বিশেষ করে শীতকালে ওই এলাকার পথ দিয়ে বেশি লোক চলাচল করে না। লোকটিও মানুষদের এড়িয়ে যেতে চাইছিল যদিও তার এই মনোভাবটা সে প্রকাশ করতে চাইছিল না।
সেকালে রাজা অষ্টাদশ লুই রোজ ওই পথ দিয়ে গাড়িতে করে একবার করে বেড়াতে যেতেন। ও অঞ্চলটা তার প্রিয় জায়গা ছিল। রোজ বেলা ঠিক দুটোর সময় বুলভার্দ দ্য হোপিতাল এলাকার পথে রাজার গাড়িটাকে তাঁর অনুচরবৃন্দসহ দেখা যেত। গাড়িটা নিয়মিত ঠিক বাধা সময়ের মধ্যে যেত বলে স্থানীয় লোকেরা গাড়িটা দেখেই বলে দিত দুটো বাজে; রাজা তুলিয়েরে ফিরে যাচ্ছেন।
অনেকে রাজাকে দেখার জন্য রাস্তার ধারে ছুটে যেত। অনেকে আবার রাস্তার ধারে সারবন্দিভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। মোট কথা, রাজার যাওয়া-আসায় স্থানীয় জনগণ বেশ আগ্রহ দেখাত। রাজা দুর্বল এবং নিজে হাঁটতে পারতেন না বলে গাড়িটাকে জোরে চালাতে বলতেন। হাঁটতে পারতেন না বলেই হয়তো ছুটতে চাইতেন। এ যেন চলৎশক্তিহীন পঙ্গুর বিদ্যুৎগতিতে চলার শখ। আকস্মিক কোনও গোলমালের সম্মুখীন হবার জন্য রাজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে অনুচর ও প্রহরীরা উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে থাকত। বিরাট গাড়িটার দ্রুতগতি চাকাগুলো পাথরে উপর ঘর্ষণ করতে করতে ছুটে যেত। এত জোরে যেত যে রাজার মুখটা শুধু একবার কোনওরকমে দেখা যেত। গাড়িটার ডান দিকের কোণে সাদা শাটিনের আসনের উপর বসে থাকা রাজার বড় গম্ভীর মুখখানা শুধু দেখা যেত। তাঁর চোখের দৃষ্টিটা ছিল গর্বিত ও তীক্ষ্ণ। তার বুর্জোয়া ফ্ৰককোটের উপর দুটো বড় পালক ছিল আর ছিল সোনালি পরশ। সেন্ট লুই-এর ক্রস, লিজিয়ন দ্য অনার হলি স্পিরিটের রুপোর মেডেল, এবং তার মোটা পেটটার উপর নীলরঙের একট চওড়া স্কার্ফ জড়ানো ছিল। প্যারিস শহরের বাইরে গেলেই তিনি তার সাদা পালকওয়ালা টুপিটা মাথা থেকে খুলে হাঁটুর উপর রেখে দিতেন। আবার শহরে ঢোকার সময় সেটা মাথায় পরতেন। এক হিমশীতল ঔদাসীন্যের সঙ্গে জনগণের পানে তাকাতেন তিনি এবং জনগণও অনুরূপ ঔদাসীন্য দেখিয়ে তার প্রতিদান দিত। একদিন সেন্ট মার্কো দিয়ে রাজা যখন গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন তখন দর্শকদের মধ্যে একজন মন্তব্য করে, তা হলে ওই মোটা লোকটাই হচ্ছে দেশের সরকার।
এ অঞ্চলের লোকদের কাছে রাজার এই সমালোচনার ব্যাপারটা এক সহজ সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনা। কিন্তু হলুদ কোটপরা লোকটি এ অঞ্চলের বাসিন্দা নয় বলে সে এ সবের কিছুই জানত না। যখন বেলা দুটোর সময় সালপেত্রিয়ের ঘুরে বুলভার্দ অঞ্চলে এসে পড়ল রাজার গাড়িটা তখন জমকালো পোশাকপরা রাজার প্রহরীদের দেখে লোকটি চমকে উঠল এবং কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়ল। ফুটপাথের উপর তখন সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। সে তাড়াতাড়ি একটা বাড়ির দরজার কাছে গিয়ে আশ্রয় নিল। কিন্তু রাজার গাড়ির মধ্যে থেকে প্রহরীদের প্রধান তাকে দেখে ফেলল এবং বলল, ওই কুৎসিত ভবঘুরেটা কে দেখ তো। সে কর্তব্যরত একজন পুলিশ অফিসারকে তার অনুসরণ করতে বলল। কিন্তু ভবঘুরে লোকটি পাশের একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়ায় পুলিশ অফিসার দেখতে পেল না তাকে। তখন গোধূলির ছায়া ঘন হয়ে উঠছিল।
ভবঘুরে লোকটি পেছন ফিরে যখন দেখল তাকে আর কেউ অনুসরণ করছে না তখন সে আবার তার চলার পথে ফিরে এল। তখন ফ্রাঁসোয়া চারটে বাজে এবং তখনি প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছিল। পোর্তে সেন্ট থিয়েটারে একটা নাটক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। থিয়েটারের বাইরে আলোকিত বিজ্ঞাপন দেখে সে একবার থমকে দাঁড়াল। তার পর একটা গলিপথ ধরে একটা হোটেলে চলে গেল। সেখান থেকে সাড়ে চারটের সময় একটা গাড়ি ছাড়বে। যাত্রীরা তখন গাড়িতে উঠছিল।
ভবঘুরে গারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করল, একটা আসন খালি আছে?
গারোয়ান বলল, আমার পাশেই একটা আসন আছে।
আমি ওটা নেব।
তা হলে উঠে পড়।
কিন্তু ভবঘুরের পোশাক-আশাক দেখে সে ভাড়াটা আগেই চাইল। সে বলল, তুমি কি সোজা ল্যাগনে যাবে।
ভবঘুরে বলল, হ্যাঁ।
এই বলে সে পুরো ভাড়াটা মিটিয়ে দিল।
অবশেষে গাড়িটা ছেড়ে দিল। গারোয়ান ভবঘুরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ভবঘুরে হা’, ‘না’, ছাড়া আর কিছুই বলছিল না। গারোয়ান ঘোড়া চালানোর কাজে মন দিল।
গাড়িটার স্তনে এবং নেলি সুর মার্নের মধ্য দিয়ে সন্ধে ছ’টার সময় শেলেসে পৌঁছল। এইখানে গাড়ি থামিয়ে ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হল। একটা হোটেলের সামনে গাড়িটা দাঁড়াল।
ভবঘুরে বলল, আমি এইখানে নেমে যাব।
এই বলে সে তার পুঁটলি আর লাঠিটা হাতে করে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। সে হোটেলে উঠল না।
কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর গাড়িটা আবার চলতে লাগল। কিন্তু ভবঘুরে আর এল না। তাকে বড় রাস্তার কোথাও দেখা গেল না। গারোয়ান গাড়ির যাত্রীদের বলল, লোকটাকে আমি চিনি না। ও এ অঞ্চলের লোক নয়। লোকটাকে দেখে মনে হয় একটা পয়সাও নেই, কিন্তু ওর কাছে টাকা আছে এবং ভাড়াটা আগেই দিয়ে দিল এককথায়। ল্যাগনের ভাড়া দেয়, কিন্তু শেলেসেই নেমে পড়ে। অন্ধকার রাত, সব বাড়ির দরজা বন্ধ, অথচ ও হোটেলেও ওঠেনি। লোকটা কোথায় গেল কে জানে?
লোকটা একটা অন্ধকার রাস্তা দিয়ে শহরের চার্চের কাছে গিয়ে মঁতফারমেলে যাবার জন্য একটা পথ ধরল। মনে হল সে এখানকার পথঘাট চেনে। সে খুব দ্রুত পথ হাঁটছিল। কার পায়ের শব্দ শুনে সে পেছন ফিরে তাকাল। খালের মধ্যে বসে পড়ল। তার পর পায়ের শব্দটা মিলিয়ে গেলে সে আবার বেরিয়ে এল। তার ভয়ের অবশ্য কিছু ছিল না, কারণ ডিসেম্বরের শীতের রাতের মেঘ আর আকাশ মাথায় করে কোনও লোক পথে বার হয় না কখনও। এইখান থেকেই পাহাড়ের ঢালটা শুরু। কিন্তু ভবঘুরে পথিক মঁতফারমেলের পথে না গিয়ে মাঠ পার হয়ে বনের মধ্যে গিয়ে ঢুকল।
