কিন্তু আমাদের বিশ্বাস সে হল্যান্ডে হোটেল চালাবার জন্য প্রশিক্ষণ লাভ করে। আসলে সে ছিল বিভিন্ন জাতির রক্তগত সংমিশ্রণে উদ্ভূত এক অদ্ভুত বর্ণসংকর। সে ছিল ক্ল্যাভার্সে ক্লেমিশ, প্যারিসে ফরাসি, ব্রাসেলস্-এ বেলজিয়ান। যখন যেখানে যেমন দরকার সেই ধরনের পোশাক পরত সে। আমরা জানি ওয়াটারলুতে কী ঘটেছিল। আমরা জানি সে যুদ্ধে তার ভূমিকা সম্বন্ধে আগে কিছু বাড়িয়ে বলেছে সে। জোয়ার-ভাটার বিপরীতমুখী তরঙ্গাভিঘাতে দোলায়মান কুণ্ঠাহীন দ্বিধাহীন এক জীবন। সব সময় নিজের প্রধান স্বার্থপূরণের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ভেসে চলেছে। এইভাবে সে সাঁতার কেটে চলে। ১৮১৫ সালের জুন মাসে যুদ্ধকালে দারুণ গোলমালের সময় শিবিরে শিবিরে ঘুরে বেড়ায়। তার কিছুটা বিবরণ আমরা আগেই দিয়েছি। আমরা জানি সে একটা চাকা দেওয়া ঘোড়ার গাড়িতে করে স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। এক জায়গায় একটা জিনিস চুরি করে অন্য জায়গায় তা বিক্রি করেছে, সব সময় বিজেতা পক্ষের দলে ভেড়ার চেষ্টা করেছে। ওয়াটারলু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে কিছু স্বার্থ ও সুখ-সুবিধা ত্যাগ করে আবার সে মঁতফারমেলে এসে তার হোটেল ব্যবসায় মন। দিয়েছে। তার মানে যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহগুলোর থেকে যেসব হাতঘড়ি, টাকা-পয়সা, সোনার আংটি প্রভৃতি সে চুরি করে তাতে সে খুব একটা বেশি লাভ করতে পারেনি। সে বেশি দূর এগোতে পারেনি।
প্রার্থনাসভায় যাবার সময় থেনার্দিয়েরের গতিভঙ্গির মধ্যে এক নীরস গাম্ভীর্য ও কঠোরতার ভাব ছিল। সে খুব মোলায়েমভাবে কথা বলতে পারত এবং একজন গণ্যমান্য পণ্ডিত লোকের খ্যাতি পেতে চাইত। কিন্তু গাঁয়ের স্কুলমাস্টার লক্ষ করেছিল তার হোটেলের বাসিন্দাদের যেসব বিল দিত সেসব বিলে তার হাতের লেখাটা ভালো হলেও তাতে বানান ভুল থাকত। সে ছিল ধূর্ত, চোর, কুঁড়ে এবং কুটিল। নারীভৃত্যদের প্রতি সে মোটেই উদাসীন ছিল না অর্থাৎ তাদের প্রতি তার একটা জান্তর লালসা এবং আগ্রহ ছিল আর সেই কারণেই তার স্ত্রী হোটেলে কোনও নারীভৃত্য রাখত না। মাদাম থেনার্দিয়ের ছিল এক ঈর্ষাপরায়ণ দানবী। তার হলদেমুখো, বেঁটে-খাটো স্বামীটার প্রতি তার আসক্তির অন্ত ছিল না। এর ওপর থেনার্দিয়ের ছিল সদাসতর্ক, সংযতমনা, আত্মস্থ এক ঠাণ্ডামাথা জুয়োচোর, যার গোটা মনটা ছিল ভাঁড়ামিতে গড়া।
তার মানে এই নয় যে সে কখনও কোনও অবস্থাতেই রাগত না। বরং মাঝে মাঝে সে তার স্ত্রীর মতোই রেগে যেত। অবশ্য তার রাগটা খুব কমই হত। সে তখন এক গোড়া মনুষ্যবিদ্বেষীর মতো সমগ্রভাবে মানবজাতির প্রতি ঘৃণার গরল উদ্গার করত। সে এমনই এক লোক ছিল যে তার নিজের দুর্ভাগ্যের বা হতাশার জন্য কে বা বাইরের কোনও না কোনও ঘটনাকে দায়ী করত। তার মুখ থেকে তখন ফেনা ভাঙত। চোখ দুটো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত। তখন যারা তার সেই কোপের কবলে পড়ত তাদের দুর্ভাগ্য বলতে হবে।
এছাড়া থেনার্দিয়েরের পর্যবেক্ষণশক্তি ছিল খুব উচ্চ ধরনের। অবস্থা অনুসারে সে কখনও নীরব, নিরুচ্চার অথবা কখনও-বা বাঁচালের মতো সোচ্চার হয়ে উঠত। কাঁচের। মধ্য দিয়ে দূর দিগন্তে তাকিয়ে থাকা নাবিকদের মতো তার দৃষ্টি ছিল শক্তিসম্পন্ন। একথায় এক ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ।
হোটেলে কোনও নতুন লোক এলে মাদাম থেনার্দিয়েরকেই হোটেলের আসল মালিক মনে করত। কিন্তু সেটা তার ভুল। আসলে মাদাম থেনার্দিয়ের কী ছিল না। থেনার্দিয়েরই ছিল একই সঙ্গে হোটেলের কর্তা এবং কত্রী। মাদাম থেনার্দিয়ের খাটত ঠিক, সব পরিকল্পনা তার স্বামী করত। সব কিছু নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করত সে। থেনার্দিয়েরের সামান্য একটা মুখের কথায় বা একটা অঙ্গুলি হেলনে সাক্ষাৎ দানবীর মতো এই মহিলাটি কেঁচো হয়ে যেত। অকুণ্ঠভাবে তার স্বামীর আদেশ মেনে চলত। কোনও কিছু না ভেবেই মাদাম থেনার্দিয়ের তার স্বামীকে তার থেকে সব দিক দিয়ে বড় বলে মেনে নিত। নীতিগত কোনও বিষয়ে তার স্বামীর মতের বিরুদ্ধে যেত না। প্রকাশ্যে কোনও বিষয়ে স্বামীর কোনও কথা বা কাজের প্রতিবাদ করত না। যদিও তাদের দু জনের মিলনে বিশেষ কোনও সুফল ফলেনি, তবু স্বামীর প্রতি আত্মসমর্পণের ব্যাপারে এক তুরীয় ও বিরল মনের পরিচয় দেয় মাদাম থেনার্দিয়ের। স্বৈরাচারী স্বামীর সামান্য অঙ্গুলি হেলনের সঙ্গে সঙ্গে মেদবহুল সেই অচল অটল পাহাড় টলতে শুরু করে। যে বৈশ্বিক নিয়মের বশে আত্মার দ্বারা বস্তুজগৎ অনুশাসিত হয় মাদাম থেনার্দিয়েরের জীবনে সেই নিয়মেরই প্রকাশ ঘটে। অকুণ্ঠ আত্মসমর্পণের মধ্যে যেমন এক শান্ত সৌন্দর্য আছে তেমনি তার মধ্যে কতকগুলি কুৎসিত রূপও আছে। তবে একথা ঠিক যে থেনার্দিয়েরের মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যার জন্য সে তার স্ত্রীর ওপর আধিপত্য করতে পারত। এক-এক সময় তার মনে হত তার স্বামী এক প্রদীপের আলো, আবার এক-এক সময় তাকে শাঁখের করাত বলে মনে হত।
মাদাম থেনার্দিয়ের নামে এই ভয়ঙ্কর মহিলাটি তার ছেলেমেয়েদের ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসত না। একমাত্র স্বামী ছাড়া জগতে আর কাউকে ভয় করত না। তবে তার মাতৃস্নেহ শুধু তার মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে স্নেহ তার পুত্রসন্তানের প্রতি প্রসারিত ছিল না। থেনার্দিয়েরের স্নেহ-ভালোবাসা বলে কোনও কিছু ছিল না। জীবনে কী করে ধনী হওয়া যায়, এটাই ছিল তার একমাত্র চিন্তা। অর্থের প্রতিই ছিল তার একমাত্র আগ্রহ।
