মাদাম থেনার্দিয়ের গর্জন করে উঠল, হ্যাঁ, ঈশ্বরের নামে বলছি, খেলা করতে পার।
কসেত্তে বলল, ধন্যবাদ মাদাম।
কিন্তু আসলে সে ধন্যবাদ দিতে চাইছিল সেই নবাগত লোকটিকে যার দয়ার অন্ত নেই। তার সমস্ত অন্তর তার প্রতি কৃতজ্ঞতার আবেগে ফেটে পড়ছিল।
থেনার্দিয়ের তার চেয়ারে গিয়ে বসল। মাদাম থেনার্দিয়ের তার কানে কানে বলল, লোকটা কে?
থেনার্দিয়ের জোর গলায় বলল, আমি অনেক লক্ষপতিকে চিনি যারা ওই ধরনের ছেঁড়া কোট পরে থাকে।
কসেত্তে উলোনার কাজটা বন্ধ করলেও সেই জায়গাটা ছাড়েনি। তার কাছে যে একটা বাক্স ছিল সেটা খুলে কিছু টুকরো কাপড় আর সিসের ছোট্ট ছুরিটা বার করল।
এপোনিনে আর অ্যাজেলমা তখন তাদের খেলা নিয়ে এমন ব্যস্ত ছিল যে তারা ঘরের মধ্যে কী হচ্ছিল তা মোটেই দেখেনি। বড় বোন এপোনিনে তখন পুতুলটাকে পোশাক পরিয়ে সাজাচ্ছিল এবং তার বোনকে কী সব বোঝাচ্ছিল। শিশুদের কণ্ঠস্বর ও ভাষার মধ্যে প্রজাপতির রঙিন পাখনার সৌন্দর্যের মতো এমন এক পলায়মান সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য থাকে যা আমাদের মুগ্ধ করে, কিন্তু তাকে আমরা ধরতে পারি না।
এপোনিনে বলছিল, এটা অন্য সব পুতুলের মতো নয়, কারণ এটা হাঁটতে পারে এবং তখন কাঁচ ক্যাচ শব্দ হয়। ওটাকে আমি সাজাচ্ছি। এর একটা মোচ আর একটা লেজ করে দেব। তুই তখন তাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে বলবি, হা ভগবান! আমি তখন বলব, এটা আমার মেয়ে মাদাম এবং এইভাবেই এর জন্ম হয়। আজকালকার সব মেয়েই এই রকম।
অ্যাজেলমা বিস্ময়ে অবাক হয়ে শুনছিল।
এতক্ষণ ধরে যারা মদ খাচ্ছিল তারা এবার গান গাইতে শুরু করল।
থেনার্দিয়ের চিৎকার ও হাততালি দিয়ে তাদের উৎসাহ দিতে লাগল।
পাখিরা খড়কুটো বা কোনও জিনিস পেলেই যেমন বাসা তৈরি করতে শুরু করে তেমনি শিশুরা পুতুল হাতে পেলেই নানাভাবে খেলা করতে থাকে। এপোনিনে আর অ্যাজেলমা যখন তাদের পুতুলটাকে সাজাতে লাগল কসেত্তে তখন তার সেই সিসের ছুরিটাকে সাজাতে লাগল। তার পর শুইয়ে ঘুমপাড়ানি গান গাইতে লাগল।
শিশু-মেয়েদের কাছে পুতুল যেন অত্যাবশ্যক একটা বস্তু। এ বস্তুর প্রতি তাদের যেন একটা সহজাত আসক্তি আছে। পুতুলের প্রতি তাদের স্নেহ ও ভালোবাসার শেষ নেই। তাকে সাজানো, খাওয়ানো, তাকে উপদেশ দেওয়া, তিরস্কার করা, বিছানায় শোয়ানো, গান গেয়ে ঘুম পাড়ানো প্রভৃতি সব কিছু পরম নিষ্ঠার সঙ্গে করে তারা পুতুলটা যেন এক জীবন্ত শিশু। তাদের সমস্ত ভবিষ্যৎ যেন এর মধ্যে ছোট আকারে বিরাজ করে। এইভাবে শিশুরা পুতুলদের লালন-পালন করতে করতে শৈশব থেকে বাল্যে পদার্পণ করে, বালিকা থেকে পরে নারীত্ব লাভ করে। নারীত্ব লাভ করার পর তারা স্ত্রী হয় এবং তাদের প্রথম সন্তান যেন তাদের শেষ পুতুলের অধিকারী। কোনও ছোট মেয়ে পুতুল থেকে বঞ্চিত হলে সন্তানহীনা নারীর মতো এক অস্বাভাবিক ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে। তাই কসেত্তে পুতুল না পেয়ে একটা ছুরিকে পুতুলের মতো করে সাজায়।
মাদাম থেনার্দিয়ের এবার হলুদ কোটপরা নবাগতের দিকে মন দিল। সে তার কাছে ফিরে গেল। সে ভাবল তার স্বামীর কথাই হয়তো ঠিক। হয়তো লোকটা ধনী হতেও পারে। ধনীদের অদ্ভুত অনেক খেয়াল থাকে।
সে নরম সুরে বলল, দেখুন মঁসিয়ে–
এই সম্মানজনক সম্বোধনে নবাগত আশ্চর্য হয়ে মুখ তুলে তাকাল। এর আগে সে তাকে এভাবে মঁসিয়ে বলে সম্বোধন করেনি।
টেবিলের উপর কনুই দুটো রেখে বসল মাদাম থেনার্দিয়ের। সে বলল, দেখুন মঁসিয়ে, আপনার উদারতা দেখে মেয়েটাকে একবার খেতে দিতে আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে তো কাজ করতে হবে। কারণ তার কেউ নেই।
নবাগত বলল, ও আপনার মেয়ে নয়?
না না, একেবারে নিঃস্ব, আমরা দয়া করে রেখেছি ওকে এবং রেখে ভুল করেছি। আপনি ওর মাথার আকারটা একবার দেখুন। ওরা চেহারাটাও বাড়ছে না। আমরা ওর জন্য অনেক কিছু করি। কিন্তু আমার তো আর ধনী নই। আমরা ওর মাকে চিঠি লিখি, কিন্তু ছয় মাস ধরে কোনও উত্তর পাইনি। মনে হয়, ওর মা মারা গেছে।
নবাগত বলল, হয়তো তাই। এই বলে সে ভাবতে লাগল। মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, ওর মা থাকলেও অবশ্য কোনও লাভ ছিল না। সে তার মেয়েকে পরিত্যাগ করে।
কসেত্তে’র চোখের দৃষ্টি তার মালিকপত্নীর ওপর নিবদ্ধ ছিল। তার সহজাত প্রবৃত্তি তাকে এই হিসেবে সতর্ক করে দেয় মাদাম থেনার্দিয়ের আর নবাগতের মধ্যে যে সব কথাবার্তা হচ্ছে সে-ই তার বিষয়বস্তু। যাই হোক, কসেত্তে’র উদ্বেগের অবসান হল যখন মাদাম থেনার্দিয়ের নবাগতকে কিছু খাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগল।
সে নবাগতকে বলল, আপনি কী খাবেন মঁসিয়ে?
নবাগত বলল, রুটি আর মাখন।
মাদাম থেনার্দিয়ের তা শুনে ভাবল, লোকটা তা হলে সত্যিই গরিব।
যারা গান গাইছিল তারা মাঝখানে কিছুক্ষণ থামার পর আবার নতুন উদ্যমে গান শুরু করল। তাদের গানের বিষয়বস্তু ছিল কুমারী মেরি আর শিশু যিশু। মাদাম থেনার্দিয়ের নবাগতকে রুটি আর মাখন এনে দিয়ে গান শুনতে গেল। সে-ও তাদের হাসি আর হৈ-হুল্লোড়ে যোগদান করল। কসেত্তে তার নকল পুতুলটাকে নিয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে আমার মা মরে গেছে, এই কথাটা বারবার গানের সুরে গাইছিল।
সহসা তার গানটা থেমে গেল। থেনার্দিয়েরদের মেয়েরা তাদের পুতুলটাকে মেঝের উপর ফেলে রেখে বিড়ালছানা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাত্র দু-এক গজ দূরে পড়ে আছে পুতুলটা। তার নকল পুতুলটা নামিয়ে রেখে ঘরের চারদিকে তাকাতে লাগল সে। দেখল মাদাম থেনার্দিয়ের নিচু গলায় তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলছে। হোটেলের বাসিন্দারা মদপান করছে আর গান গাইছে। এপোনিনে ও অ্যাজেলমা দু জনেই বিড়ালছানা নিয়ে খেলা করছে। কেউ তাকে দেখছে না। চারদিকে একবার সতর্ক দৃষ্টি ছড়িয়ে সে হাতে-পায়ে হেঁটে এসে পুতুলটাকে তুলে নিয়েই টেবিলের তলায় সেইখানে ঢুকে পড়ল। কিন্তু আগুনের দিকে পেছন ফিরে এমনভাবে বসে রইল সে যাতে পুতুলটা তার হাতে থাকলেও তা দেখা যায় না। সত্যিকারের একটা পুতুল পাওয়া তার কাছে ভাগ্যের কথা এবং আনন্দে আত্মহারা হবার কথা। একমাত্র নবাগত এ ব্যাপারে কিছুটা দেখেছিল।
