যে কোনও যুদ্ধজাহাজ প্রতিকূল প্রাকৃতিক শক্তির ওপর মানুষের জয় ঘোষণার এক। যন্ত্রবিশেষ। সবচেয়ে হালকা জিনিস দিয়ে তৈরি সবচেয়ে ভারী এই জিনিসটি কঠিন তরল ও বায়বীয় এই তিন রকমের ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের সঙ্গে কখনও ভিন্ন ভিন্নভাবে, আবার কখনও-বা একই সঙ্গে কাজ করে যেতে হয়। ওরিয়নের তলায় ছিল এগারোটা লোহার চাকা, যা দিয়ে সে সমুদ্রের জল কেটে যেত এবং বাতাস কাটাবার জন্য সাধারণ জাহাজের থেকে অনেক বেশিসংখ্যক পাখনা ছিল। এর মধ্যে ছিল একশো কুড়িটি কামান। সব কামান যখন গর্জন করত তখন তা বজ্রগর্জনকেও হার মানাত। এর লণ্ঠনের আলোগুলো অন্ধকার রাতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের রূপ ধারণ করত। ওরিয়নের কামানগুলো যখন গর্জন করত তখন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তার ধ্বংসাত্মক অস্তিত্বটা প্রকটিত করার জন্য উত্তাল তরঙ্গমালার সৃষ্টি করত। ওরিয়নের আর একটা শক্তি ছিল। সেটা হল তার কম্পাস বা দিকনির্ণয় যন্ত্র। এই যন্ত্রের সাহায্যে সে এর আগে ক্রমাগত উত্তর দিকে যেতে থাকে। সুতরাং ওরিয়ন ছিল ঝোড়ো হাওয়ার কাছে রজ্জবদ্ধ বস্তুর দৃঢ়তায় অটল, জলের কাছে ছিল কাঠের মতো শক্ত, পাথরের কাছে লোহা বা তামা, অন্ধকারে আলো আর ঘনত্বের কাছে ছিল সূর্যের মতো।
একটি যুদ্ধজাহাজ কী কী উপাদানে গড়া এবং তাতে কী কী থাকে, তা দেখতে হলে তুলঁ বন্দরের ডকইয়ার্ডে একবার যেতে হয়। সেখানে যখন জাহাজ তৈরির কাজ চলে তখন। তা দেখতে হয়। একটি ইংরেজ যুদ্ধজাহাজের প্রধান মাস্তুলটা সমুদ্রের জলতল থেকে দুশো সত্তর ফুট উঁচু। একটা যুদ্ধজাহাজ তৈরি করতে এত কাঠ লাগে যে সে জাহাজকে একটা ভাসমান বন বলা যেতে পারে। আজকের যুগের যুদ্ধজাহাজ দাঁড় টেনে চালানো হয় না। তা চলে পঁচিশ হাজার অশ্বশক্তিসম্পন্ন এক বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনের দ্বারা। তবু প্রাচীন যুগের জাহাজগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ক্রিস্টোফার কলম্বাস। তিনি যে জাহাজটি ব্যবহার করেন সে জাহাজটি সত্যিই এক আশ্চর্যের বস্তু। সে জাহাজ ছিল মানুষের এক অপূর্ব সৃষ্টি। যেসব বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালার মধ্য দিয়ে তাকে পথ করে যেতে হত, সেই সব তরঙ্গমালার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য তার ছিল অপরাজেয় অফুরন্ত শক্তি।
তথাপি একথা সত্য যে একটি বিরাট যুদ্ধজাহাজের উত্তুঙ্গ মাস্তুল বড় রকমের ঝড়ের কবলে পড়লে তা ছিন্নভিন্ন বৃক্ষশাখার মতো ভেঙেচুরে উড়ে যেতে পারে। তার নোঙরের বড় বড় শিকলগুলোও মুচড়ে ভেঙে যেতে পারে, তার বড় বড় কামানগুলোর গর্জন প্রবল ঝড় ও সমুদ্রগর্জনের শব্দের মধ্যে ডুবে যেতে পারে। একটি যুদ্ধজাহাজের বিপুল ধ্বংসাত্মক শক্তির সমস্ত প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য বৃহত্তর এক প্রাকৃতিক শক্তির কাছে বাধ্য হয় হার মানতে। এত বড় শক্তি কিভাবে ব্যর্থ ও নস্যাৎ হয়ে যায়, তা দেখাটা জনগণের কাছে এক ভীতিপ্রদ ব্যাপার। এই জন্যই সব সমুদ্রবন্দরের ডকে এমন কৌতূহলী জনতার ভিড় জমে। তুলঁ’র ডকে ও জেটিতেও তাই প্রতিদিন দর্শকদের ভিড় জমছিল ওরিয়নকে দেখার জন্য।
ঝড়ের আঘাতে আহত হয় ওরিয়ন তাই তুলঁতে আসে তার রোগ সারাতে।
একদিন সকালবেলায় দর্শকদের এক জনতা এক দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।
সেদিন সকালে একজন নাবিক যখন জাহাজের মাথায় পালগুলো সরাচ্ছিল তখন হঠাৎ সে তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। হঠাৎ জনতার মধ্য থেকে এক ভীতিবিহ্বল চিৎকার উঠল। তারা দেখল নার্বিকটি দড়ির উপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে করতে হঠাৎ পা ফসকে পড়ে গিয়ে পাশের দড়িটা হাত দিয়ে ধরে ঝুলতে লাগল। তার তলায় ভয়ঙ্কর সমুদ্র যেন তাকে গ্রাস করার জন্য উদ্যত হয়ে আছে।
তার চাপে ভয়ঙ্করভাবে দুলতে লাগল দড়িটা। সে যতই উপরে ওঠার চেষ্টা করতে থাকে ততই দড়িটা ভীষণভাবে দুলতে থাকে। স্থানীয় জেলেদের থেকে নেওয়া নাবিকদের কেউ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে তার সাহায্যে এগিয়ে যেতে সাহস করল না। সে ক্রমশই ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ছিল। হাত দুটো দড়ি থেকে একবার খসে পড়লেই সে সমুদ্রে পড়ে যাবে। তার মুখখানা ভয় আর বেদনায় বিহ্বল হয়ে উঠেছিল। জনতা গভীর আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল। তারা জানত কেউ তাকে উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে আসবে না। সুতরাং তারা শুধু সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল যখন সে দড়িটা ছেড়ে দিয়ে সমুদ্রের জলে পড়ে যাবে। দড়িটা একটা বৃন্ত আর লোকটা যেন একটা পাকা ফল অথবা শুকনো পাতা।
হঠাৎ দেখা গেল একজন শ্রমিক কাজ করতে করতে এক বনবিড়ালের মতো জাহাজের উপরে উঠে গেল। তার পর যে দড়িটা ধরে সেই বিপন্ন নাবিকটি ঝুলছিল সে দড়িটার একটা প্রান্ত টেনে সেটা শক্ত করে বেঁধে দিল। তার পর সে ক্ষিপ্রগতিতে বিপন্ন নাবিকের কাছে তার কোমর ধরে তাকে দড়ি ছেড়ে দু হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে বলল। লোকটা তাই করলে সে এবার দড়িটা দু হাত দিয়ে ধরে তার প্রান্তে গিয়ে জাহাজটাতে উঠে পড়ল। আর এক মুহূর্ত দেরি হলে বিপন্ন নাবিকটি দড়ি ছেড়ে পড়ে যেত।
উদ্ধারকারী লোকটি ছিল এক জেল-কয়েদি। তুলঁ’র জেলখানা থেকে কিছু কয়েদিকে সরকারি জাহাজ মেরামতের কাজের জন্য আনা হয়েছিল। তার মাথার টুপিটা হাওয়ায় উড়ে যাওয়ায় তার মাথার সাদা চুলগুলো দেখা যাচ্ছিল। লোকটি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। সে বয়সে যুবক না হলেও তার গায়ে ছিল প্রচুর শক্তি। বিপন্ন নাবিককে কেউ উদ্ধার করতে না যাওয়ায় সে এগিয়ে যায়। সে তাদের অফিসারের কাছে গিয়ে এজন্য অনুমতি চায় এবং অফিসার অনুমতি দিলে সে হাতুড়ির ঘা দিয়ে তার পায়ের শিকলটাকে ভেঙে ফেলে। অবশেষে সে বিপন্ন লোকটিকে ধরে নিয়ে জাহাজের উপরতলা থেকে নিচের তলায় ডেকের উপর নিয়ে আসে।
