জনতা এক বিপুল হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ে। এমনকি জেলখানার কড়া অফিসারদের চোখেও জল আসে। ডকে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা আনন্দে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরল। জনতা একবাক্যে চিৎকার করে ধ্বনি দিতে লাগল, এই কয়েদিকে মুক্তি দিতে হবে।
উদ্ধারকারী কয়েদি লোকটি তখন তার কাজের জায়গায় আবার ফিরে যেতে লাগল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে উদ্ধারের কাজ করতে গিয়ে তার হাত-পা অবসন্ন হয়ে পড়ে। সে মাতালের মতো টলছিল। একসময় তাড়াতাড়ি করে যেতে গিয়ে সে টলতে টলতে হঠাৎ জলে পড়ে যায়। জনতার দৃষ্টি এতক্ষণ তার ওপর নিবদ্ধ ছিল। সে পড়ে যেতে জনতা আবার চিৎকার করে ওঠে।
যেখানে সে পড়ে গেল সে জায়গাটা বিপজ্জনক। কারণ আর একটা যুদ্ধজাহাজ ওরিয়নের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। দুটো জাহাজের মাঝখানে সে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্ধারের জন্য নৌকো নামানো হল জাহাজ থেকে। কিন্তু কয়েদি লোকটির কোনও দেখা পাওয়া গেল না। মনে হল সে যেন দুটো জাহাজের মাঝখান দিয়ে ডুবে ডুবে দূর। সমুদ্রে চলে গেছে।
রাত্রি পর্যন্ত ডুবন্ত লোকটির উদ্ধারের কাজ চলতে লাগল। কিন্তু তার দেহটিকে কোথাও দেখা গেল না।
পরদিন স্থানীয় সংবাদপত্রে একটি সংবাদ প্রকাশিত হল।
১৭ নভেম্বর, ১৮২৩ সাল। গতকাল এক কয়েদি ওরিয়ন জাহাজের উপর কাজ করার সময় একটি বিপন্ন নাবিককে উদ্ধার করার পর সমুদ্রের জলে পড়ে গিয়ে ডুবে যায়। তার দেহটিকে পাওয়া যায়নি। মনে হয় আর্থেনালের জেটির তলায় আবর্জনার মধ্যে তার দেহটা আটকে পড়েছে। লোকটির জেলখানার রেজিস্ট্রির নম্বর হল ৯৪৩০ এবং তার নাম হল জাঁ ভলজাঁ।
২.৩ মঁতফারমেল শহরটা
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
মঁতফারমেল শহরটা লিভরি আর শশালেসের মাঝখানে অবস্থিত। জায়গাটা হল উর্ক নদী আর মার্নের মাঝখানে উঁচু মালভূমিটার দক্ষিণ দিকের ঢালটার উপরে। একালে মঁতফারমেল শহরটার অনেক শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে আগের থেকে। অনেক বড় বাড়ি গড়ে উঠেছে সেখানে আর রাস্তাঘাটেরও অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সেকালে এ শহর ছিল একটা গণ্ডগাঁয়ের মতো। সেকালে ঘরবাড়ির সংখ্যা ছিল খুবই কম। গাঁয়ের ভেতরটা ছিল যেমন শান্ত তেমনি ফাঁকা ফাঁকা। পরে এই শান্ত সুন্দর গাটায় লিনেন ব্যবসায়ী আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা ভিড় জমাতে থাকে। গাঁটা খুবই শান্ত এবং সুন্দর। একমাত্র সমস্যা ছিল জলের। কারণ গাটা ছিল এক উঁচু মালভূমির উপরে অবস্থিত।
জল আনতে হত অনেক দূর থেকে। গায়ের যেদিকটা দিয়ে গ্যাগনির পথটা চলে গেছে সেই দিকের বাসিন্দারা গ্রামপ্রান্তের এক বনের ভেতর যেসব জলাশয় ছিল সেখান থেকে জল আনত। গাঁয়ের যে প্রান্ত দিয়ে শেলেনের রাস্তাটা চলে গেছে সেই প্রান্তের লোকেরা শেলেন রোডের ধারে পাহাড়ের ঢালের নিচু দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা ঝরনা থেকে জল আনত।
সুতরাং গাঁয়ের সাধারণ অধিবাসীদের জলের জন্য দারুণ কষ্ট পেতে হত। গায়ের মধ্যে। যারা ছিল অভিজাত শ্রেণির লোক আর থেনার্দিয়েরদের মতো হোটেল মালিক তারা কিছু টাকা খরচ করে জল বয়ে আনাত। জলবাহকও এইভাবে জল বয়ে দিয়ে প্রায় আট স্যু করে রোজগার করত। শীতকালে বেলা পাঁচটা পর্যন্ত আর গ্রীষ্মকালে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত জল বয়ে। আনার কাজ করত। এরপর কারো কোনও দরকার পড়লে আর এক বিন্দুও জল কিনতে পাওয়া যেত না। তখন কারও জলের দরকার পড়লে তাকে নিজেরও আনতে যেতে হত। এই জল আনার ব্যাপারটাই ছোট মেয়ে কসেত্তের কাছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। ফাঁতিনের মেয়ে কসেরে পাঠকদের কাছে আগে থেকেই পরিচিত। পাঠকদের হয়তো মনে থাকতে পারে দুটো কারণে থেনার্দিয়েররা তাকে ছাড়তে চাইত না। তার একটা কারণ ছিল তার মার কাছে থেকে বিভিন্ন মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে টাকা আদায় করা এবং আর একটা কারণ ছিল তাকে দিয়ে ঘর-সংসারের কাজ করিয়ে নেওয়া। তাকে দিয়ে গাধার মতো খাঁটিয়ে নেওয়ার জন্য তার মা টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেও তাকে ছেড়ে দেয়নি তারা। এক অবৈতনিক ভৃত্য হিসেবে থেনার্দিয়েরদের বাড়িতে এক বিশেষ প্রয়োজন ছিল তার। তাকেই জল আনতে পাঠাত থেনার্দিয়েররা। পাছে সন্ধের পর তাকে জল আনতে পাঠায় এজন্য কসেত্তে দিনের বেলাতেই বেশি করে জল বয়ে আনত। সন্ধের পর জল যাতে ফুরিয়ে না যায় এজন্য তার আগেই ব্যবস্থা করে রাখত। সন্ধের পর জল আনতে যেতে বড় ভয় করত তার।
১৮২৩ সালে মঁতফারমেলে খ্রিস্টোৎসবটা বেশ জাঁকজমকের সঙ্গেই সম্পন্ন হয়। সেবার প্রথম শীত পড়ার সময় বরফ পড়েনি। এই খ্রিস্টোৎসব উপলক্ষে সেবার প্যারিস থেকে এক ভবঘুরে নাট্যদল এসে মেয়রের অনুমতি নিয়ে মঁতফারমেলের মধ্যে থেনার্দিয়েরদের হোটেলটার কাছাকাছি এক জায়গায় পথের ধারে ডেরা পাতে। মেয়রের অনুমতি পেয়ে কতকগুলি ফেরিওয়ালাও দোকান পাতে সেখানে। ফলে জায়গাটা জমজমাট হয়ে ওঠে মানুষের ভিড়ে। থেনার্দিয়েরদের হোটেলেও খরিদ্দারের বেশ ভিড় হতে থাকে।
এই সময় সেই জায়গায় একদল লোক কোথা থেকে জীবজন্তুর খেলা দেখাতে আসে। তারা কোথা থেকে আসে তা কেউ জানে না। তাদের সঙ্গে যেসব জীবজন্তু ছিল তাদের মধ্যে ব্রাজিলের একটা লাল রঙের শকুনি ছিল। শকুনিটাকে দেখতে ভয়ঙ্কর রকমের ছিল। ১৮৪৫ সালের আগে মিউজিয়ামে এই ধরনের কোনও শকুনিকে রাখা হয়নি। নেপোলিয়নের অনেক নামকরা অফিসার শকুনিটাকে দেখতে আসে। দলের লোকেরা বলত, ঈশ্বর যেন তাদের সুবিধার জন্য শকুনির ডানাগুলোকে লাল করেছেন।
