টেবিলের তলায় উঁকি মেরে দেখে মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, বেরিয়ে আয়।
কসেত্তে আবার বেরিয়ে এল।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, মিস অপদার্থ, এবার জল এনে ঘোড়াটাকে দাও।
ক্ষীণ স্বরে কসেত্তে বলল, মাদাম, জল তো নেই।
তার উত্তরে মাদাম থেনার্দিয়ের রাস্তার দিকে সদর দরজাটা খুলে বলল, তা হলে জল নিয়ে এস।
অগত্য কসেত্তে রান্নাঘর হতে একট খালি বালতি বার করে নিয়ে এল। বালতিটা তার থেকে বড়। তার ভেতর তার বসা চলে। মাদাম থেনার্দিয়ের একটা কাঠের হাতা নিয়ে রান্নায় মন দিল। রান্নার কাজ করতে করতে বলল, ঝরনায় প্রচুর জল আছে। এতে আর কষ্ট কী আছে। এটা তো আগেই করে রাখতে পারতে।
মাদাম থেনার্দিয়ের একটা ড্রয়ার থেকে পনেরো স্যু’র একটা মুদ্রা বার করে এনে কসেক্তের হাতে দিয়ে বলল, এই নাও মিস ব্যাড়, এটা রেখে দাও। এটা দিয়ে রুটির দোকান থেকে একটা বড় পাউরুটি কিনে আনবে।
কসেত্তে মুদ্রাটা হাত পেতে নিয়ে তার জামার পকেটের ভেতর রেখে দিল। তার পর বালতিটা নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ধরে ভাবতে লাগল।
মাদাম থেনার্দিয়ের চিৎকার করে উঠল, চলে যাও।
কসেত্তে বেরিয়ে গেল। সদর দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া হল।
.
৪.
মেলা উপলক্ষে পথের ধারে খোলা জায়গায় যে দোকানগুলো পাতা হয়েছিল সেগুলো চার্চ থেকে শুরু করে থেনার্দিয়েরের হোটেল পর্যন্ত চলে এসেছিল। মধ্যরাত্রিতে চার্চে উপাসনা করতে যাবার সময় গায়ের লোকেরা যাতে সবকিছু দেখতে পায় তার জন্য। দোকানগুলোতে উজ্জ্বল আলো জ্বেলে রাখা হয়েছিল। মঁতফারমেলের স্কুলমাস্টার তখন হোটেলে বসে ছিল। সে দোকানগুলোর দিকে তাকিয়ে তখন বলেছিল ‘অসংখ্য কাগজের লণ্ঠনগুলো চমৎকার দেখাচ্ছে। কিন্তু আকাশে কোনও তারা ছিল না।
হোটেলের উল্টো দিকে যে দোকানটা ছিল তাতে চকচকে কাঁচ আর অনেক ধাতুর জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছিল। দোকানটার সামনে দু-ফুট উঁচু পুতুল সাজানো ছিল। পুতুলটার পরনে ছিল গোলাপি রঙের ক্রেপের জামা, মাথায় সত্যিকারের কালো চুল আর এলোমেলো চোখ। পুতুলটা সারাদিন দোকানের সামনে ওইভাবে সাজানো ছিল। সারাদিন অসংখ্য শিশুর লুব্ধ দৃষ্টির শরে বিদ্ধ হয়েছে পুতুলটা। কিন্তু মঁতফারমেলের গাঁয়ের কোনও শিশুর মায়ের পুতুলটা কেনার মতো পয়সা জোটেনি। এপোনিনে আর অ্যাজেলমা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে পুতুলটার পানে সারাদিন কতবার তাকিয়ে থেকেছে। কসেত্তেও মাঝে মাঝে দেখেছে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে কসেত্তে একবার সেই দোকানটার সামনে দিয়ে যাবার লোভ সামলাতে পারল না। ধীর পায়ে দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগল। তার মনে হল দোকানটা যেন সামান্য একটা দোকান নয়, সুসজ্জিত এক প্রাসাদ এবং পুতুলটা যেন সামান্য একটা পুতুল নয়, যেন জীবন্ত এক মেয়ে। পুতুলটাকে এত কাছে থেকে এর আগে দেখেনি সে। দেখতে দেখতে তার মনে হচ্ছিল এক অফুরন্ত সুখ-সম্পদ আর ঐশ্বর্যের আলোকবন্যা অপরিসীম দুঃখকষ্ট আর অবজ্ঞার অন্ধকারভরা তার ছোট্ট জগৎটাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল কোথায় যেন। কসেত্তে এবার তার থেকে পুতুলটার আসল দূরত্ব বা ব্যবধানটা কতখানি তা বোঝার চেষ্টা করেছিল। সে বেশ বুঝতে পারল, রানি বা রাজকন্যা না হলে কেউ কখনও এত সুন্দর একটা জিনিসকে কিনতে পারে না। ঘরে রাখতে পারে না। পুতুলের পোশাক, চুল আর চোখ দেখে সে ভাবল পুতুলটা কত সুখী! দোকান থেকে একটা পা-ও নাড়াতে পারছিল না সে। সে সরে যেতে পারছিল না। যতই সে দেখছিল ততই সে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছিল। সব মিলিয়ে গোটা দোকানটা স্বর্গ মনে হচ্ছিল, বড় পুতুলটা আর তার পেছনে আরও যে সব পুতুল ছিল সেগুলো যেন এক একটা দেবদূত আর দোকানের মধ্যে ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে থাকা দোকানমালিক স্বর্গের পরম পিতা।
সে এতখানি মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে পড়েছিল যে জল আনতে যাবার কথাটা সে ভুলেই গিয়েছিল। সহসা এক কর্কশ কণ্ঠস্বরে চমক ভাঙল তার।
মাদাম থেনার্দিয়ের একবার হোটেল থেকে রাস্তার পানে তাকাতেই কসেত্তেকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে ওঠে, হতভাগী পাজি বদমাশ কোথাকার, এখনও যাসনি? ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? দাঁড়া, যাচ্ছি, গিয়ে মজা দেখাচ্ছি।
বালতিটা হাতে নিয়ে ছুটতে লাগল কসেত্তে।
.
৫.
থেনার্দিয়েরদের হোটেলটা ছিল গাঁয়ের এক প্রান্তে চার্চের কাছাকাছি। কসেত্তেকে তাই শেলেসের দিকে বনভূমির ভেতর যে ঝরনা ছিল সেখানে যেতে হবে জল আনতে। চার্চের কাছাকাছি দোকানগুলোর আলোয় কিছুটা পথ আলোকিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কিছু পরেই সে আলো আর দেখতে পেল না। সে অন্ধকারে পড়ে গেল। সে বালতিটা দিয়ে ঝনঝন শব্দ করে তার স্নায়ুবিক ভয়টাকে কাটাবার চেষ্টা করল। যতক্ষণ পথের দু ধারে দু-একটা বাড়ি ছিল এবং সেই সব বাড়ি থেকে দু একটা বাতির আলোর ছটা বেরিয়ে আসছিল ততক্ষণ বেশ সাহসের সঙ্গে পথ চলতে লাগল কসেত্তে। পথে তখন কোনও লোকচলাচল ছিল না। একজন মহিলা এক জায়গায় তাকে বলল, মেয়েটা এ সময় যাচ্ছে কোথায়? ভূত নাকি? তার পর তাকে চিনতে পারল। কিন্তু যখন পথের ধারে আর একটা বাড়ি ও দেখা গেল না, একটা আলোর ছটাও কোথাও থেকে বেরিয়ে এল
তখন আপনা থেকেই থেমে গেল কসেত্তে’র পা দুটো। তার চলার গতি কমতে কমতে একেবারে থেমে গেল। দোকানের আলোগুলো ছেড়ে অন্ধকারে আসতে তার কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু শহরের বাড়িগুলো ছাড়িয়ে মাঠে গিয়ে পড়ে পথচলা অসম্ভব হয়ে উঠল তার পক্ষে। বালতিটা নামিয়ে রেখে সে ভীতসন্ত্রস্ত ছেলেমেয়েদের মতো মাথা চুলকাতে লাগল। শহর ছাড়িয়ে সে অন্ধকারঘেরা মাঠের মধ্যে এসে পড়েছে। সেই অন্ধকারে মাঠে শুধু জীবজন্তু নয়, প্রেতাত্মাও থাকতে পারে। সে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে জীবজন্তুর ডাক শুনতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল সে যেন ভূত-প্রেতগুলোর আকার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। সে আবার বালতিটা তুলে নিল। ভয়ের আঘাতে মনে মনে শক্ত হয়ে উঠল সে। সে ভাবল ঠিক আছে, আমি গিয়ে বলব ঝরনায় আর জল নেই। আমি ফিরে যাব।
