সেই সময় চাঁদের আলোয় প্লাবিত হয়ে ছিল সমস্ত রণভূমি।
রাত্রি প্রায় দুপুরের সময় ওহেনের রাস্তার কাছে একটি মানুষকে ভবঘুরের বেশে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। তাকে দেখে সে ফরাসি অথবা ইংরেজ, চাষি অথবা সৈনিক তার কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। মৃতদেহের গন্ধই যেন তাকে টেনে এনেছে সেখানে। তার গায়ে আস্তিনহীন একটা কোট। সে খুব সতর্কতার সঙ্গে পথ চলছিল। সামনে এগিয়ে যেতে যেতে প্রায়ই পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল লোকটা দিনের বেলার থেকে রাত্রিকালেই ঘোরাফেরা করে বেশি। তার সঙ্গে কোনও ব্যাগ ছিল না। কিন্তু তার কোর্টের পকেটগুলো বড় বড় ছিল। পায়ের তলায় এক একটা মৃতদেহ দেখে এক একবার থামছিল সে এবং নত হয়ে ঝুঁকে কী সব বিড়বিড় করে আপন মনে বলছিল অনুচ্চ স্বরে। তার সতর্কিত অঙ্গভঙ্গি এবং রহস্যময় গতিবিধি দেখে তাকে নর্মান রূপকথায় বর্ণিত ধ্বংসাবশেষের কাছে ঘুরে বেড়ানো প্রেমূর্তির মতো মনে। হচ্ছিল। সে যেন জলাশয় সন্নিহিত কোনও স্থানের রাতচোরা এক পাখি।
কেউ যদি সেই লোকটার দিকে তাকাত সেই সময় তা হলে সে তার থেকে আগে কিছু দূরে দেখতে পেত মঁ সেন্ট জাঁ আর ব্রেন লালিউদের মাঝখানে লিভেলে রোডের ধারে একটি বাড়ির পেছনের দিকে একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়াটা দেখে মনে হচ্ছিল পেট ভরে না খেতে পেয়ে সেটা রোগা হয়ে গেছে। গাড়িটার ভেতর একগাদা বাক্স-পেটরা আর পুঁটলির উপর একটি নারীমূর্তি বসে ছিল। সেই গাড়িটা আর এই ভবঘুরের মধ্যে হয়তো কোনও সম্পর্ক ছিল।
আকাশে কোনও মেঘ ছিল না। রাত্রির আবহাওয়াটা ছিল খুবই শান্ত। চারপাশের যে সব গাছের ডালগুলো গুলিবর্ষণের ফলে ভেঙে গিয়ে গাছের সঙ্গে লেগে থেকে ঝুলছিল, সেই সব ডালপালাগুলো শান্ত বাতাসে দুলছিল। দীর্ঘশ্বাসের মতো মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল। এক মৃদু কম্পনে ঘাসগুলো শিহরিত হচ্ছিল।
ইংরেজ সৈন্যরা গাঁয়ে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল। দূর থেকে তাদের শব্দ আসছিল। হুগোমঁত আর লা হাই সেন্ত গাঁ দুটো তখনও জ্বলছিল। সেই আগুন থেকে একটা আলোর আভা বেরিয়ে ইংরেজদের শিবিরের আগুনের আভার সঙ্গে মিশে গিয়ে আলোর একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করেছিল।
খালের মতো সেই নিচু গ্রাম্য পথটাতে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল তার কথা বলা হয়েছে। সেই খাল ও রাস্তাটায় মানুষ আর ঘোড়ার মৃতদেহে ভরে ছিল। সে জায়গাটা একেবারে শান্ত। পথটার দু দিকে দুটো পারের উপরের ফাঁকা জায়গাতেও মৃতদেহ পড়ে ছিল। তখনও রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল।
সেই নৈশ ভবঘুরে এই পথেই রক্তমাখা পায়ে যেতে যেতে মৃতদেহগুলোর মাঝে কি খুঁজছিল। কোন অবর্ণনীয় দৃশ্যের সন্ধানে তার নীরব নিঃশব্দ অভিযান সে চালিয়ে যাচ্ছিল তা কে জানে!
লোকটা হঠাৎ এক জায়গায় থামল। কিছু দূরে মৃতদেহের স্তূপটা যেখানে সবচেয়ে উঁচু আর ঘন হয়ে উঠেছিল সেখানে একগাদা মানুষ আর ঘোড়ার মৃতদেহের মাঝখানে। একটা মৃতদেহের একটা লম্বা হাত বেরিয়ে ছিল। চাঁদের আলোয় সেই হাতটার একটা আঙুলে একটা আংটি চকচক করছিল। ভবঘুরে লোকটি নতজানু হয়ে বসে আংটিটা আঙুল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার উঠে পড়ল। চারদিকে সাবধানে সে তাকিয়ে দেখল কেউ কোথাও নেই।
কিন্তু সে যেমনি সেখান থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়াল অমনি যে হাত থেকে সে আংটি চুরি করেছিল সেই হাতটা পেছন থেকে তার কোটের কোণটা টেনে ধরল। কোনও সৎ লোক হলে এই ঘটনায় ভয় পেয়ে যেত রীতিমতো, কিন্তু ভবঘুরে লোকটি হাসতে লাগল। আপন মনে বলল, ভূত, সৈন্য নয়।
যে হাতটা তার কোটটার কোণটা ধরেছিল সে হাতের মধ্যে কোনও জোর ছিল না। তাই লোকটি জোর করে চলে যেতেই হাতটা ঢলে পড়ল।
লোকটি তখন কী মনে হতে ঘুরে দাঁড়িয়ে আপন মনে বলল, তবে কি লোকটা এখনও বেঁচে আছে? দেখা যাক।
এই বলে ভবঘুরে যার হাতের আঙুল থেকে সে আংটিটা ছিনিয়ে নিয়েছিল তার অচেতন দেহটাকে মৃতদেহের স্তূপ থেকে বার করল। দেখে বোঝা যাচ্ছিল লোকটি ফরাসি বর্মধারী বাহিনীর এক উচ্চপদস্থ অফিসার। তার মাথায় কোনও শিরস্ত্রাণ ছিল না। তরবারির আঘাতে তার গোটা মুখখানা ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছিল। মুখের উপর রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। কিন্তু তার দেহের কোনও হাড় ভাঙেনি। কারণ তার চারদিকে মৃতদেহ ছড়িয়ে থাকায় তার দেহটা পিষ্ট বা দলিত হয়নি কোনওভাবে। তার বুকের বর্মের উপর একটা ক্রস ঝোলানো ছিল। ভবঘুরেটি সেই ক্রসটা খুলে নিজের কোটের ভেতর-পকেটে ভরে নিল। তার পকেট হাতড়ে একটা হাতঘড়ি আর একটা মানিব্যাগ বার করে নিয়ে নিল।
এমন সময় দেহটা নাড়াচাড়া হওয়ায় অচেতন মানুষটি চোখ খুলল। সে তখনও মরেনি। গুরুতর আহত হয়েছিল শুধু। সে চোখ খুলেই ভবঘুরেকে বলল, ধন্যবাদ।
ভবঘুরে তখন হঠাৎ শুনতে পেল দূরে টহলধারী সৈন্যরা আসছে। সে তাই চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। মুমূর্ষ অফিসারটি তাকে ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, যুদ্ধে কারা জিতেছে?
ভবঘুরে বলল, ইংরেজরা।
অফিসার বলল, আমার পকেটে একটা হাতঘড়ি আর টাকার ব্যাগ পাবে।
ভবঘুরে তার আগেই সে দুটো নিয়ে নিয়েছে। তবু সে অফিসারকে দেখিয়ে তার পকেটগুলো হাতড়ে বলল, না নেই।
অফিসার তখন বলল, তা হলে কে চুরি করে নিয়েছে। আমি সেগুলো তোমাকেই দিতে চেয়েছিলাম।
