এই হল ওয়াটারলু।
কিন্তু অনন্তকালের পরিপ্রেক্ষিতে এ যুদ্ধের তাৎপর্য কী? প্রথমে সারা আকাশটাকে আচ্ছন্ন করে মেঘ নেমে এল। মেঘ থেকে বিরাট ঝড় উঠল। যুদ্ধ হল। যুদ্ধের পর এল শান্তি। এত সব বিপর্যয় ও জয়-পরাজয় এক মুহূর্তের জন্যও সেই সর্বদর্শী দুটি বিশাল চক্ষুর সর্বব্যাপী দৃষ্টিকে বিচলিত করতে পারেনি। যে দৃষ্টির সামনে এক তৃণখণ্ড থেকে অন্য তৃণখণ্ডে উড়ে বেড়ানো সামান্য এক ফড়িং আর উড়ন্ত ঈগল সমান।
.
১৯
আমাদের বাহিনীর পক্ষে এবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাওয়া দরকার।
১৮১৫ সালের ১৮ জুন ছিল পূর্ণিমা। যে রাতে রুশারের বর্বর বাহিনী পলায়নরত ফরাসি সৈনিকদের অনুসরণ করছিল তখন আকাশ থেকে ঝরে-পড়া পূর্ণ চাঁদের আলো তাকে পথ দেখায়। পালিয়ে যাবার সব পথ উদঘাটিত করে দেয় শত্রুদের চোখের সামনে। ভীতসন্ত্রস্ত পলায়নমান ফরাসি সৈনিকদের হিংস্র প্রুশীয় অশ্বারোহী বাহিনীর দয়ার ওপর ঠেলে দেয়। এইভাবে সেদিনের সেই পূর্ণিমার চাঁদ নরহত্যার তাণ্ডবে সহায়তা করে। এইভাবে অনেক চন্দ্রালোকিত রাত্রি মানুষের অনেক দুঃখে বিপদে মুখ বার করে হাসতে থাকে।
মঁ সেন্ট জা’র প্রান্তরে গুলিবর্ষণ থেমে গেলেই সে প্রান্তর একেবারে জনহীন হয়ে। পড়ে। ফরাসি বাহিনী পালিয়ে গেলেই তাদের শিবিরে ঢুকে পড়ল ইংরেজ বাহিনীর বিজেতা সৈন্যরা। কারণ তখন একটা রীতি ছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে বিজেতা সৈন্যদের বিজিত সৈন্যদের শিবিরে গিয়ে তাদের বিছানায় শুতে হত।
প্রুশীয় অশ্বারোহীরা পলাতক শত্রুদের পশ্চাদ অনুসরণ করতে লাগল। ওয়েলিংটন গাঁয়ের মধ্যে নিশ্চিন্তে এক জায়গায় বসে যুদ্ধের বিবরণ লিখতে লাগলেন। র্ম সেন্ট জঁ’র। উপর বোমাবর্ষণ করা হয়। হুগোমঁত, পাপোলোত্তে আর প্ল্যানশোয়েতে আগুন লাগানো হয়। লা হাই সেন্ত আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত হয়। লা বেল অ্যালায়েন্সে বিজেতা বাহিনীর সব দল মিলিত হয়। কিন্তু এই সব জায়গার কথা স্মরণ করা হয় না, তাদের নাম করা হয় না। যে ওয়াটারলুর যুদ্ধের তেমন কোনও ভূমিকাই নেই সেই ওয়াটারলুই সব গৌরব লাভ করে।
যারা যুদ্ধের জয়গান গায় আমরা তাদের দলে নেই। প্রয়োজন হলে আমরা যুদ্ধ সম্পর্কে সত্য কথাই বলি। সব যুদ্ধেরই বিষাদময় এক সকরুণ ঐশ্বর্য আছে, সেটা আমরা অস্বীকার করিনি। কিন্তু তার সঙ্গে এর কতকগুলি আবার নোংরা দিকও আছে। তার মধ্যে একটা হল মৃতদেহগুলোর সব কিছু লুণ্ঠন। যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব সৈনিক নিহত হয়। তাদের মৃতদেহ থেকে সব কিছু লুণ্ঠন করে নেওয়া হয়। যুদ্ধের পরদিন সব মৃতদেহগুলো নগ্ন হয়ে পড়ে থাকে।
কিন্তু কারা এই অপহারক? যারা কোনও যুদ্ধজয়ের পরমুহূর্তেই বিজয়গৌরবের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে গৌরবকে কলঙ্কিত করে, তারা কারা? ভলতেয়ারের মতো কিছু দার্শনিক মনে করেন, যারা এ গৌরব অর্জন করে তারাই এ গৌরবকে খর্ব করে। সেই একই লোক। জীবিতরা মৃতদের ওপর লুণ্ঠন চালায়। দিনের বেলাকার বীর সৈনিক রাত্রির অন্ধকারে এক নোংরা ন্যক্কারজনক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। অনেকের মতে অবশ্যই এ কাজে অধিকার আছে তার, কারণ তাদেরই অস্ত্রাঘাতে ও সমরকুশলতার জন্যই মৃত্যু ঘটেছে সেই সব লুণ্ঠিত ব্যক্তিদের।
আমরা কিন্তু এটা বিশ্বাস করি না। যে হাত গৌরবের লরেল অর্জন করে নেয় সেই হাত কখনও এক মৃত সৈনিকের পা থেকে জুতো খুলে নিতে পারে না। বিশেষ করে বর্তমান যুগের কোনও সৈনিকের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আমরা করতে পারি না।
সব যুদ্ধক্ষেত্রেই সৈন্যশিবিরের আশপাশে ও আনাচে-কানাচ কিছু আধা-ভৃত্য। ও আধা-দুবৃত্ত, আধা-পঙ্গু লোক থাকে। তারা শিবিরের কাছে থেকে সৈন্যদের। ফাই-ফরমাস খাটতে থাকে। অনেক ভিখিরিও অনেক সময় সৈন্যদের পথপ্রদর্শকের কাজ করে। এই সব লোক সৈনিকদের খুশি করে তাদের কাছ থেকে পুরনো ঘেঁড়া পোশাক চেয়ে নিয়ে পরতে থাকে। আগের যুগে এই সব ভবঘুরে ধরনের কিছু লোক সব সৈন্যদলের সঙ্গেই যাওয়া-আসা করত। এদের কোনও দেশ বা জাতিগত কোনও পরিচয় ছিল না। তারা ইতালি ভাষা মুখে বলত অথচ জার্মান সৈন্যদের পিছু পিছু যেত। ফরাসি ভাষা মুখে বলে ইংরেজদের অনুসরণ করত। শুধু এই সব ভবঘুরেরা লুণ্ঠন করত না, অনেক বড় বড় সেনাপতিও লুণ্ঠন সমর্থন করতেন। শত্রুদের যা পাও তা সব কেড়ে নাও, তা ভোগ কর। এই ছিল তখনকার দিনের নীতি-উপদেশ। সেনাপতি তুরেনকে তাঁর বাহিনীর লোকেরা বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করত, কারণ তিনি তাদের লুণ্ঠন সমর্থন করেন। একটি সেনাবাহিনীতে কতজন সৈনিক এই লুণ্ঠনের কাজে জড়িত ছিল, সেটা নির্ভর করত সেনাপতির কঠোরতা আর শৃঙ্খলাবিধানের ক্ষমতার ওপর। সেনাপতি হোশে আর মার্কোর সেনাদলের মধ্যে এই ধরনের কোনও লুণ্ঠনকারী ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি, ওয়েলিংটনের বাহিনীতেও এই ধরনের লোক খুব কমই ছিল।
সে যাই হোক, ১৮ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে ওয়াটারলুর যুদ্ধক্ষেত্রে বিজিত পক্ষের মৃতদেহগুলো লুণ্ঠিত হয়। ওয়েলিংটন এ ব্যাপারে কঠোর অনমনীয় এক মনোভাব পোষণ করেন। তিনি ঘোষণা করেন কোনও লোককে যদি দেখা যায় কোনও মৃতদেহ থেকে কিছু লুণ্ঠন করছে তা হলে তাকে দেখা মাত্র গুলি করা হবে। কিন্তু এত সব কড়াকড়ি সত্ত্বেও অফিসারদের চোখে ধুলো দিয়ে মৃত সৈনিকদের দেহ থেকে যা কিছু পাচ্ছিল তা লুট করে নিচ্ছিল একদল লোক। ওয়েলিংটন যেদিকে দাঁড়িয়েছিলেন তার উল্টো দিকে অন্যপ্রান্তে লুণ্ঠন চলছিল।
