কিন্তু এই অর্থোপার্জনের ব্যাপারে ব্যর্থ হয় সে। তার প্রভূত প্রতিভার উপযুক্ত কোনও কর্মসংস্থানের সুযোগ কোনও দিন আসেনি তার জীবনে। মঁতফারমেলের এই হোটেল ব্যবসায় সে নিজেকে ক্ষয় করে চলেছিল তিলে তিলে। সুইজারল্যান্ড অথবা পিরেনিজে থাকলে সে অনেক সম্পদ অর্জন করতে পারত। তবে হোটেলমালিককে কোথায় কখন ব্যবসার খাতিরে থাকতে হয়, তা তো বলা যায় না। ১৮২৩ সালে বেশ কিছু ঋণ ছিল থেনার্দিয়েরের এবং যে সব ঋণ অবিলম্বে পরিশোধ করা দরকার এমন ঋণের পরিমাণ ছিল ১৫০০ ফ্রাঁ এবং এ জন্য সে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিল।
থেনার্দিয়ের সবকিছু বুঝত এবং তার আতিথেয়তা ছিল। এছাড়া সে ভালো মাছ ধরতে পারত এবং লক্ষ্যভেদেও তার দক্ষতা ছিল। তার শান্তশীতল হাসিটা কিন্তু বড় কুটিল ছিল।
হোটেল চালানো সম্বন্ধে তার যে নীতি ছিল তা সে নিজেই প্রয়োগ করতে পারত না। তবু সে তার স্ত্রীর সুবিধার জন্য তাকে এ বিষয়ে উপদেশ দিত। সে একবার চাপা গলায় প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে তার স্ত্রীকে বলেছিল, হোটেলমালিকের কাজ হল সব নবাগতকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানানো, তাদের খাদ্য, আলো, জল, তাপ, বিছানার চাদর, নারীভৃত্য এবং সব রকমের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া। তাদের জন্য চেয়ার-টেবিল, আর্মচেয়ার, তোষক, আয়না প্রভৃতির ব্যবস্থা করা। এমনকি তাদের কুকুরের খাওয়ার জন্য ভালো ব্যবস্থা করা।
তাদের দাম্পত্যসম্পর্কটা কিন্তু মোটেই মধুর ছিল না। সে সম্পর্ক ছিল চাতুর্য আর রাগারাগিতে ভরা। থেনার্দিয়ের শুধু টাকার হিসাব করত, লাভের অঙ্ক কষত, নানারকম ফন্দি আঁটত আর কলা-কৌশল উদ্ভাবন করত। মাদাম থেনার্দিয়ের কিন্তু পাওনাদারদের তাগাদা সম্বন্ধে কোনও কিছু ভাবত না। অতীত বা ভবিষ্যতের পানে তাকাত না। সে শুধু একান্তভাবে বর্তমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।
তাদের দুজনের মাঝখানে ছিল কসেত্তে। দু দিক থেকেই চাপ পেত সে। তার একদিকে ছিল এক জাঁতাকল আর একদিকে ছিল সাঁড়াশি। বেশির ভাগ আঘাত আর পীড়নটা আসত মাদাম থেনার্দিয়েরের কাছ থেকে। পোশাক-আশাকের দিক থেকে কষ্ট দিত থেনার্দিয়ের নিজে। তার জন্যই তাকে খালি পায়ে চলতে হত। সে সব সময় উপর-নিচে করত, ঘর মোছা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, পালিশ করা, ভারী বোঝা বহন করা প্রভৃতি অনেক কাজ তাকে নিদারুণ পরিশ্রম সহকারে করতে হত। কর্তা বা গিন্নি কারও কাছ থেকেই সে কোনও দয়ামায়া পেত না। সারা হোটেল ছিল যেন এক বিরাট ফাঁদ। সে ফাঁদের মধ্যে যে দাসত্বের জীবন সে যাপন করত সে জীবন ছিল নির্মম পীড়ন আর যন্ত্রণায় ভরা। এক বিরাট মাকড়সার বিষাক্ত জালের মধ্যে অসহায় এক মাছির মতো ছটফট করত সে।
মুখে কোনও কথা বলত না মেয়েটা। কিন্তু মুখে কোনও কথা না বললেও তার শিশু মনের মধ্যে মানুষের জগৎ সম্বন্ধে কী চিন্তার উদয় হত, কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিত তা কে জানে?
.
৩.
চারজন নতুন পথিক এল হোটেলে। তার জন্য দুশ্চিন্তার শেষ নেই কসেত্তে’র মনে। তার বয়স মাত্র আট হলেও তার জীবনটা ছিল এমনই দুঃখকষ্টের যে সে যেন এক বৃদ্ধার চোখ দিয়ে জগক্টাকে দেখত। একবার মাদাম থেনার্দিয়েরের একটা ঘুষিতে তার মুখে দাগ হয়ে যায়। তাতে মাদাম থেনার্দিয়েরই বলে, দেখ দেখ, ওর মুখটা কেমন দেখাচ্ছে।
টেবিলের তলায় বসে সে ভাবছিল। ভাবছিল অন্ধকার রাত্রি। অথচ হোটেলে আসা নতুন লোকদের জন্য জল চাই। তাদের খাবারঘরে জলের যে সব জগ আর কলসি আছে সেগুলো ভরতে হবে। অবশ্য এটাও ঠিক যে হোটেলে যারা আসে তারা বেশি জল খায় না। জলের বদলে মদের পিপাসাই তাদের বেশি। তবু ভয়ে কাঁপতে লাগল কসেত্তে। মাদাম থেনার্দিয়ের স্টোভের উপর চাপানো রান্নার একটা পাত্র তুলে কী দেখল। তার পর একপাত্র জল আনতে গেল। গিয়ে দেখল জল নেই। সে বলল, জল ফুরিয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। কসেত্তে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বসে রইল।
থেনার্দিয়ের আধগ্লাস জল দেখে বলল, ভাবনার কিছু নেই, এতেই হবে। কসেত্তে তার কাজ করতে গেল। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা লাফাচ্ছিল। কখন সকাল হবে তার জন্য মুহূর্ত গণনা করতে লাগল সে। মাঝে মাঝে হোটেলের এক একজন বাসিন্দা জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলতে লাগল, রাস্তাটা পিচের মতো অন্ধকার। লণ্ঠন না নিয়ে কোনও বিড়াল ছাড়া কেউ বাইরে যেতে পারবে না।
একজন ফেরিওয়ালা তার একটা ঘোড়া নিয়ে সে রাতে হোটেলে এসে উঠেছিল। সে তার ঘর থেকে বাইরে এসে রাগের সঙ্গে বলল, আমার ঘোড়াকে জল দেওয়া হয়নি।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, নিশ্চয় হয়েছে।
ফেরিওয়ালা লোকটা বলল, আমি বলছি হয়নি মাদাম।
টেবিলের তলা থেকে কসেত্তে বেরিয়ে এসে বলল, আমি নিজে এক বালতি জল তাকে খাইয়েছি।
কথাটা সত্যি নয়, কসেত্তে মিথ্যা কথা বলছিল।
ফেরিওয়ালা বলল, হাঁটুর বয়সি মেয়েটা বড় মানুষের মতো মিথ্যা কথা বলছে। আমি বলছি, তাকে জল খাওয়ানো হয়নি।
কসেত্তে অশ্রুতপ্রায় নিচু গলায় বলল, যাই হোক, তাকে জল দেওয়া হয়েছে।
ফেরিওয়ালা বলল, ঠিক আছে, ঘোড়াকে জল দেওয়া তো আর একটা বিরাট ব্যাপার নয়। এখন জল এনে দাও না কেন?
কসেত্তে আবার টেবিলের তলায় ঢুকে গেল।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, তা অবশ্য ঠিক। ঘোড়াকে জল দেওয়া না হলে অবশ্যই। তা এখন দিতে হবে। মেয়েটা গেল কোথায়?
