দরজার কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। মাদাম থেনার্দিয়ের একটা বাতি হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। কসেত্তেকে দেখেই সে বলল, তা হলে এতক্ষণে তুমি এলে অপদার্থ কোথাকার? কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
ভয়ে কাঁপছিল কসেত্তে। সে বলল, মাদাম, এই ভদ্রলোক থাকবে এখানে। একটা ঘর চায়।
হোটেলমালিকদের মতো স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মাদাম থেনার্দিয়ের অতিথির পানে তাকিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। সে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল অতিথিকে। পরে বলল, এই ভদ্রলোক?
লোকটি তার মাথার টুপিতে একটা হাত রেখে বলল, হ্যাঁ মাদাম।
সঙ্গতিসম্পন্ন পথিকরা সাধারণত এত ভদ্র ও মোলায়েম হয় না। লোকটি ভাবভঙ্গি আর পোশাক-আশাক ও পুঁটলি দেখার সঙ্গে সঙ্গে মাদাম থেনার্দিয়েরের মুখ থেকে সব হাসি মিলিয়ে গেল। সে নীরসভাবে পথিককে বলল, ভেতরে আসুন।
লোকটি ভেতরে গেলে মাদাম থেনার্দিয়ের আবার তাকে খুঁটিয়ে দেখল। তার কোট, টুপি, তার পুঁটলি প্রভৃতি দেখে সে তার স্বামীর পানে তাকাল। তাকে খরিদ্দার হিসেবে নেওয়া যাবে কি না, তার জন্য জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকাল। থেনার্দিয়ের তখন হোটেলের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছিল, সে-ও নবাগত পথিককে ভালো করে দেখে ঠোঁট কামড়ে বলল, না, নেওয়া চলবে না।
মাদাম থেনার্দিয়ের তখন বলল, আমি দুঃখিত। হোটেলের সব ঘর ভর্তি।
লোকটি বলল, যেখানে তোক আমাকে একটু থাকতে জায়গা দিতে পারেন? আমি তার জন্য একটা ঘরের যা ভাড়া তা দেব।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, একটা ঘরের ভাড়া চল্লিশ স্যু।
ঠিক আছে, চল্লিশ সু-ই দেব।
মাদাম থেনার্দিয়ের তখন বলল, আচ্ছা, দেখি কী করতে পারি।
একজন খরিদ্দার বলল, একটা ঘরের ভাড়া তো কুড়ি স্যু।
মাদাম থেনার্দিয়ের চাপা গলায় বলল, ওই ধরনের লোকের জন্য চল্লিশ।
থেনার্দিয়ের বলল, হ্যাঁ ঠিক তাই। বাজে লোক রেখে হোটেলের কোনও লাভ হয় না।
লোকটি ততক্ষণে একটা বেঞ্চের উপর তার পুঁটলি আর লাঠিটা রেখে টেবিলের ধারে একটা চেয়ারে বসল।
কসেত্তে তাড়াতাড়ি এক বোতল মদ আর একটা গ্লাস এনে তার সামনে রাখল। হোটলের যে খরিদ্দার তার ঘোড়ার জন্য জল চেয়েছিল সে তার ঘোড়ার কাছে গেল। কসেত্তে সেই টেবিলের তলায় গিয়ে উল বুনতে লাগল। লোকটি মদপান করার পর আগ্রহ সহকারে কসেত্তে কী করে না-করে দেখতে লাগল।
কসেত্তে খুব সাদাসিধে পোশাক পরে সব সময় বিষাদগ্রস্ত হয়ে থাকে। সে যদি সুখে-শান্তিতে থাকত তা হলে তাকে সুন্দরী দেখাত। তার চেহারাটা এত রোগা এবং ম্লান যে তার বয়স আট হলেও ছ’-এর বেশি মনে হয় না। তার বড় বড় চোখ দুটো ক্রমাগত জল ফেলে ফেলে সব উজ্জ্বলতা হারিয়ে কালো হয়ে গেছে। ক্রমাগত দুঃখকষ্ট ভোগ করে করে তার ঠোঁট দুটো কোনও দুরারোগ্য রোগে ভুগতে থাকা মানুষের মতো শুকনো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তারা রোগা-রোগা হাত দুটোতে কালি পড়ে গেছে। সে সব সময় শীতে কাঁপতে থাকা হাঁটু দুটো জড়ো করে থাকত। আর পোশাক বলতে কতকগুলি সুতির ছেঁড়া জামা ছিল, তাতে কোনও পশম ছিল না। তার ছেঁড়া জামার ফাঁকে ফাঁকে তার গায়ের কিছু কিছু অংশ দেখা যায় এবং কিছু ক্ষতচিহ্নও দেখা যায়। তার পাগুলো খসখসে আর নীল। তাতে কোনও মোজা বা জুতো নেই। তার ঘাড়ের কাছটা কাঁপা কাঁপা ভাব, তার সদাসংকুচিত চেহারা, তার কুণ্ঠিত কথাবার্তা, তার নীরবতা ও তার প্রতিটি গতিভঙ্গিতে একটা ভয়ের আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এক দারুণ ভয় কসেত্তে’র দেহমন দুটোকেই যেন গ্রাস করেছিল। সে যেন ভালো করে হাঁপ ছাড়তে পারত না, ভালো করে নিশ্বাস নিতে পারত না। তার চোখের কোণে কোণে ভয়ের ছায়া মূর্ত হয়ে উঠেছিল। তার মুখখানা দেখে তাকে বোকা-বোকা দেখাত। তাকে কেউ কখনও প্রার্থনা করতে শেখায়নি। সে কখনও কোনও চার্চে দেয়নি। চার্চে যাবার কথা বললে মাদাম থেনার্দিয়ের বলত, সময় কোথায়?
হলুদ কোট পরা নবাগত লোকটি কসেত্তেকে খুঁটিয়ে দেখছিল। এমন সময় মাদাম থেনার্দিয়ের চেঁচিয়ে বলল, এতক্ষণে মনে পড়েছে, পাউরুটি কোথায়?
গিন্নির গলার আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি টেবিলের তলা থেকে বেরিয়ে এল কসেত্তে। সে পাউরুটির কথাটা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু শাস্তির ভয়ে সব ছেলেমেয়েই যেমন মিথ্যা কথা বলে তেমনি কসেত্তেও মিথ্যা কথা বলল। সে বলল, রুটির দোকান বন্ধ ছিল মাদাম।
কসেত্তে বলল, আমি তাকে ডেকেছিলাম। কিন্তু দোকান খুলল না।
ঠিক আছে, কাল আমি দেখব তাকে জিজ্ঞাসা করে তোমার কথা সত্যি কি না। সত্যি হলে মজা দেখবে। যাই হোক, পনেরো স্যু’র মুদ্রাটা আমাকে দাও।
কসেত্তে তার জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখল মুদ্রাটা নেই। পয়সাটা কোথায় গেল সে বিষয়ে তার কোনও খেয়াল ছিল না। সে কোনও কথা না বলে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মাদাম থেনার্দিয়ের আবার বলল, কী, কথা কানে যাচ্ছে না? আমি দাঁড়িয়ে আছি।
কসেত্তে আবার একবার তার পকেট হাতড়াল। কিন্তু সেটা পেল না।
মাদাম থেনার্দিয়ের এবার গর্জন করে উঠল, তুই-ই হারিয়েছিস অথবা চুরি করেছিস।
এই বলে দেয়ালে ঝোলানো বেতটা নেবার জন্য এগিয়ে গেল সে।
কসেত্তে তা দেখে ক্ষমা প্রার্থনা করল। বলল, দয়া করুন মাদাম। দয়া করুন।
যখন এই সব চলছিল তখন হলুদ কোটধারী লোকটি তার পকেট হাতড়ে দেখছিল, আনমনে কী দেখতে লাগল। হোটেলের অন্য বাসিন্দারা মদ খেয়ে তাস খেলছিল আবার কেউ কেউ গল্পগুজব করছিল। তারা এ সব কিছু দেখছিল না।
