ভবঘুরে বলল, কারা আসছে। আমি যাচ্ছি।
সে যাবার জন্য পা বাড়িয়ে দিল।
অফিসার তাকে বলল, তুমি আমাকে মৃতের স্তূপ থেকে উদ্ধার করেছ। কে তুমি? আমিও ফরাসি বাহিনীতেই যুদ্ধ করছিলাম তোমার মতোই।
কোন পদে ছিলে তুমি?
সার্জেন্ট।
তোমার নাম কী?
থেনার্দিয়ের।
অফিসার বলল, আমি তোমার নাম কখনও ভুলব না। আমার নামটাও তুমি মনে রাখবে। আমার নাম হল তমার্সি।
২.২ জাঁ ভলজাঁ আবার ধরা পড়ে
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
জাঁ ভলজাঁ আবার ধরা পড়ে।
এই বেদনাদায়ক ঘটনার খুঁটিনাটির মধ্যে যাব না আমরা। আমরা শুধু মন্ত্রিউল-সুর মের-এ সংঘটিত ঘটনাবলির মাস কয়েক পরে দুটি সংবাদপত্রে যে দুটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, তা তুলে ধরব। এ বিষয়ে প্রথম সংবাদটি প্রকাশিত হয় ১৮২৩ সালের ২৫ জুলাই তারিখে। এই সংবাদে যে বিবরণ প্রকাশিত হয় তা হল এই;
পাশ দ্য ক্যালো জেলায় সম্প্রতি এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ম্যাদলেন নামে এক নবাগত ব্যক্তি এই অঞ্চলে এসে কয়েক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ এক নতুন পদ্ধতিতে এই অঞ্চলের এক পুরনো ও ক্ষয়িষ্ণু শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। এ শিল্প হল জপের মালা আর কাঁচ তৈরির কারখানা। এই শিল্পের প্রকৃত উন্নতি সাধন করে সে প্রচুর ধন সঞ্চয় করে এবং এই আঞ্চলিক শিল্পের উন্নয়নে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই অঞ্চলের অধিবাসীরা তাকে মেয়র নির্বাচিত করে। সম্প্রতি পুলিশ আবিষ্কার করে মঁসিয়ে ম্যাদলেন নামদারী এই লোকটি একজন জেল-ফেরত কয়েদি এবং ১৭৯৬ সালে চুরির অপরাধে সে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। তার আসল নাম হল জাঁ ভলজাঁ। সে পুনরায় কারারুদ্ধ হয়। এবার গ্রেপ্তার হবার আগে সে মঁসিয়ে লাফিক্তের ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষ ফ্ৰ তুলঁবার চেষ্টা করে এবং এই টাকা সে ব্যবসায় বৈধভাবে অর্জন করে ওই ব্যাংকে জমা রাখে। তুলঁ’র কারাগারে দ্বিতীয়বার যাবার আগে জাঁ ভলজাঁ তার সব টাকা কোথায় রাখে, তা জানা যায়নি।
ওই একই দিনে জার্নাল দ্য প্যারিসে আর একটি বিবরণ প্রকাশিত হয়। এ বিবরণটি আরও বিস্তৃত। তাতে বলা হয়, সম্প্রতি জাঁ ভলজাঁ নামে একজন জেলমুক্ত আসামির ফৌজদারি আদালতে বিচার হয়। এই দুবৃত্ত পুলিশের প্রহরাকে ফাঁকি দিয়ে এড়িয়ে যেতে সমর্থ হয়। সে তার নাম পাল্টে এই প্রদেশের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট শহরটাতে এক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং সেই শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়। ঘটনাক্রমে পুলিশ কর্তৃপক্ষের অক্লান্ত উদ্যমের ফলে তার আসল পরিচয় উদ্ঘাটিত হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার এক রক্ষিতা ছিল। রক্ষিতাটি ওই শহরেরই একটি মেয়ে এবং তার গ্রেপ্তারের সংবাদ শুনে যে আঘাত পায়। সে আঘাত সহ্য করতে না পেরে সে মারা যায়। পুলিশ গ্রেপ্তার করা সত্ত্বেও এই শয়তানটি তার হারকিউলেস-সুলভ শক্তির জোরে পুলিশ-হাজত থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু সে যখন তিন-চার দিন আগে প্যারিস থেকে মঁতফারমেলের দিকে যাচ্ছিল তখন পুলিশ তাকে আবার ধরে। মনে হয়, যে সময়টা সে বাইরে ছাড়া ছিল সেই সময়ের মধ্যে একটা বড় ব্যাংক থেকে প্রায় ছয়-সাত লক্ষ ফ্রা’র মতো তার জমানো টাকা তুলে নেয়। মামলার বিবরণে দেখা যায় এই টাকাটা সে কোথায় রেখেছে তা সে নিজে ছাড়া আর কেউ জানে না এবং পুলিশ তা আবিষ্কার করতে পারেনি। যাই হোক, জাঁ ভলজাঁ বিচারে আজ হতে আট বছর আগে বড় সড়কে এক সশস্ত্র ডাকাতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয় এবং সে অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয় সে। এমন কতকগুলি নির্দোষ ছেলের ওপর সে এই ডাকাতি করে যারা ঘুরে ঘুরে শহরের নর্দমা ও নানা জঞ্জাল পরিষ্কার করে।
অপরাধী আসামি তার পক্ষে কোনও উকিল দেয়নি। অভিযোগকারী সরকারি অ্যাটর্নি তার স্বভাবসিদ্ধ বাগ্মিতার দ্বারা প্রমাণ করেন যে আসামি একজন পাকা চোর এবং সে মেদি অঞ্চলের কুখ্যাত ডাকাতদলের একজন সদস্য ছিল। এইভাবে সে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সে কোনও আবেদন করেনি। কিন্তু রাজা তার করুণার বশবর্তী হয়ে মৃত্যুদণ্ড মওকুব করে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দান করেন। জাঁ ভলজাঁকে তুলঁ’র কারাগারে পাঠানো হয়।
জেলখানায় যাওয়ার পর জাঁ ভলজাঁকে এক নতুন নম্বর দেওয়া হয়। এক নতুন কয়েদি হিসেবে তার নম্বর হয় ৯৪৩।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন মন্ত্রিউল অঞ্চল থেকে যাওয়ার পর ওই অঞ্চলের সমৃদ্ধিও চলে যায়। ধরা দেবার আগে জাঁ ভলজাঁ যা ভেবেছিল তাই ঘটে। তার চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে শহরের কর্মোদ্যম নষ্ট হয়ে যায়। একটা চালু কারখানা, একটা উন্নত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভেঙে যায় ধীরে ধীরে। ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা ঘটে মাঝে মাঝে। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরও এমনি ঘটেছিল গ্রিসে। শুরু হয় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নিমপদের সেনানায়করা রাজা হয়ে বসে। কারখানার ফোরম্যানরা মালিক হয়ে বসে। শুরু হয় ঈর্ষান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ম্যালেনের বিরাট কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তার গড়া বাড়িগুলো একে একে ধ্বংস হয়ে যায় এবং কারখানার শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অনেকে শহর ছেড়ে চলে যায়, অনেকে নতুন কাজ পায়। তখন শহরে বড় শিল্পের কাজ সব বন্ধ হয়ে যায়। ছোট ছোট শিল্পের কিছু কাজ অবশ্য হয়। কিন্তু স্বার্থ আর লাভের দিকটাই দেখা হয়। নিঃস্বার্থ জনকল্যাণের সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ম্যাদলেন সব কাজ-কারবারের কেন্দ্রস্থলে থেকে সবকিছু দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করত। সকলকে কাজে অনুপ্রাণিত করত। তার অবর্তমানে সব জায়গায় শুরু হয় শুধু দ্বন্দ্ব আর প্রতিযোগিতা, কে কাকে ঠকাতে পারে, কে কত বেশি স্বার্থ পূরণ করতে পারে, কে কার গলা কাটতে পারে–সর্বত্র তারই চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যে শক্তি দিয়ে ম্যাদলেন তার বিরাট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্ত কর্মকেন্দ্রগুলোকে বেঁধে রেখেছিল, সে সুতো ছিঁড়ে যায়। ফলে সবকিছু শিথিল ও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। উৎপাদনের মান নিম্নস্তরে নেমে যায়। ক্রেতারা আস্থা হারিয়ে ফেলে। অর্ডার আসা বন্ধ হয়ে যায়। আয় কমে যাওয়ায় শ্রমিকের বেতনের হার কমে যায়, অনেক শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়ে পড়ে। ফলে কোম্পানি দেউলে হয়ে পড়ে। গরিব বেকারদের কর্মসংস্থানের উপায় বিলুপ্ত হয়ে যায় একে একে।
