারণা আর অনুমানের খেলা চলতে লাগল তার মনে। লোকটা গরিব না ক্রোড়পতি? অথবা দুই-এরই মিশ্রণে গড়া এক অপরাধী আসামি?
কোনও প্রবল আবেগ মানুষকে হঠাৎ আচ্ছন্ন করে বসলে যেমন তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক আর্ত নিবিড়তা তেমনি তার স্বামী থেনার্দিয়েরের মুখে-চোখে তাই ফুটে উঠেছিল। একবার পুতুল আর একবার নবাগত পথিকের পানে তাকিয়ে তার আসল পরিচয়টা অনুমান করার চেষ্টা করল, যেমন কোনও গুপ্তধনখ্যাত জায়গায় গিয়ে মানুষ গুপ্তধনের সন্ধান করতে থাকে।
কিন্তু তার দ্বিধাভাবটা স্থায়ী হল না বেশিক্ষণ। সে তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে চুপি চুপি বলল, ওই পুতুলটার দাম অন্তত তিরিশ ফ্রাঁ। বোকার মতো কাজ করো না, লোকটার কাছে যাও।
সুলতা আর নির্দোষিতা যে এক বস্তু নয়, তা বুঝতে পারল না থেনার্দিয়ের। এ দুটোর মধ্যে কোনও পার্থক্য সে বুঝতে পারত না।
নরম সুরে মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, আচ্ছা কসেত্তে, তুমি তোমার পুতুলটা নেবে না?
তার আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এল কসেত্তে।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, ভদ্রলোক তোমাকে একটা পুতুল দিয়েছেন। এটা তোমার। এটা নিয়ে তুমি খেলা করবে।
সেই ইন্দ্রজালিক পুতুলটার দিকে ভয়ের সঙ্গে তাকাল কসেত্তে। তার মুখখানা তখনও ভিজে ছিল কান্নার জলে। কিন্তু তার চোখ দুটো সকালবেলার মেঘমুক্ত আকাশের মতো এক নতুন আলোর আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল। যে আনন্দের অনুভূতিতে সে মাতোয়ারা হয়ে উঠল। কেউ যদি হঠাৎ স্বর্গ থেকে নেমে এসে তাকে বলত, “হে শিশু, তুমি ফ্রান্সের রানি’ তা হলেও এই আনন্দ থেকে বেশি আনন্দ সে পেত না। তথাপি সে ভয়ে পুতুলটাকে স্পর্শ করতে পারল না পাছে তার থেকে অকস্মাৎ বজ্রপাত হয়, কারণ। সে তার মালিকপত্নীর রাগের কথা জানত। পুতুলটার প্রতি তার আসক্তি এমনই প্রবল ছিল যে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে সে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, আমি কি সত্যি সত্যিই এটা নিতে পারি?
