কী ঘটছে, কোথায় কী আছে তা জানতে পারল না কসেত্তে। প্রকৃতিজগতের বিশালতার মধ্যে সে যেন হারিয়ে গেল। ভয়ের থেকে বেশি ভয়ঙ্কর এক চেতনা আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে। সে কাঁপতে লাগল। সেই মুহূর্তে যে ভয়ে তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায় তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। তার কেবলি মনে হতে লাগল কাল হয়তো এই সময়ে আবার তাকে আসতে হবে এখানে।
মনের এই অবস্থাটা কাটাবার জন্য সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে এক, দুই করে দশ পর্যন্ত জোরে গুনতে লাগল। এইভাবে সে তার বর্তমান বাস্তব অবস্থাটার প্রতি সচেতন হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল যে হাত দুটো জলভরা বালতিটা ধরে আছে সে হাত দুটো ঠাণ্ডায় হিম হয়ে গেছে। সে উঠে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। এবার স্বাভাবিক এক ভয়ের তাড়নায় সে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন ও মাঠ পার হয়ে শহরে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল। বালতিটা নিয়ে যেতে কষ্ট হলেও তার মালিকপত্নীর ভয়ে সেটাকে সে ছেড়ে যেতে পারবে না। সে তাই জলভরা বালতিটা দু হাত দিয়ে তুলে নিয়ে যাবার জন্য পা বাড়াল।
কিন্তু বালতিটা এত ভারী যে সে কয়েক পা গিয়েই দাঁড়াল। হাঁটতে পারছিল না। বালতিটা নামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হাঁপ ছেড়ে আবার বালতি নিয়ে যেতে লাগল। বালতির ভারে সে কুঁজো হয়ে পথ হাঁটছিল। এবার সে অনেকটা গেল। বালতির ঠাণ্ডা হাতলটা তার হাতটাকে যেন কামড় দিচ্ছিল। কিন্তু একটানা সে বেশিদূর যেতে পারছিল না। মাঝে মাঝে থামতে হচ্ছিল তাকে। আর বালতিটা নামাতে হচ্ছিল। যতবার বালতিটা নামাচ্ছিল কিছুটা করে জল পড়ে যাচ্ছিল। কোনও এক শীতের রাতে লোকচক্ষুর অন্তরালে আট বছরের একটি শীতার্ত মেয়ের জীবনে এই সব ঘটেছিল। একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া এ ঘটনার আর কোনও সাক্ষী ছিল না। আর একজন সাক্ষী হয়তো ছিল–সে হল তার মা’র আত্মা। সংসারে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা হয়তো মৃতদেরও জাগিয়ে তোলে কবর থেকে।
সে হাঁপাচ্ছিল। চাপা গলায় ফুঁপিয়ে কাঁদছিল সে। মাদাম থেনার্দিয়েরকে সে এতখানি ভয় করত যে তার কাছ থেকে সে তখন অনেক দূরে থাকলেও জোরে কাঁদতে পারছিল না।
কোনওখানে আর বেশিক্ষণ দাঁড়াচ্ছিল না এবং যাওয়ায় জন্য যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি করছিল। তবু তার চলার গতিটা বাড়াতে পারছিল না। সে হিসাব করে দেখল এইভাবে সে যেতে থাকলে মাদাম থেনার্দিয়ের তাকে বাড়ি গেলেই মারবে। এই দুশ্চিন্তাটা রাত্রির অন্ধকার আর নির্জনতাজনিত মনঃকষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিল। তার সব শক্তি যেন ফুরিয়ে এসেছিল। আর সে ভারী বালতিটাকে বইতে পারছিল না। তবু সে তখনও বনটা পার হয়ে মাঠে পড়তে পারেনি। তার অতিপরিচিত একটা বাদামগাছের তলায় এসে আবার থামল সে। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করল। কিন্তু হতাশা আর দুঃসহ কষ্টের তীব্রতায় আপন মনে সে চিৎকার করে বলতে লাগল, হে ঈশ্বর, দয়া করে আমাকে সাহায্য কর।
সহসা সে দেখল কোথা হতে একটা লম্বা হাত এসে বালতিটা তুলে নিল। কসেত্তে অন্ধকারের মধ্যেই দেখতে পেল তার পাশে এক জীবন্ত মানুষের মূর্তি খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা তার পিছু পিছু নিঃশব্দে পদসঞ্চারে আসছিল এতক্ষণ। সে তা দেখতে পায়নি বা তার কোনও শব্দ শুনতে পায়নি। এবার সে তার পাশ থেকে কোনও কথা না বলে বালতিটা তুলে নিল।
অবস্থা যত ভয়ঙ্করই হোক, অনেক সময় একজন মানুষের প্রবৃত্তি অন্য কোনও মানুষের শুভেচ্ছার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারে না। কসেত্তে বয়সে ছোট হলেও অচেনা মানুষটিকে ভয় করল না তখন কিছুমাত্র।
.
৬.
১৮২৩ সালের সেই খ্রিস্টোৎসবের দিন প্যারিসের বুলভার্দ দ্য হেপিতাল নামে এক নির্জন এলাকায় কিছুক্ষণ ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একটা লোক। লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে একটা থাকার জায়গা খুঁজছে এবং ফবুর্গ সেন্ট মার্কোর প্রান্তভাগে ছোটখাটো একটা কুঁড়ে মতো ঘর চায়। পরে আমরা দেখতে পাব সে ওই অঞ্চলে একটা ঘর ভাড়া করে।
তার পোশাক-আশাক আর চেহারাটা দেখে মনে হচ্ছিল লোকটা এক সম্ভ্রান্ত ভিখারি। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে রুচিশীল পরিচ্ছন্নতাবোধের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিল তার মধ্যে। অভাব আর আত্মমর্যাদাবোধের এই মিশ্রণের জন্য এই ধরনের ভিখারিদের প্রতি মানুষের দ্বিগুণ শ্রদ্ধা জাগে। তার মাথায় ছিল একটা পুরনো লম্বা টুপি, মোটা হলদে সুতোয় বোনা একটা লম্বা কোট, যার পকেটগুলো ছিল চারকোনা বর্গক্ষেত্রের মতো এবং সে কোটটার দু-এক জায়গায় ছেঁড়া ছিল। তার পায়ে ছিল কালো পশমের মোেজা আর বিশ্রী ধরনের এক জুতো। বহিরাগত বাস্তুত্যাগী এই লোকটি হয়তো একদিন এক স্কুলমাস্টার ছিল এবং ভালো বংশের লোক। তার মাথার সাদা চুল, রেখাঙ্কিত কপাল, ম্লান বিস্ফারিত ঠোঁট, বার্ধক্যপীড়িত অবসন্ন মুখমণ্ডল থেকে বোঝা যায় তার বয়স ষাটের উপর। কিন্তু তার ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপ এবং চলার ভঙ্গিমা দেখে মনে হয় তার বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে না। তার কপালের রেখাগুলোকে কাছ থেকে খুঁটিয়ে দেখলে লোকটাকে শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা হবে। তার উপরকার ঠোঁটটার মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত ভাঁজ ছিল যা দেখে মনে হবে সে একই সঙ্গে কঠোর এবং নম্র প্রকৃতির। তার দৃষ্টির মধ্যে ছিল এক শান্ত বিষাদ। তার বাঁ হাতে ছিল কাপড়ে-বাঁধা একটা পুঁটলি আর ডান হাতে ছিল গাছের ডাল কেটে বানানো একটা লাঠি। লাঠিটার গাঁটগুলো ঘষে-মেজে পালিশ করা হয়েছে। তার মাথায় লাল মোম দিয়ে তৈরি গোলমতো একটা হাতল করা হয়েছিল। লাঠিটাতে ভয়ের কিছু নেই, সেটাকে বেড়াবার ছড়িও বলা যেতে পারে।
