দু পক্ষে মোট ষাট হাজার সৈন্য নিহত হয়।
আজ ওয়াটারলুর বিশাল প্রান্তর দেশের অন্যান্য শূন্য প্রান্তরের মতোই এক অবাধ অখণ্ড স্তব্ধতায় প্রসারিত হয়ে আছে। কিন্তু রাত্রি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে প্রান্তরের মাটি থেকে এক রহস্যময় কুয়াশা বেরিয়ে এসে সমস্ত প্রান্তরটাকে ছেয়ে ফেলে। ফিলিপ্পির প্রান্তরে স্বপ্নহত ভাবাবিষ্ট ভার্জিলের মতো কোনও পথিক যদি ওয়াটারলু’র নৈশ প্রান্তরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাহলে সে এক বিরাট যুদ্ধের ধ্বংসোন্মত্ত প্রতিধ্বনি শুনতে পাবে। তখন সেই উঁচু পাথরের উপর বসানো সিংহের মর্মরমূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং যুদ্ধের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়বে তার। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রটা তার অতীতের সেই বাস্তবতাটা যেন ফিরে পাবে একে একে সেই সারিবদ্ধ পদাতিক বাহিনীর ক্ষিপ্র পদসঞ্চার। দু দলের প্রচণ্ড আক্রমণের বিপরীতমুখী দুটি তরঙ্গমালার ঘাত-প্রতিঘাত, উৎক্ষিপ্ত বেয়নেট ও তরবারির উজ্জ্বলতা, কামানের অগ্নদগার ও বজ্রনিনাদ–সব জীবন্ত হয়ে উঠবে ধীরে ধীরে। সমাধিগহ্বর থেকে উৎসারিত এক ভৌতিক আর্তনাদের মতো পথিক শুনতে পাবে এক অদৃশ্য যুদ্ধের অশ্রুত ধ্বনি, দেখতে পাবে অসংখ্য বর্মধারী ও বোমারু সৈনিকের ছায়ামূর্তি। দেখবে ওদিকে নেপোলিয়ন, এদিকে ওয়েলিংটন –দুই নেতা দু দিকে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। সব কিছু শেষ হয়ে গেলেও অফুরান অসমাপ্ত সগ্রামে আজও মত্ত হয়ে আছেন তাঁরা। সে সংগ্রামের তীব্রতা আর বিভীষিকা প্রকট হয়ে উঠেছে যেন চারদিকের প্রকৃতির মধ্যে। চারদিকের মাঠে-ঘাটে ও খালগুলোতে রক্তস্রোত বয়ে যাচ্ছে, চারদিকের গাছপালাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে। কর্ণবিদারক এক প্রচণ্ড ধ্বনিতরঙ্গ আকাশকে স্পর্শ করছে আর মঁ সেন্ট জা, হুগোমঁত, পাপোলোত্তে ও গ্ল্যাশেনয়েতের পাহাড়ের চূড়াগুলোতে গর্জনশীল নির্জন বাতাসের মতো অসংখ্য সৈনিকের প্রতিমূর্তি এক আত্মঘাতী-প্রতিঘাতে মেতে উঠেছে।
.
১৭
উদারনৈতিক ভাবধারাবিশিষ্ট এমন একদল শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি আছেন যারা ওয়াটারলু যুদ্ধের মধ্যে কারও কোনও দোষের কিছু দেখতে পান না। আমরা কিন্তু তাদের দলে নই। আমাদের মনে হয় এই যুদ্ধে স্বাধীনতার ব্যাপারটাকেই গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এমন একটি ডিম থেকে এ ধরনের এক পাখিকে কিভাবে তা দিয়ে বার করা হল, সেটাই হল আশ্চর্যের কথা।
ওয়াটারলু যুদ্ধের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হল এই যে এ যুদ্ধে সূচিত হয়েছে বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবের জয়। এ যুদ্ধ প্যারিসের বিরুদ্ধে সমগ্র ইউরোপের যুদ্ধ, প্যারিসের বিরুদ্ধে সেন্ট পিটার্সবার্গ, বার্লিন ও ভিয়েনার যুদ্ধ, নতুনের বিরুদ্ধে প্রাচীনের যুদ্ধ। এ যেন ১৭৮৯ সালের ১৫ জুলাই-এর বিরুদ্ধে ১৮১৫ সালের ২০ মার্চের আক্রমণ। ফ্রান্সের যে গণশক্তি ছাব্বিশ বছর ধরে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদের জন্য সংগ্রাম করেছে সেই গণশক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ও সম্মিলিত রাজশক্তির এক বিরাট আগ্নেয় অভ্যুত্থান। ওয়াটারলু যুদ্ধের এটাই ছিল যেন আসল লক্ষ্য। ব্রানসউইক, লাউ, রোমানফ, হোয়েনজোলার্স, হ্যাঁপসবার্গ ও বুর্বনের রাজবংশগুলো সব বিবাদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে শুধু এই লক্ষ্য সাধনের জন্য। ওয়াটারলু রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে। সম্রাট নেপোলিয়ন স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই রাজতন্ত্রীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ওয়াটারলু যুদ্ধে এই কথাই প্রমাণিত হয় যে ফরাসি বিপ্লব ব্যর্থ হলেও ধ্বংস হয়নি একেবারে। সে বিপ্লব একক সম্রাট নেপোলিয়নের রূপ ধরে আবির্ভূত হয় ওয়াটারলুতে এবং এ যুদ্ধের পরেও সে বিপ্লব সেন্ট কোয়েতে মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদানরত অষ্টাদশ লুই-এর মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। নেপোলিয়ন নেপলস-এর সিংহাসনে একজন হোটেলমালিকের ছেলেকে বসিয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের সিংহাসনে একজন ভূতপূর্ব সার্জেন্টকে বসিয়ে অসাম্যের মধ্য দিয়ে সাম্যের জয় ঘোষণা করেন। বিপ্লবের প্রকৃতি বুঝতে হলে তাকে প্রগতি আখ্যা দিতে হবে। আর প্রগতি মানে আগামীকাল। এই আগামীকাল এবং গতকাল অদ্ভুতভাবে তাদের আপন আপন কাজ করে যায়। এই আগামীকাল বা প্রগতির প্ররোচনাতেই ওয়েলিংটন ফর নামে এক সাধারণ সৈনিককে এক বাগ্মীতে পরিণত করেন। হুগোর্মতে যে আহত হয়ে পড়ে যায় সে আবার পার্লামেন্টে বক্তারূপে উঠে আসে। এটাই হল প্রগতির রীতি। তরবারির দ্বারা ইউরোপের বাম শক্তিগুলোর উচ্ছেদের যে তাণ্ডবলীলা চলে, ওয়াটারলু যুদ্ধ সেই তাণ্ডবের অবসান ঘটায়। তবে এর ফলে আবার বিপ্লব অন্য রূপে ঘুরে আসে। এখন তরবারির যুগ চলে গেছে, এখন এসেছে চিন্তাশীলদের যুগ। এখনকার যুদ্ধ বুদ্ধির যুদ্ধ। ওয়াটারলু শতাব্দীর স্রোতোধারাকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে, তার জয় স্বাধীনতার ছদ্মবেশী বিপ্লবের দ্বারা পরাজিত হয়।
মোট কথা, ওয়াটারলু যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষই হল প্রতিবিপ্লবী। সে শক্তি ওয়েলিংটনের পেছনে ইউরোপের বহু রাষ্ট্রশক্তিকে ঐক্যবদ্ধ ও একত্রিত করে, পুঞ্জীভূত নরকঙ্কালের উপর এক বিজয়ী সিংহের মূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে। যে শক্তি মঁ সেন্ট জা’র মালভূমির উপর থেকে এক শিকারি পাখির মতো ফ্রান্সের দিকে তাকিয়ে থাকে, সে শক্তি নিঃসন্দেহে এক প্রতিবিপ্লবী শক্তি। এই শক্তিই সম্রাটের সব শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে প্যারিসে এসে দেখে তাদের পায়ের তলায় এক আগ্নেয়গিরির গহ্বর মুখ ব্যাদান করে আছে। প্রতিবিপ্লবী শক্তি তখন আপন বিপদের কথা বুঝতে পেরে তার নীতির পরিবর্তন। করতে বাধ্য হয় এবং এক অধিকারের সনদ দিয়ে বিতর্ক শুরু করে দেয়।
