ক্রমে সরকারও বুঝতে পারে কিছুর একটা অভাব ঘটেছে। আদালতের যে রায়ে ম্যাদলেন জাঁ ভলজাঁয় পরিণত হয় সেই রায় বার হবার চার বছরের মধ্যেই মন্ত্রিউল-সুর-মের অঞ্চলে কর আদায়ের খরচ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। মঁসিয়ে দ্য ভিলেলে ১৮২৭ সালে আইনসভায় এ বিষয়ে সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
.
২.
এ বিষয়ে আরও কিছু বলার আগে একটি বিশেষ ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ দান করা উচিত। ঘটনাটি মঁতফারমেলের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সেই সময়ই ঘটে। এই ঘটনা থেকে সেকালের দেশের শাসন কর্তৃপক্ষের মনোভাব সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া যাবে।
সেকালে মঁতফারমেল অঞ্চলে এক প্রাচীন কুসংস্কার ছিল। অন্যান্য আর পাঁচটা কুসংস্কারের মতোই যেমন অদ্ভুত তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত যা বিরল, যা অদ্ভুত তার প্রতি আমাদের একটা শ্রদ্ধা আছে। মঁতফারমেলের কুসংস্কারটিও এই ধরনের এক কুসংস্কার।
ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা বিশ্বাস করত শয়তান আবহমান কাল থেকে তার সঞ্চিত সব ধনসম্পদ কোনও এক গভীর বনের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। স্থানীয় অনেক গৃহবধূ বলত, মাঝে মাঝে এক-একদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে বনের প্রান্তদেশে কসাই বা গাড়িচালকের মতো দেখতে হাতে বোনা কাপড়ের তৈরি মোটা পোশাকপরা কালো রঙের একটা অদ্ভুতদর্শন লোককে দেখেছে তারা। সে লোকের মাথার টুপির বদলে থাকত দুটো শিং।
তারা বলত সেই অস্বাভাবিক অপ্রাকৃত লোকটার সঙ্গে যাদেরই দেখা হত তাদেরই মৃত্যু ঘটত। কিন্তু তাকে যারা দেখতে পেত তাদের দেখা হওয়ার ধরন অনুসারে তিনভাবে মৃত্যু ঘটত। সেই অনুসারে মৃত্যুকালেরও তারতম্য দেখা যেত। লোকটার সঙ্গে যখনি কারও দেখা হত তখনি দেখা যেত সে হয় গরুর জন্য ঘাস কাটছে অথবা একটা গর্ত খুঁড়ছে। যদি কোনও লোক তাকে ঘাস কাটতে দেখে তার কাছে যেত তা হলে তার বাড়ি ফেরার পর এক সপ্তার মধ্যে তার মৃত্যু ঘটত। আর যদি কোনও লোক সেই লোকটাকে মাটি খুঁড়তে দেখত এবং গর্ত খুঁড়ে গর্তটা বুজিয়ে সে চলে যাবার পর। সেই গর্ত থেকে তার গুপ্তধন তুলে আনত তা হলে তার এক মাসের মধ্যে মৃত্যু হত। আর যদি কোনও লোক তাকে দেখে আগ্রহ না দেখিয়ে চলে যেত অন্য দিকে অথবা ছুটে পালিয়ে যেত তা হলে তার এক বছরের মধ্যে মৃত্যু ঘটত।
ফলে ওখানকার জনগণ যখন দেখল লোকটাকে চোখে দেখলে মৃত্যু হবেই দু দিন আগে বা পরে, তখন তার গুপ্তধনটা নিয়ে মরাই ভালো। এই ভেবে অনেকেই সেই শয়তানটাকে চোখে দেখতে পেলেই সেই জায়গায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে তার গুপ্তধন চুরি করে আনার চেষ্টা করত। সে ধন এক মাসের বেশি ভোগ করতে না পারলেও তারা তা ছাড়ত না।
জাঁ ভলজাঁ মন্ত্রিউল থেকে যখন গ্রেপ্তার হয় এবং গ্রেপ্তার হবার পর পুলিশ-হাজত থেকে পালিয়ে এসে দিনকতক মুক্ত থাকে, তখন সে মঁতফারমেলে যায়। তখন দেখা যায় সেই গাঁয়ের বুলাত্রিউল নামে একজন লোক গাঁয়ের পাশে একটা বনের মাঝে বিশেষ এক আগ্রহের সঙ্গে যাওয়া-আসা করছে। বনের প্রতি তার এই অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখে অনেকের মনে সন্দেহ জাগে। লোকটা রাস্তা মেরামতের কাজ করত। সে একবার জেল খেটেছিল। পুলিশ তার ওপর কড়া নজর রাখত। ফলে সে কোনও কাজকর্ম পেল না। স্থানীয় পৌরসভার কর্তৃপক্ষ তাই লোকটাকে দিয়ে কম বেতনে রাস্তা মেরামতের কাজ করাত।
স্থানীয় অধিবাসীরা বুলাত্রিউলকে ভালো চোখে দেখত না। সে ছিল অতিমাত্রায় বিনয়ী। তার এই বিনয়ের আতিশয্যটাও ছিল সন্দেহজনক। যেসব দস্যু অন্ধকারে পথে রাহাজানি করত তাদের সঙ্গে তার নাকি যোগাযোগ ছিল। সে অতিমাত্রায় মদ খেত।
কিছুদিন থেকে বুলাত্রিউল সকালের দিকে রাস্তা মেরামতের কাজ ফেলে রেখে বনের মাঝে গিয়ে ঘোরাফেরা করছিল। এটা অনেকেরই চোখে পড়ল। সন্ধের দিকে এক-একদিন বনের গভীরে গিয়ে কোনও একফালি ফাঁকা জায়গায় মাটি গাঁইতি দিয়ে খুঁড়ে কিসের খোঁজ করত। গাঁয়ের যেসব মেয়ে সেই সময় সেই বনপথ দিয়ে যাওয়া-আসা করত তারা তাকে দেখে শয়তান বিলজিবাব ভাবত। তার পর তারা দেখত বুলাত্রিউলকে। অবশ্য বুলাত্রিউলও কম ভয়াবহ নয়। বুলাত্রিউলও মেয়েদের দেখে ঘাবড়ে যেত। সে দমে গিয়ে তার কাজটাকে লুকোবার চেষ্টা করত। তার আচরণ ও কাজকর্ম সত্যিই রহস্যজনক ছিল গাঁয়ের লোকদের কাছে।
গাঁয়ের মেয়েরা বলাবলি করত, নিশ্চয় শয়তান এসে যে গুপ্তধন পুঁতে রেখে যায়, তা বুলাত্রিউল দেখেছে। তাই সেই গুপ্তধনের খোঁজ করছে সে। দার্শনিক ভলতেয়ারের শিষ্যরা আশ্চর্য হয়ে বলল, বুলাত্রিউল শয়তানকে ধরবে, না শয়তান বুলাত্রিউলকে ধরবে।
একথা শুনে গাঁয়ের বৃদ্ধারা তাদের বুকের উপর ক্রসচিহ্ন আঁকল।
ক্রমে বুলাত্রিউল বনে ঘোরাঘুরি করা বা খোঁজাখুঁজি করার কাজটা বন্ধ করে তার দৈনন্দিন কাজে মন দেয়। ফলে ব্যাপারটার সেখানেই নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
তবু কিছু লোকের আগ্রহ রয়ে যায়। তারা ভাবতে থাকে বনের মাঝে শয়তানের কোনও অতিপ্রাকৃত গুপ্তধন না থাকলেও বুলাত্ৰিউলের এই কাজের পেছনে নিশ্চয় কোনও রহস্য আছে। আর সে রহস্যের কথা বুলাত্রিউল জানে। যেসব লোক এ ব্যাপারে দুর্মর আগ্রহ দেখায় তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখায় একজন স্কুলমাস্টার আর হোটেলমালিক থেনার্দিয়ের। এই থেনার্দিয়েরের সঙ্গে সবার ভাব ছিল এবং বুলাত্রিউলের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল।
