ওয়াটারলু’র আসল প্রকৃতিকে আমাদের বিচার করে দেখতে হবে। তার যা মূল্য তার বেশি মূল্য দিলে চলবে না। স্বাধীনতা দানের কোনও উদ্দেশ্য তার ছিল না। প্রতিবিপ্লবীরা যুদ্ধের পরেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও উদারনৈতিক হয়ে ওঠে, নেপোলিয়ন যেমন অনুরূপ অবস্থার চাপে অনিচ্ছায় বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। ১৮১৫ সালের ১৮ জুন তারিখে বিপ্লবের নায়ক। রোববাসপিয়ারের ভূমিকায় অবতীর্ণ অশ্বারোহী নেপোলিয়ন আসনচ্যুত হন।
.
১৮
স্বৈরতন্ত্রের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে খান খান হয়ে গেল।
নেপোলিয়নের বিশাল সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক ব্যাপক অন্ধকার নেমে এল যে অন্ধকার একদিন নেমে এসেছিল রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর। বর্বর যুগের মতো বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। কিন্তু ১৮১৫ সালের বর্বরতার নাম হল প্রতিবিপ্লব। এ প্রতিবিপ্লব অবশ্য উপযুক্ত প্রাণশক্তির অভাবে ক্ষণস্থায়ী হয়।
বিধ্বস্ত সাম্রাজ্যের জন্য অনেক বীর অবশ্য অশ্রুপাত করতে থাকে। তরবারির শক্তি আর সামরিক গৌরব যদি রাজদণ্ডের গৌরব হয় তা হলে সাম্রাজ্য অবশ্যই হবে গৌরবের মূর্ত প্রতীক। কিন্তু এই সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য থেকে যে জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয় তা ছিল আসলে অত্যাচারের আগুন থেকে বিচ্ছুরিত এক অন্ধ আলো। আসলে তা ছিল চোখধাঁধানো এক অন্ধকার। সুতরাং সাম্রাজ্যের পতন মানেই গ্রহণজনিত অন্ধকারের নিঃশেষিত অবসান।
অষ্টাদশ লুই বিজয়গর্বে ফিরে এলেন প্যারিসে। ৮ জুলাই তারিখে প্যারিসের রাজপথে যে নৃত্য-উৎসব চলতে থাকে তা ২০ মার্চের উদ্যম উল্লাসের সব স্মৃতিকে মুছে দেয়। নির্বাসিত রাজা আবার ফিরে এসে অধিষ্ঠিত হন সিংহাসনে। স্বরাজ্যে স্বরাট হয়ে বসেন। ম্যালেনের যে কবরখানা ১৭৯৩ সালে সাধারণের কবরখানায় পরিণত হয়, যে কবরখানায় রাজা ষোড়শ লুই আর রানি মেরি আঁতানোতকে সমাহিত করা হয়, যার মধ্যে তখনও তাদের দেহাস্থি শায়িত হয়ে ছিল, সেই কবরখানাটিকে মর্মরপ্রস্তর দিয়ে বাধিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে এক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয় সেখানে। পোপ সপ্তম পায়াস যিনি একদিন নেপোলিয়নের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করান, সেই পোপ সপ্তম পায়াসই অষ্টাদশ লুই-এর অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন তেমনি প্রশান্তভাবে। এইভাবে ইউরোপের নির্বাসিত সিংহাসনচ্যুত রাজারা আবার ফিরে এসে আপন আপন সিংহাসনে বসেন। অথচ সমগ্র ইউরোপের অধিপতি রাজাধিরাজ পিঞ্জরাবদ্ধ পশুর মতো কারারুদ্ধ হন। এইভাবে অন্ধকারের জায়গায় আলো আর আলোর জায়গায় অন্ধকার আসন গ্রহণ করে। এই সব কিছুর একমাত্র কারণ হল এই যে এক রাখাল বালক বনের মধ্যে একদিন এক প্রুশীয় সেনাপতিকে পথ দেখিয়ে বলে, “আপনি এ পথে না গিয়ে ওই পথে যান।’
১৮১৫ সালের শরৎ আসে বিষণ্ণ বসন্তের রূপ ধরে। পুরনো বিষাক্ত বাস্তব অবস্থানগুলো শুধু তাদের বাইরের রূপটার পরিবর্তন করে। এক ব্যাপক মিথ্যাচার, কল্পিত সত্যের ধারণা বৈধ সত্যের আসন গ্রহণ করে। মানবাধিকারের সনদের অন্তরালে রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার লুকিয়ে থাকে। মনুষ্যবিদ্বেষ, কুসংস্কার এবং নৈতিক সততার অভাব এক উজ্জ্বল উদারনীতিবাদের রূপ ধারণ করে। সব পুরনো সাপগুলো খোলস ছাড়ে। নেপোলিয়ন একই সঙ্গে মানবজাতির গৌরব বাড়িয়ে তোলেন এবং খর্ব করেন। চাকচিক্যময় জৌলুসধারী এক জড়বাদকে আদর্শবাদ হিসেবে চালাবার চেষ্টা করে এক বিরাট ভুল করেন তিনি। ভবিষ্যৎকে উপহাস করেন এইভাবে।
কিন্তু নেপোলিয়ন কোথায় এবং কী করছেন? যুদ্ধবাজ লোকেরা তাদের প্রিয় গোলন্দাজকে খুঁজে বেড়াতে লাগল সর্বত্র। ওয়াটারলু যুদ্ধফেরত এক পঙ্গু সৈনিককে একদিন একটি লোক বলল, নেপোলিয়ন মারা গেছেন।
সৈনিক আশ্চর্য হয়ে বলল, মারা গেছেন! তিনি?
এটাই হল নেপোলিয়নের আসল পরিচয়। সেই স্বৈরাচারীর তখনকার দিনে কোনও লোক কল্পনাও করতে পারত না। ওয়াটারলু যুদ্ধের অনেক পরেও নেপোলিয়নের অভাবজনিত এক বিশাল শূন্যতার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে ছিল সমগ্র ইউরোপের অন্তর।
ইউরোপের রাজারা সে শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করতে লাগল। ইউরোপ তার নিজের পুনর্গঠনে মন দিল। ওয়াটারলু যুদ্ধের আগে ঐক্যবদ্ধ মিত্রশক্তি হলি অ্যালায়েন্স’-এ পরিণত হল।
প্রাচীন ইউরোপ যখন নিজেকে পুনর্গঠিত করতে লাগল, তখন তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক নতুন ফ্রান্স। যে ভবিষ্যৎকে একদিন উপহাস করে তার গুরুত্বকে অস্বীকার করেছিলেন সম্রাট নেপোলিয়ন, সে ভবিষ্যৎ তার ললাটে স্বাধীনতার এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা নিয়ে আবির্ভূত হল। যুবকরা পরম আগ্রহভরে সে ধ্রুবতারার দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু এক আশ্চর্য বৈপরীত্য দেখা দিল সেই যুবশক্তির মনে। তারা একই সঙ্গে অতীত ও ভবিষ্যৎকে ভালোবাসতে লাগল। স্বাধীনতার রূপ ধরে আসা ভবিষ্যৎকে যেমন সাদরে বরণ না করে নিয়ে পারল না, তেমনি অতীত শক্তির ঐশ্বর্যের প্রতীক নেপোলিয়নকেও তারা বর্জন করতে পারল না।
পরাজয়ের মধ্যেও পরাজিত নেপোলিয়নের গুরুত্ব বেড়ে গেল। বন্দি নেপোলিয়নের ওপর কড়া নজর রাখার জন্য ইংল্যান্ড ভার দেয় হাডস্টনের ওপর এবং ফ্রান্স এ কাজের ভার দেয় মশেনুর ওপর। তার জোড়বদ্ধ হাত দুটি সব রাজাদের কাছে ছিল সন্ত্রাসের বস্তু। অনেক রাজা বলত, উনি আমার বিদ্রি রাত্রি। বিপ্লবের যে শক্তি তার মধ্যে নিহিত ছিল সেই বিপ্লবের জন্যই ভয় করত তাকে সবাই। মৃত্যুর পরেও নেপোলিয়নের আত্মা সারা জগৎকে কাঁপিয়ে তুলঁত এবং রাজারা ভয়ে ভয়ে রাজত্ব করত। তারা সব সময় দিগন্তে সেন্ট হেলেনা দ্বীপের পাহাড়টাকে দেখত।
