সেদিন খ্রিস্টোৎসব উপলক্ষে একদল লোক থেনার্দিয়েরদের হোটেলের একটা বড় ঘরে বসে মদ পান করছিল। লোকগুলো ছিল মালবাহী গাড়ির চালক। চার-পাঁচটা বাতির আলোয় ঘরটা আলোকিত ছিল। লোকগুলো মদ পান করতে করতে গোলমাল করছিল। থেনার্দিয়ের মদ পান করতে করতে তার খরিদ্দারদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছিল আর মাদাম থেনার্দিয়ের আগুনের ধারে হাত সেঁকছিল।
রাজনীতির বিষয়টা স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ। তবে যুদ্ধ ছাড়াও আর একটা বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করছিল। এ বিষয়টা গাঁয়ের সবাই তখন আলোচনা করত।
ওরা বলাবলি করছিল, এবার নানতারে আর সুরেসনের চারপাশের অঞ্চলে খুব ভালো আঙুর হয়েছে। আঙুরগুলো পাকা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। বসন্তকাল শুরু হতেই কাঁচা আঙুরগুলো পেড়ে গাঁজাতে দিতে হবে। তা হলে বেশ ভালো হালকা মদ হবে তার থেকে। আমাদের এখানকার মদের থেকে হালকা।
ময়দালের একজন শ্রমিক বলছিল, ময়দার বস্তার মধ্যে যদি বাজে ময়দা থাকে তা হলে আমরা কী করব বলো তো? যেমন গম হবে তেমনিই তো ময়দা হবে। বিশেষ করে ব্রেতো’র গমগুলো খুব খারাপ। গমের সঙ্গে হাড়, এক ধরনের হলুদ ফুলওয়ালা চারাগাছ, শন, খেঁকশেয়ালের লেজ প্রভৃতি যত সব বাজে জিনিস মেশানো থাকে আর সেগুলো মেশিনে পেশাই হয়ে গুড়ো হয়ে যায়। ময়দা নিয়ে লোকে নানারকম অভিযোগ করে। কিন্তু কী করব বল?
জানালার ধারে বসে একজন দিনমজুর আর একজন চাষি দিনমজুরি নিয়ে আলোচনা করছিল। আগামী বসন্তকালে ফসল কাটার সময় মজুরি কী হবে, তাই নিয়ে কথা বলছিল তারা। শ্রমিকটা চাষিকে বলছিল, তোমার ঘাস কাটা শক্ত মঁসিয়ে, কারণ ও ঘাস এত নরম যে কাস্তে দিয়ে কাটতেই চায় না।
এইভাবে হোটেলের খাবারঘরে নানা লোক যখন নানা রকমের আলোচনা করছিল তখন কসেত্তে রান্নাঘরের টেবিলের তলায় উনোনের পাশে একটা কাঠের উপর বসে ছিল। একটা কম্বলে গা-টা জড়ানো ছিল তার। পায়ে ছিল কাঠের জুতো। কিন্তু কোনও মোজা ছিল না। সে থেনার্দিয়েরদের ছেলেমেয়েদের জন্য পশম দিয়ে মোজা বুনছিল। পাশের ঘরে দুটো বাচ্চা মেয়ের হাসি আর কথাবার্তার শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। এই মেয়ে দুটি হল এপোনিনে আর অ্যাজেলমা। দেয়ালের উপর গাথা একটা পেরেক থেকে চামড়ার একটা ফিতে ঝুলছিল। মাঝে মাঝে ঘরের বাইরে কোনখান থেকে একটা শিশুর কান্নার শব্দ আসছিল। এই শিশুটি থেনার্দিয়েরদের শেষ সন্তান তিন বছর বয়স। সে খুব দুষ্টুমি করায় তার মা তাকে বাইরে ছেড়ে দিয়েছিল।
তাই সে কাঁদছিল। তার কান্না আর চিৎকারের শব্দ যখন হোটেলের খাবারঘরে খুব বেশি করে আসতে লাগল তখন থেনার্দিয়ের তার স্ত্রীকে বলল, তোমার ছেলে চেঁচাচ্ছে, দেখ কী চায়।
কিন্তু তার স্ত্রী মাদাম থেনার্দিয়ের কথাটার কোনও গুরুত্ব না দিয়ে নিতান্ত সহজভাবে বলল, ছেলেটা বাজে।
মা না ধরায় ছেলেটা গোটা বাড়িময় কেঁদে বেড়াচ্ছিল।
.
২.
এ পর্যন্ত থেনার্দিয়ের দম্পতির যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে তা তাদের একটি রেখাচিত্র মাত্র। এবার আমরা তার আরও কাছে যাব খুব ঘনিষ্ঠভাবে।
বর্তমানে হোটেলমালিক থেনার্দিয়েরের বয়স ছিল পঞ্চাশ আর মাদাম থেনার্দিয়েরের বয়স ছিল চল্লিশ। মেয়েদের চল্লিশ বছর বয়স পঞ্চাশের সমান। সুতরাং স্বামী-স্ত্রীর বয়স প্রায় এক ছিল বলা যায়। পাঠকদের হয়তো স্মরণ থাকতে পারে মাদাম থেনার্দিয়েরের চেহারার একটা বর্ণনা আগেই দেওয়া হয়েছে। তারা চেহারাটা ছিল লম্বা, মাথায় ছিল ভালো চুলের রাশি, মুখখানা লাল, মাংসল দেহ, চওড়া কাঁধ, স্বাস্থ্যটা খুবই সুগঠিত। আবার সে ছিল তেমনি কর্মঠ। তাকে প্রায়ই খাটতে দেখে মনে হত সে যেন কোনও রূপকথার রাক্ষসীদের কথা মনে পড়িয়ে দেয় যারা তাদের মাথার চুল থেকে ঝোলানো। দু পাশে থান ইটগুলো নিয়ে মাটির উপর দিয়ে মার্চ করে যেত। সে সংসারের যাবতীয় কাজ করত–বিছানা পাতা, ঘর পরিষ্কার করা, কাপড় কাঁচা, রান্না করা–সব করত সে একা। সে-ই ছিল হোটেলের প্রাণ। সে ছিল এক আস্ত শয়তান আর কসেত্তে ছিল একমাত্র সহকারিণী। ঠিক যেন কোনও হাতির সেবাকার্যে নিযুক্ত এক নেংটি ইঁদুর। তার গলার স্বর শুনে শুধু জানালার কাঁচের সারসি আর ঘরের আসবাবপত্রগুলো কাপত না, হোটেলে যারা খেতে আসত সেই সব খরিদ্দারেরাও কাঁপত ভয়ে। তার মুখখানা ছিল ব্রণতে ভর্তি এবং তার মুখে সামান্য একটু দাড়ি ছিল। তাকে দেখে মনে হত যেন বাজারের এক মালবাহী কুলি নারীর বেশ ধারণ করে আছে। সে জোর গলায় বড়াই করে বলত সে একটা ঘুষি মেরে একা নারকেল ফাটিয়ে দিতে পারে। সে পুলিশের মতো কথাবার্তা বলত, গারোয়ানের মতো মদ খেত এবং কসেত্তের সঙ্গে একজন জেলারের মতো ব্যবহার করত। একটা দাঁত মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকত।
থেনার্দিয়ের সব সময় হাসত এবং সব খরিদ্দারের সঙ্গে দ্র ব্যবহার করত। এমনকি যে ভিখারিকে সে বাড়ি থেকে কিছু না দিয়ে তাড়িয়ে দিত তাকেও মিষ্টি কথা বলত। বেজি আর উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিমান লোকের মতো তার দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ। আব্বে দেলাইনের ছবিতে ঠিক যেমনটি দেখা যায়। সে তার খরিদ্দারদের সঙ্গে মদ খেতে ভালোবাসত। কিন্তু তাকে মদ খাইয়ে মাতাল করে তুলঁতে পারত না কখনও। সে একটা বড় পাইপে চুরুট খেত এবং একটা কালো জ্যাকেটের উপর ঢোলা আলখাল্লা পরত। সে উচ্চশিক্ষার ভান করত এবং বলত সে বস্তুবাদী দর্শনের সমর্থক। তার যুক্তির সমর্থনে সে ভলতেয়ার, রেনল, পার্নে এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা সেন্ট অগাস্টাইনের নাম করত। সে বলত তার একটা নিজস্ব মতবাদ আছে। এছাড়া সে ছিল কুটিল প্রকৃতির, এক সাধু শয়তান। এই ধরনের লোকের অবশ্য অভাব নেই। সে একদিন সেনাবিভাগে কাজ করেছিল বলে দাবি করত। সে বলত ওয়াটারলু যুদ্ধে সে একজন সার্জেন্ট হিসেবে শত্রুপক্ষের এক দুর্ধর্ষ সেনাদলের সঙ্গে একা লড়াই করে এবং ভয়ঙ্করভাবে আহত এক সেনাপতিকে সে রক্ষা করে। এজন্য তার হোটেলটাকে স্থানীয় লোকেরা ওয়াটারলু’র সার্জেন্টের হোটেল বলে। সে ছিল একই সঙ্গে উদারনীতিবাদী, রক্ষণশীল এবং বোনাপার্টবাদী। যেসব উদারনীতিবাদী ও বোনাপার্টাদী টেকসাসের উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয় সেখানে সে কিছু দান করে। গায়ের লোকেরা বলত পৌরোহিত্য কাজের জন্যও সে পড়াশুনো করে।
