এই ভেবে ফিরে যাবার জন্য গাঁয়ের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু কিছুটা যাওয়ার পর আবার থেমে দাঁড়াল। আবার মাথা চুলকাতে লাগল। এবার সে বাড়ির গিন্নির কথা ভাবতে লাগল। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পেল বিশালবপু সেই ভয়ঙ্কর মহিলার চোখ থেকে আগুন ঝরছে। তার চারদিকে হতাশভাবে একবার তাকাল সে। কিন্তু কী করবে? তার সামনে এক ভয়ঙ্কর মূর্তি আর তার পেছনে জমাট অন্ধকার আর বনভূমি। দুটোর মধ্যে মাদাম থেনার্দিয়ের সত্যিকারের বেশি ভয়ের বস্তু।
আবার সে ঝরনায় যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। এবার সে চোখ বন্ধ করে ঊধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল, কোনও শব্দ শুনল না। মাঝে মাঝে শুধু নিশ্বাস নেবার জন্য থামতে লাগল এবং আবার ছুটতে লাগল। অবশেষে সে বনের মধ্যে এসে পড়ল।
তার চারদিকের গাছগুলোর পাতা নড়ার সমবেত শব্দে দারুণ ভয় হচ্ছিল তার। তার চোখে জল এসে গিয়েছিল। সে যেমন ভালো করে কিছু দেখতে পারছিল না তেমনি সে কিছু ভাবতেও পারছিল না। তার মতো ছোট্ট একটি প্রাণীর ওপর চারদিক থেকে রাত্রির অনন্ত অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছিল।
বনের প্রান্ত থেকে ঝরনা কয়েক মিনিটের পথ। কসেত্তে সে পথ চেনে, কারণ দিনের বেলায় সে পথে যাওয়া-আসা করে। সুতরাং অভ্যাসবশে সে ঠিক পথেই চলতে লাগল। ভয়ে ডাইনে-বায়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে চলতে চলতে অবশেষে সে ঝরনার ধারে এসে পড়ল। সে ভাবছিল কোনও দিকে তাকালেই ভৌতিক কিছু না কিছু দেখতে পাবে।
ঝরনা মানে দু ফুট গভীর এক স্রোতোধারা, স্রোতের বেগে মাটি আর পাথরের মধ্যে পথ করে বয়ে চলেছে। তার দু পাশে শ্যাওলা আর আগাছা গজিয়ে উঠেছে। তার দু পাশের গাঁয়ে অনেক পাথরখণ্ড জমে আছে। ঝরনাটা কোনও শব্দ না করে শান্তভাবে বয়ে চলেছিল।
একবারও না থেমে অন্ধকারে কসেত্তে ছোট ওকগাছটার খোঁজ করতে লাগল। গাছটা ঝরনার ধার ঘেঁষে গজিয়ে উঠেছে। দিনের বেলায় কসেত্তে যখন বালতি করে ঝরনার উপর ঝুঁকে জল ভরে তখন হাত বাড়িয়ে ওকগাছের একটা ডাল ধরে থাকে। এবারও সে গাছটার ডাল ধরে জল ভরে বালতিটা ঘাসের উপর নামিয়ে রাখল। স্নায়ুবিক উদ্বেগের জন্য গায়ে যেন তার দ্বিগুণ শক্তি এসে গিয়েছিল। কিন্তু কোনও দিকে তার খেয়াল না থাকায় তার জামার পকেট থেকে পনেরো স্যু’র মুদ্রাটা পড়ে গেল জলের মধ্যে।
জল তোলার পর কসেত্তে দেখল সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অনেক চেষ্টা করে বালতিতে জল ভরতে গিয়ে তার হাত-পা যেন অবশ হয়ে যায়। সে এমনি ফিরে যেতে পারলে খুশি হত। কিন্তু তখন তার পথচলার শক্তি ছিল না। তাকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে। সে তাই ঘাসের উপর বসে পড়ল।
চোখ দুটো বন্ধ করে আবার সে চোখ খুলল, কেন তা সে জানে না। মনে হল কে যেন বাধ্য করছে তাকে চোখ খুলতে। আকাশটা ধোঁয়ার মতো কালো মেঘে ভরা ছিল। মনে হল অন্ধকার রাত্রি যেন কালো মেঘের মুখোশ পরে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আনমনে আকাশটার পানে তাকাতে দেখল দিগন্তে একটা নক্ষত্র রয়েছে। কিন্তু সে জানত না ওটা বৃহস্পতি গ্রহ। দিগন্তে ঘন কুয়াশার মাঝে কিসের একটা লাল আভা দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কার যেন বিশাল এক রক্তাক্ত ক্ষত।
বনভূমির উপর দিয়ে ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস বইছিল। গাছের কোনও পাতা নড়ছিল। কোথাও কোনও আলো দেখা যাচ্ছিল না। গ্রীষ্মকালে নৈশ বনভূমির অন্ধকারের মাঝে জোনাকির উড়ন্ত আলোর কিছু খেলা দেখা যায়। কিন্তু এখন সে আলোর কোনও খেলা দেখতে পাওয়া গেল না কোথাও। কসেত্তে’র মাথার উপর বড় বড় গাছের ডালগুলো এক অতিপ্রাকৃত ভয়াবহতায় বিরাট জন্তুর মতো হাত বাড়িয়ে যেন শিকার ধরার চেষ্টা করছে। বনভূমির লম্বা লম্বা ঘাসগুলো বাতাসে মাছের মতো কিলবিল করছিল। অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গাগুলোতে আকারহীন ঝোঁপগুলো অন্ধকারে তালগোল পাকিয়ে চাপ বেঁধে ছিল। শুকনো খড় বা তৃণখণ্ডগুলো বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তারা যেন কার ভয়ে। উড়ে পালাচ্ছে। শৈত্য আর বিষাদ যেন ব্যাপ্ত হয়েছিল চারদিকে।
অন্ধকার সব সময় চাপ সৃষ্টি করে মানুষের আত্মার ওপর। মানুষ তাই আলো চায়। দিনের আলো থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হলেই তার অন্তরাত্মাটা সংকুচিত হয়ে পড়ে কেমন যেন। মানুষের চোখ যখন অন্ধকার দেখে তখন অন্তর ভয় দেখে। এইজন্য গ্রহণের সময়, নিশীথ রাত্রিতে, বজ্র-বিদ্যুতের সময় সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষের অন্তরেও শঙ্কা জাগে। রাত্রিকালে কোনও বনভূমির উপর দিয়ে একা যেতে গিয়ে কোনও মানুষ ভয়ে না কেঁপে পারে না। শুধু ছায়া আর গাছ এই দুটো জিনিসের মধ্যেই রাত্রির রহস্যকুটিল বাস্তবতা প্রকটিত হয়ে ওঠে আমাদের সামনে। অকল্পনীয় অনেক ছায়ামূর্তি অশরীরী অথচ দৃশ্যমান অবস্থায় আমাদের হাতের কাছে এসে পড়ে যেন। ঘুমন্ত ফুলের স্বপ্নের মতো সেই সব অবয়বহীন ছায়ামূর্তিগুলো বাতাসে ভাসতে থাকে। আমাদের হাতের নাগালের মধ্যে সেগুলো এসে পড়লেও আমরা ধরতে পারি না তাদের। দূরে তাকালেই মনে হয় যত সব বন্যপ্রাণী বা ভৌতিক মূর্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে নিশ্বাস আমরা নিই, সে নিশ্বাস এক অন্ধকার শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। পেছনে তাকাতে ইচ্ছা হয়, অথচ তাকালেই ভয় হয়। শূন্যগর্ভ রাত্রির সমাধিগহ্বর সুলভ মৃত্যুশীতল নীরবতার অনন্ত অবকাশে অনেক অদৃশ্য মূর্তির উপস্থিতির আভাস পাওয়া যায়। নগ্ন বৃক্ষকাণ্ড, ঝুলন্ত শাখাপ্রশাখা, লম্বা লম্বা কম্পিত ঘাস–এই সবকিছুই ভয়াবহ হয়ে ওঠে রাত্রিকালে এবং এগুলোর সামনে আত্মরক্ষার পথ খুঁজে না পেয়ে অসহায়বোধ করি আমরা। কোনও মানুষই রাত্রিকালে বনের মধ্যে নির্ভীক, অকম্পিত ও অবিচলিত অবস্থায় যাবার মতো সাহস খুঁজে পায় না। এ ক্ষেত্রে কোনও মানুষই কোনও কাজ করতে পারে না। যেন তার গোটা আত্মাটাই অন্ধকারে মিশে গেছে, একক হয়ে গেছে। কোনও শিশুর কাছে এই সব প্রাকৃত বস্তু অতিপ্রাকৃতের রূপ ধরে অনির্বচনীয়ভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। রাত্রিকালে অন্ধকার বনে শিশুদের আত্মারা এক ভয়ার্ত বেদনার বৃক্ষশাখাগুলোকে ধরে যেন ঝুলতে থাকে।
