বনের মধ্যে গিয়ে সে তার চলার গতিটা কমিয়ে দিল। মনে হল গাছপালার মধ্য দিয়ে সে একটা চেনা পথ খুঁজছে। এবার মনে হল সে যেন পথটা হারিয়ে ফেলেছে। অবশেষে কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর সে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়ল। সেখানে কতকগুলি সাদা পাথর জড়ো করা ছিল। সেখানে অন্ধকারে সেদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ধরে কী ভাবল। কয়েক হাত দূরে একটা বড় গাছ ছিল। গাছটা লতায় জড়ানো ছিল। সে ঝুঁকে পড়ে সেই লতার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে কী গুনতে লাগল। কাছেই একটা বাদামগাছ ছিল। সেই বাদামগাছ আর পাথরখণ্ডগুলোর মাঝখানের মাটিটা সম্প্রতি খোঁড়া হয়েছে কি না, তা দেখতে লাগল। তার পর সে বনের মধ্যে চলে গেল।
এই লোকটির সঙ্গে বনের প্রান্তে দেখা হয়ে যায় কসেত্তে’র।
বনের মধ্যে দিয়ে মঁতফারমেলের পথে যেতে যেতে সে দেখে তার সামনে অদূরে একটি ছায়ামূর্তি একটা ভারী বোঝার সঙ্গে যেন লড়াই করছে। বোঝাটা বইতে তার কষ্ট হচ্ছিল বলে সে বারবার নামাচ্ছিল সেটা। কাছে গিয়ে সে দেখল ছায়ামূর্তি একটি ছোট মেয়ে। তার হাতে একটা বড় জলভরা বালতি ছিল। লোকটি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নীরবে সেই বালতিটা নিজের হাতে তুলে নিল।
.
৭.
কসেত্তে কোনও ভয় পেল না।
লোকটি চাপা অথচ গম্ভীর গলায় বলল, শোন মেয়ে, এত ভারী জিনিসটা বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় তোমার পক্ষে।
কসেত্তে বলল, হ্যাঁ, মঁসিয়ে।
আমাকে দাও, আমি নিয়ে যাচ্ছি।
কসেত্তে তাই করল, তারা দু জনে পাশাপাশি পথ চলতে লাগল।
লোকটি বলল, সত্যিই এটা খুবই ভারী। তোমার বয়স কত?
আমার বয়স আট মঁসিয়ে।
কতদূর থেকে এটা বয়ে নিয়ে আসছ?
ঝরনা থেকে এখন পর্যন্ত।
কত দূর যেতে হবে তোমাকে?
এখান থেকে পনেরো মিনিটের পথ।
লোকটি কিছুক্ষণ কী ভাবার পর বলল, তোমার মা নেই?
কসেত্তে বলল, আমি জানি না। অন্য সব ছেলেমেয়ের মা আছে, আমার মা নেই। হয়তো কখনও ছিল না।
লোকটি হঠাৎ থেমে গেল। বালতিটা নামিয়ে রেখে সে কসেত্তে’র কাঁধের উপর হাত রেখে তার চেহারাটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। তার শীর্ণ ম্লান মুখখানার কিছুটা দেখতে পেল।
অবশেষে সে বলল, তোমার নাম কী?
কসেত্তে।
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে চমকে উঠল লোকটি। কিছুক্ষণ কসেত্তে’র মুখপানে তাকিয়ে রইল। তার পর তার কাঁধ থেকে হাত দুটো সরিয়ে নিয়ে বালতিটা তুলে নিয়ে পথ হাঁটতে লাগল আবার।
যেতে যেতে সে বলল, কোথায় থাক তুমি?
মঁতফারমেলে। তুমি জায়গাটা চেন কি?
আমরা কি সেখানেই যাচ্ছি?
হ্যাঁ মঁসিয়ে।
কিছুক্ষণ দু জনেই চুপ করে রইল। পরে লোকটি বলল, কিন্তু এত রাতে কে তোমাকে জল আনতে পাঠিয়েছে?
মাদাম থেনার্দিয়ের।
কাঁপা কাঁপা গলায় লোকটি বলল, সে কী করে?
সে আমার মালিকপত্নী। সে একটা হোটেল চালায়।
হোটেল? আমি তো আজ রাতে সেখানেই থাকব। আমাকে পথটা দেখিয়ে দেবে? কসেত্তে বলল, আমিও তো সেখানেই যাচ্ছি।
লোকটি বালতিটা নিয়ে বেশ তাড়াতাড়ি পথ হাঁটছিল। কিন্তু হাতে বোঝা না থাকায় কসেত্তে তার সঙ্গে সমানে হেঁটে চলেছিল। তার আর ক্লান্তিবোধ হচ্ছিল না। মাঝে মাঝে এক আশ্চর্য বিশ্বাস আর আশ্বাসের সঙ্গে লোকটির মুখপানে তাকাচ্ছিল। কেউ তাকে কখনও ঈশ্বরের কথা বলেনি, তাকে কখনও প্রার্থনা করতে শেখায়নি। কিন্তু সেই মুহূর্তে এক অদ্ভুত আশা আর সুখের অনুভূতি তাকে ঈশ্বরের কথা ভাবিয়ে তুলঁল।
মিনিটকতক পরে লোকটি বলল, মাদাম থেনার্দিয়েরের কোনও চাকর নেই?
না মঁসিয়ে।
তুমি তা হলে একাই সব কাজ করো?
হ্যাঁ। তবে তার দুটো মেয়ে আছে।
কী নাম তাদের? কত বড়?
তাদের নাম এপোনিনে আর অ্যাজেলমা। তারা দু জনেই ছোট।
তারা কী করে?
তাদের অনেক পুতুল আর পয়সা রাখার বাক্স আছে। তারা অনেক কিছু কিনতে পারে এবং ইচ্ছামতো খেলা করতে পারে।
সারাদিন?
হ্যাঁ।
আর তুমি কী করো?
আমি কাজ করি।
সারাদিন?
হ্যাঁ, সারাদিন।
জলভরা চোখ তুলে কসেত্তে তাকাল লোকটির পানে। কিন্তু অন্ধকারে সে জল দেখা গেল না।
কসেত্তে আবার বলল, হ্যাঁ, মঁসিয়ে। তবে সব কাজ শেষ করে তারা বললে অল্প কিছুক্ষণ আমি খেলা করি।
কী খেলা করো তুমি?
যা হোক কিছু। আমার কোনও খেলনা নেই। এপোনিনে আর অ্যাজেলমা তাদের পুতুল নিয়ে আমার সঙ্গে খেলে না। আমি একাই খেলি। আমার একটা ছোট ভোঁতা ছুরি আছে।
কিন্তু সেটা দিয়ে কিছু কাটা যায় না।
হ্যাঁ যায়। লেটুসপাতা আর মাছিদের মাথা।
এবার ওরা গাঁয়ের মধ্যে এসে পড়ল। কসেত্তে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। লোকটি চুপ করে ছিল। কিন্তু চার্চের কাছে আলো ঝলমল সারবন্দি দোকানগুলো দেখে বলল, এখানে কি কোনও খেলা হচ্ছে?
না, খ্রিস্টের জন্মদিনের জন্য উৎসব চলছে।
হোটেলের কাছটায় এসে কসেত্তে লোকটির গাঁয়ে হাত দিয়ে বলল, দয়া করে শোন মঁসিয়ে।
লোকটি বলল, আমরা তো এসে গেছি।
হ্যাঁ। এবার বালতিটা দয়া করে দাও আমার হাতে।
কিন্তু কেন?
কেউ বালতিটা বয়ে এনেছে দেখলে ওরা আমাকে মারবে।
লোকটি বালতিটা কসেত্তে’র হাতে দিয়ে দিল। এরপর ওরা দু জনেই হোটেলের মধ্যে ঢুকল।
.
৮.
হোটেলের দরজার সামনে আসার সময় রাস্তার ওপারে সেই দোকানটায় সাজানো বড় পুতুলটাকে একবার দেখতে ভোলেনি কসেত্তে। কিন্তু তার পনেরো স্যু’র কথাটা ভুলে গিয়েছিল। সেটা কখন পড়ে গেছে সে বিষয়ে কোনও খেয়াল নেই তার। রুটির দোকান থেকে পাউরুটি কেনাও হয়নি।
