থেনার্দিয়ের একদিন একজনকে বলল, ও তো জেলে গিয়েছিল। কে জেলে যাচ্ছে, সেটা আমাদের জানার কথা নয়।
থেনার্দিয়ের আর একদিন সন্ধেবেলায় বলে, বুলাত্রিউল বনের মাঝে যেসব রহস্যময় কাজ করেছে সে বিষয়ে আইন নিশ্চয় অনুসন্ধান চালায় এবং দরকার হলে শারীরিক পীড়নের মাধ্যমে তার কাছ থেকে সব কথা বার করে নেবে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় যদি দলের পদ্ধতিমূলক পীড়ন চালানো হয় তা হলে বেশিক্ষণ কথাটা সে চেপে রাখতে পারবে না।
থেনার্দিয়ের বলল, ঠিক আছে, ওকে মদ খাইয়ে প্রশ্ন করে কথা বার করে নিতে হবে।
সুতরাং তারা এক ভোজসভার আয়োজন করল এবং বুলালিউলকে খুব মদ খাওয়াল। বুলাত্রিউল খুব বেশি করে মদ খেল, খুব কথা বলল। প্রচুর মদ খেয়েও সে তার বিচার-বুদ্ধি ঠিক রেখেছিল। অবশেষে সেই স্কুলমাস্টার আর থেনার্দিয়ের ব্যর্থ হয়ে এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
একদিন খুব সকালে বুলাত্রিউল যখন বনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল তখন একটা ঝোঁপের মাঝে একটা গাঁইতি আর শাবল পড়ে থাকতে দেখে। তার মনে হল সে যেন ঝোঁপের মধ্যে ওগুলো লুকিয়ে রেখে গেছে। তার মনে হল জলবাহক পিয়ের সিক্স থের রেখে গেছে এগুলো। তখন সে আর এ নিয়ে বেশি কিছু ভাবল না।
কিন্তু সেদিন সন্ধেবেলায় কী মনে হতে বুলাত্রিউল বনে গিয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল। সে ভাবল যে ওইগুলো রেখে গেছে সে নিশ্চয় সন্ধের সময় খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করবে। কিছুক্ষণ থাকার পর সে দেখল একটা লোক রাস্তা থেকে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সে দেখল লোকটা এ অঞ্চলের বাসিন্দা নয়। তবে সে লোকটাকে চিনত। পরে থেনার্দিয়ের কথাটা ব্যাখ্যা করে বলে, বুলাত্রিউল লোকটাকে নিশ্চয় জেলে থাকাকালে দেখেছে। তার মানে লোকটাও একদিন জেলের কয়েদি ছিল। বুলাত্রিউল কিন্তু লোকটার নাম বলতে চায়নি এবং এ বিষয়ে বেশ একটা জেদ ধরেছিল। বুলাত্রিউল সেদিন সন্ধ্যায় দেখল লোকটা বাক্স বা সিন্দুকের মতো চারকোনা একটা জিনিস নিয়ে আসছে।
প্রথমে ব্যাপারটা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল বুলাত্রিউল। বিস্ময়ের ঘোরে প্রথমে লোকটাকে অনুসরণ করার কথাটা মনেই হয়নি তার। যখন কথাটা মনে হল তখন খুব দেরি হয়ে গেছে। লোকটা বনের মধ্যে ঢুকে গেল। আকাশে চাঁদ ছিল। দু-এক ঘণ্টা পরে লোকটাকে আবার দেখা গেল। তখন তার হাতে গাঁইতি আর শাবল ছিল, কিন্তু চারকোনা বাক্সটা ছিল না। বুলাত্রিউল ভয়ে তার কাছে গেল না। লোকটা তার থেকে তিনগুণ বলবান। তার ওপর তার হাতে একটা লোহার রড আর একটা গাঁইতি আছে। সে যদি বুঝতে পারে বুলাত্রিউল তাকে লক্ষ করছে তা হলে সম্ভবত তাকে খুন করত তাকে চিনে ফেলেছে বলে। তবে তার হাতে শাবল আর গাঁইতি দেখে সে বুঝতে পারে ব্যাপারটা কী। সে সকালে ঝোঁপের মাঝে ওই শাবল আর গাঁইতি পড়ে থাকতে দেখে। সে বুঝতে পারে লোকটা নিশ্চয় কিছু পুঁতে রাখছিল। বাক্সটা ছোট বলে তাতে কোনও মৃতদেহ রাখা সম্ভব নয়, তাই নিশ্চয় কোনও টাকাকড়ি বা ধনরত্ন ছিল।
এই ভেবেই সে বনের মধ্যে যেখানেই কোনও ফাঁকা জায়গাতে কোনও খোঁড়া মাটি দেখতে পেয়েছে সেখানেই মাটিগুলো সরিয়ে দেখেছে তার ভেতরে কিছু আছে কি না। কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সে কিছুই পায়নি।
ক্রমে মঁতফারমেলের লোকেরা এ ব্যাপারে সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। গায়ের সব মেয়েরা বলাবলি করতে থাকে, রাস্তা মেরামঁতকারী লোকটা শুধু শুধু হৈচৈ করে বসল। কিন্তু কিছুই পেল না। নিশ্চয় শয়তানটা এখনও আসা-যাওয়া করে।
.
৩.
১৮২৩ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ওরিয়ন নামে একটা জাহাজ তুলঁ’র ডকে মেরামতের জন্য এসে লাগে। জাহাজটা ভূমধ্যসাগরের নৌবাহিনীর অন্তর্গত একটা জাহাজ। জাহাজটা ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৮২৩ সালটা রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার বছর এবং এই বছরেই ফ্রান্সের সঙ্গে স্পেনের যুদ্ধ চলছিল। আসলে ফ্রান্সের জনগণের বিপ্লব ব্যর্থ করে সেখানকার রাজতন্ত্রকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করতে চায়। ফরাসি বিপ্লবের যে গণতান্ত্রিক ভাবধারা তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে পড়ছিল, সে ভাবধারার মূলোচ্ছেদ করতে চেয়েছিল রাজতন্ত্রী ফ্রান্সে। তবে এ যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী স্পেনের বিপ্লবী সেনাদলের ওপর যে নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার পরিচয় দেয় তা ভয়াবহ বলেও ফরাসি সৈন্যদের তাতে সায় ছিল না। বরং তারা সামরিক শৃঙ্খলার খাতিরে অবস্থার চাপে বাধ্য হয়েই তা করে।
অথচ ফরাসি সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের সৈন্যদের এই শৃঙ্খলাবোধকেই ফরাসি জাতির স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি বলে ধরে নেয়। ফরাসি রাজতন্ত্র ভেবেছিল স্পেনের রাজতন্ত্রকে সুদৃঢ় করার পর তারা নিজেদের দেশের রাজতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করে তুলঁবে।
এবার ওরিয়ন জাহাজটির কথায় আসা যাক।
ওরিয়ন নামে যুদ্ধজাহাজটি ছিল ফরাসি নৌবাহিনীর একটি অঙ্গ। স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তার কাজ ছিল ভূমধ্যসাগরে পাহারা দিয়ে বেড়ানো। ঘটনাক্রমে ঝড়ের আঘাতে তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তুলঁ’র বন্দরে মেরামতের জন্য আসে। বন্দরে কোনও যুদ্ধজাহাজ এলেই তা স্থানীয় জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার ওপর ওরিয়ন জাহাজটা ছিল আকারে বেশ বড়। যে কোনও বড় বস্তুর প্রতি জনগণের একটা স্বাভাবিক আগ্রহ থাকে।
