কসেত্তে ঘরের কোণে লুকোবার চেষ্টা করছে। পকেটের ভেতর হাত দুটো ঢুকিয়ে তা বাঁচাবার চেষ্টা করছিল। বেতটা হাতে নিয়ে মাদাম থেনার্দিয়ের হাত তুলঁল কসেত্তেকে মারার জন্য।
নবাগত লোকটি বলল, মাপ করবেন মাদাম, কিছুক্ষণ আগে আমি দেখলাম ঘরের মেঝের উপর একটা মুদ্রা গড়িয়ে পড়ল। মনে হয় মেয়েটির পকেট থেকেই এটা পড়েছে। দেখি, সেটা খুঁজে দিচ্ছি।
এই বলে সে নত হয়ে খোঁজার ভান করে একটা মুদ্রা মাদাম থেনার্দিয়েরের হাতে দিল।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, হ্যাঁ, এইটাই।
অথচ আসলে সেটা নয়, কারণ সেটা কুড়ি স্যু’র মুদ্রা। হারানো মুদ্রাটা ছিল পনেরো স্যু’র। মুদ্রাটা পকেটে ভরে রেখে মাদাম থেনার্দিয়ের কসেত্তে’র পানে একবার তাকিয়ে বলল, আর যেন কখনও এমন না হয়।
কসেত্তে তার বড় বড় চোখ দুটো তুলে অচেনা লোকটির পানে তাকাল। তার সে চোখের দৃষ্টিতে এক সরল নির্দোষ বিস্ময়ের সঙ্গে এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়ের একটা ভাব ছিল।
মাদাম থেনার্দিয়ের এবার নবাগতকে বলল, আপনাকে কি রাতের খাবার দেওয়া হবে? লোকটি চিন্তায় মগ্ন হয়ে ছিল বলে কথাটার উত্তর দিল না। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল মাদাম থেনার্দিয়ের, কে এই শয়তান লোকটা? রাতের খাবার কেনার মতোও কি পয়সা নেই? ও এত গরিব? সে কি ঘরভাড়া দিতে পারবে? তবু ভালো যে পয়সাটা ঘরের মেঝের উপর দেখতে পেয়েও চুরি করেনি।
এমন সময় ঘরের দরজা খুলে এপোনিনে আর অ্যাজেলমা এসে ঘরে ঢুকল।
মেয়ে দুটি দেখতে বেশ সুন্দর। তাদের মধ্যে শহুরে ভাবটাই বেশি। একজনের চুল বাদামি আর চকচকে, আর একজনের চুলগুলো কালো আর পিঠের উপর। ছড়ানো। দু জনকেই বেশ গোলগাল আর প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। তারা দু জনেই বেশ গরম আর ঝকঝকে পরিষ্কার পোশাক পরেছিল। তাদের চোখের চাউনি, মুখের ভাব, তাদের চঞ্চলতা, গোলমাল সবকিছুর মধ্যে এক সবুজ আনন্দ ঝরে পড়ছিল। তাদের দেখে তাদের মা এক কপট তিরস্কার আর প্রভূত আদরের সুরে বলল, এবার তা হলে এলে!
মাদাম থেনার্দিয়ের তার মেয়েদের কোলের উপর বসিয়ে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, বলল, কী নোংরা তোরা!
মেয়েরা মা’র কোল থেকে নেমে ছুটে ঘরের কোণে গিয়ে একটা পুতুল নিয়ে খেলা করতে লাগল। পুতুলটাতে তাদের দু জনেরই সমান ভাগ ছিল। টেবিলের তলা থেকে কসেত্তেও পুতুলটার পানে লুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
এপোনিনে আর অ্যাজেলমা কসেত্তে’র পানে কোনও নজর দিল না। তার প্রতি তাদের কোনও আগ্রহ নেই। তাদের কাছে ও একটা কুকুর ছাড়া আর কিছুই নয়। একদিকে কসেত্তে আর একদিকে এপোনিনে ও অ্যাজেলমা এই তিনটি মেয়ে মানবসমাজের দুটি দিকের যেন মূর্ত প্রতীক, সমাজের নিদারুণ নিষ্করণ অবহেলা, অবজ্ঞা আর ঔদাসীন্য যেন স্তূপীকৃত হয়ে উঠেছে কসেত্তের ওপর। দুই বোনে যে পুতুলটি নিয়ে খেলা করছিল সেটি পুরনো। তবু কসেত্তে’র কাছে সেটা এক আশ্চর্যের বস্তু, কারণ তার নিজের কোনও পুতুল ছিল না।
হঠাৎ কসেত্তে’র ওপর মাদাম থেনার্দিয়েরের চোখ পড়ল। সে দেখল কসেত্তে চুপচাপ বসে তার মেয়েদের খেলা দেখছে। সে বলে উঠল, তোমার কাজে মন দাও। তোমাকে বেত না মারলে কি তুমি কাজ করবে না?
চেয়ার ছেড়ে না উঠেই নবাগত বলল, ওর ওপর খুব বেশি কঠোর হবেন না মাদাম। কিছুক্ষণের জন্য ওকে খেলতে দিন।
হোটেলের যেসব সংগতিপসম্পন্ন বাসিন্দারা মাংসের প্লেট আর বোতলের পর বোতল মদ খেয়ে যায় তাদের মধ্যে কেউ একথা বললে মাদাম থেনার্দিয়ের তা শুনত। নিঃস্ব গরিবদের মতো এই ধরনের কোট আর টুপিপরা একটা লোকের মুখ থেকে বলা এ কথাটা সহ্য করতে পারল না সে।
মাদাম থেনার্দিয়ের তার কড়াভাবে প্রত্যুত্তর করল, মেয়েটি খায়। খায় যখন, তখন তাকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। তাকে তো বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারি না।
শান্ত কণ্ঠে নবাগত আবার প্রশ্ন করল, আসলে কী সে বুনছে?
তার গলার স্বর এবং কথা বলার ভঙ্গিমাটা তার ভিক্ষুকসুলভ বেশভূষার সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, মোজা। আমার মেয়েদের জন্য মোজা বুনছে ও। তাদের মোজা নেই। শিগগির এটা তৈরি না হলে ওদের খালি পায়ে চলতে হবে।
নবাগত কসেত্তে’র অনাবৃত লাল পা দুটোর পানে তাকাল। সে বলল, মোজা বোনার কাজ শেষ হতে কতদিন লাগবে?
মেয়েটা কুঁড়ে বলে তিন-চার দিন লাগবে।
মোজাগুলো বোনা শেষ হলে তার দাম কত হবে?
মাদাম থেনার্দিয়ের লোকটির পানে বিরক্তির সঙ্গে তাকিয়ে বলল, অন্তত তিরিশ স্যু।
পাঁচ ফ্রাঁ নিয়ে মোজাগুলো আমায় বিক্রি করবেন?
হোটেলের এক বাসিন্দা কথাটা শুনে লাফিয়ে উঠল। আশ্চর্য হয়ে বলল, পাঁচ ফ্রা! একজোড়া মোজার দাম পাঁচ ফ্রাঁ!
থেনার্দিয়ের নিজেও এবার এদিকে নজর দিল। সে বলল, মঁসিয়ে হয়তো ঠাট্টা করে বললেন পাঁচ ফ্রাঁ দিয়ে মোজাগুলো কিনবেন।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, তা হলে নগদ টাকা দিন।
নবাগত তার পকেট থেকে পাঁচ ফ্ৰাঁ বার করে টেবিলের উপর রেখে বলল, আমি ওগুলো কিনবই। এই নিন টাকা।
এবার সে কসেত্তে’র পানে তাকিয়ে বলল, তুমি এখন আমার কাজ করছ মেয়ে। আমি বলছি এখন তুমি যাও, খেলগে এবং বিশ্রাম নাওগে।
হোটেলের সেই বাসিন্দা ব্যাপারটা দেখে এতদূর আশ্চর্য হয়ে পড়েছিল যে উঠে এসে পাঁচ ফ্রা’র মুদ্রাটা আসল কি না নেড়ে-চেড়ে দেখতে লাগল। পরে বলল, হ্যাঁ, এটা আসল। এরপর থেনার্দিয়ের উঠে এসে মুদ্রাটা পকেটে ভরে নিল। মাদাম থেনার্দিয়ের হতবাক হয়ে ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে দাঁড়িয়ে রইল। কসেতে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, মাদাম, আমি তা হলে খেলা করতে যেতে পারি?
